ছবি: রয়টার্স
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ ঘিরে নরেন্দ্র মোদি সরকারের আগাম পুলিশি তৎপরতার পেছনে রয়েছে আগের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, সম্ভাব্য জনসমাগম নিয়ে উদ্বেগ এবং নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরির আশঙ্কা। আজ শনিবার, ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে অনুষ্ঠেয় বিক্ষোভের আগেই বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশকে সক্রিয় করা, আন্দোলনকারীদের দিল্লি যাত্রা ঠেকানো, তাদের অর্থের উৎস সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনে আগাম আটক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
প্রতিবেদনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, বিক্ষোভস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সম্ভাব্য বিক্ষোভকারীদের নিজ নিজ শহরেই আটকে রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল বলে সরকারি সূত্রের বরাতে দাবি করেছে পত্রিকাটি। ৪ অক্টোবর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব একাধিক রাজ্যের পুলিশপ্রধান ও কয়েকজন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন। ৮ অক্টোবর আবার বৈঠক করে প্রস্তুতি পর্যালোচনা করা হয়। তবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে জানতে চেয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস প্রশ্ন পাঠালেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় কোনো জবাব পায়নি। ফলে বৈঠকের নির্দেশনা সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যের প্রধান ভিত্তি সরকারি সূত্রের বক্তব্য।
এই তৎপরতার তাৎক্ষণিক কারণ খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে জুলাইয়ের বিক্ষোভে। সে সময় সিজেপির আন্দোলনকারীরা দিল্লির যন্তর মন্তরে বড় জমায়েত গড়ে তোলেন। আন্দোলনের পটভূমিতে ছিল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে ক্ষোভ। ওই বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় ভারতের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর একাংশের মূল্যায়ন ছিল, আগের বিক্ষোভকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলেই সেখানে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ জড়ো হতে পেরেছিলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোই ছিল আগাম প্রস্তুতির অন্যতম উদ্দেশ্য।
অর্থাৎ, সরকারের উদ্বেগ শুধু যন্তর মন্তরে কত মানুষ জমায়েত হবেন, তা নিয়ে ছিল না; বরং বিক্ষোভের আকার বড় হলে তার রাজনৈতিক পরিণতি কী হতে পারে, সেটিও বিবেচনায় ছিল বলে সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আগের আন্দোলনে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা প্রশাসনের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলেছে—এমন ব্যাখ্যা সরকারি সূত্রের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এ থেকে সরকার রাজনৈতিক সমালোচনা বন্ধ করতেই সব পদক্ষেপ নিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রশাসনের প্রকাশ্য যুক্তি ও আইনি ভিত্তিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এবারের বিক্ষোভের লক্ষ্যও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সিজেপি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে ১০ অক্টোবর দিল্লিতে সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়। তাদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং এতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অবশ্য অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে আন্দোলনটি কেবল একটি দলের কর্মসূচি ছিল না; এর সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কও যুক্ত হয়ে পড়ে।
এখানে সরকারের জন্য ঝুঁকির দুটি দিক ছিল। প্রথমত, জুলাইয়ের মতো বড় জমায়েত হলে রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা সামলানো কঠিন হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের মধ্যে বড় বিক্ষোভ নতুন করে জনমত ও রাজনৈতিক বিতর্ককে তীব্র করতে পারে। তবে দ্বিতীয় বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের প্রমাণিত উদ্দেশ্য নয়; বরং আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা একটি বিশ্লেষণ।
কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনায় মহারাষ্ট্র বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ওই রাজ্যের বাসিন্দা। সরকারি সূত্রের ধারণা ছিল, তার নিজ রাজ্য থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ দিল্লির বিক্ষোভে যোগ দিতে পারেন। এ ছাড়া মহারাষ্ট্রে সক্রিয় বামপন্থী সংগঠনগুলো আন্দোলনে সমর্থন দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছিল। ৪ অক্টোবরের বৈঠকের দিনই মহারাষ্ট্র পুলিশের মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে রাজ্যের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে একটি গোপন চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বিক্ষোভে যোগ দিতে আগ্রহীদের দিল্লি যাওয়া থেকে বিরত রাখতে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে।
এরপর রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য বিক্ষোভকারীদের নোটিশ দেওয়া হয়। কয়েকজন আন্দোলনকারী অভিযোগ করেন, পুলিশ তাদের বাড়িতে গিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। কোথাও কোথাও দিল্লি যাওয়ার উপায়, যাত্রার সময় এবং ভ্রমণের খরচ কে বহন করছেন, সে সম্পর্কেও প্রশ্ন করা হয়েছে বলে পত্রিকাটির পৃথক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা দিপকে এসব পদক্ষেপকে আন্দোলনকারীদের ভয় দেখানোর চেষ্টা বলে অভিযোগ করেন। অন্যদিকে, মহারাষ্ট্র পুলিশের মহাপরিচালকের দপ্তরের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, রাজ্যজুড়ে ৫০টির কম নোটিশ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে এবং রাজ্য পুলিশ কাউকে আটক করেনি।
কিন্তু মুম্বাই পুলিশের পদক্ষেপের চিত্র ছিল আলাদা। পুলিশের সূত্রের বরাতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ৯ অক্টোবর শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়, যাতে তারা পরদিনের বিক্ষোভে যোগ দিতে দিল্লি যেতে না পারেন। এই তথ্যের সঙ্গে মহারাষ্ট্র পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্য পুলিশ আটক করার কথা অস্বীকার করলেও মুম্বাই পুলিশের সূত্র আটকের কথা জানিয়েছে। তাই পুরো মহারাষ্ট্রে আটক করা হয়নি—এমন বক্তব্যের বদলে রাজ্য পুলিশের দাবি ও মুম্বাই পুলিশের সূত্রের তথ্য আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
এখানে নজর দেওয়ার মতো আরেকটি বিষয় হলো, পুলিশের নজরদারি শুধু বিক্ষোভের দিন বা স্থানকে ঘিরে সীমাবদ্ধ ছিল না। আগের আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং নির্দিষ্ট সংগঠনের সদস্যদের দিল্লি যাত্রা ঠেকানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে কেন্দ্রীয় বৈঠক সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। আন্দোলনকারীদের অর্থের উৎস খুঁজে দেখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল বলে সরকারি সূত্র দাবি করেছে। অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের তদন্তের অংশ হতে পারে। কিন্তু শুধু কোনো আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা বা অর্থ সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করা হলে তার যৌক্তিকতা ও আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
এ কারণেই ঘটনাটিকে শুধু পুলিশের নিরাপত্তা প্রস্তুতি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। প্রশাসন জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতেই পারে; কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যক্তির চলাচল, সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার কতটা সীমিত করা হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়া এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত। তবে জনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এসব অধিকারের ওপর আইনসম্মত ও যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়। ফলে কোনো বিক্ষোভে সহিংসতার আশঙ্কা থাকলে পুলিশ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু আশঙ্কা আর প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। কোনো ব্যক্তি অতীতে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন কিংবা এবার দিল্লি যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন—শুধু এ কারণে তাকে আটকানো কতটা যুক্তিসংগত, সেই প্রশ্নও উঠছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ১০ অক্টোবর প্রকাশিত আইনি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে সিজেপির সমাবেশের অনুমতি দেয়নি। পুলিশের বক্তব্য ছিল, আয়োজকেরা ৭ অক্টোবর অনুমতির আবেদন করেন, অথচ এ ধরনের জমায়েতের জন্য অন্তত ১০ দিন আগে আবেদন করার নিয়ম রয়েছে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশও কার্যকর ছিল। ফলে অনুমতি ছাড়া সমাবেশ করার ক্ষেত্রে আইনগত বাধা ছিল। কিন্তু কোনো সমাবেশের অনুমতি না দেওয়া এবং দেশের অন্য প্রান্ত থেকে সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের যাত্রা আগেই আটকে দেওয়া এক ধরনের পদক্ষেপ নয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ব্যক্তির স্বাধীনতা সীমিত করার প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা নিয়ে আলাদা প্রশ্ন তৈরি হয়।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার নিয়ে এর আগে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। জুলাইয়ে সিজেপির আন্দোলন ঘিরে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত প্রতিবাদের অধিকার সংবিধানে স্বীকৃত। শুধু আন্দোলন হচ্ছে বলে পুলিশের বাড়াবাড়ি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একই সঙ্গে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এই পর্যবেক্ষণ বর্তমান ঘটনার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক: পুলিশকে সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে হবে, কিন্তু শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের একইভাবে বিবেচনা করা যায় না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দিক থেকেও আগাম ধরপাকড়ের তাৎপর্য রয়েছে। কোনো বিক্ষোভের সম্ভাব্য জনসমাগম ঠেকাতে প্রশাসন যদি মূলত অংশগ্রহণকারীদের যাত্রাপথ বন্ধ করা, তাদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেওয়া কিংবা আগের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারি বাড়ানোর ওপর নির্ভর করে, তাহলে প্রতিবাদের পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে বড় জমায়েত ঠেকানো সম্ভব হলেও অভিযোগ বা ক্ষোভের মূল কারণ দূর হয় না। বরং আন্দোলনকারীরা তাদের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ তুলতে পারেন। তবে এটি একটি বিশ্লেষণমূলক ঝুঁকি, সরকারের ঘোষিত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের ১০ অক্টোবরের প্রতিবেদনেও দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ধরপাকড়ের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। কেন্দ্রীয় এলাকায় মুঠোফোনের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয় এবং বহু মেট্রো স্টেশন ও বাজার বন্ধ ছিল। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং দলের কয়েকজন নেতাকে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর আটক করা হয় বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। বিরোধী নেতাদেরও আটক করার খবর দেয় রয়টার্স। একই প্রতিবেদনে বিজেপির বক্তব্যও এসেছে—দলটি বলেছে, বিরোধীরা নির্বাচনে জিততে না পেরে অনিয়মের অভিযোগ তুলছে। নির্বাচন কমিশনও ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ, বিক্ষোভের রাজনৈতিক পটভূমি ও প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধপূর্ণ বক্তব্য রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্নটি হলো, নিরাপত্তার প্রস্তুতি কি নির্দিষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলার মধ্যে সীমিত ছিল, নাকি সম্ভাব্য জনসমাগমকেই আগেভাগে ঠেকানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল? ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় বৈঠকে অতীতের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের দিল্লি যাত্রা ঠেকানো এবং প্রয়োজনে প্রতিরোধমূলক আটক করার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। মুম্বাইয়ে দুই শতাধিক ব্যক্তিকে আটকের তথ্যও সেই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তবে এসব পদক্ষেপের প্রতিটি ক্ষেত্রে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি ছিল, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তাদের কতক্ষণ আটক রাখা হয়েছিল—এসব তথ্য ছাড়া সব পদক্ষেপকে একই আইনি মানদণ্ডে বিচার করা কঠিন।
মোদি সরকারের জন্য আগের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা সরকারি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্য থেকে স্পষ্ট। জুলাইয়ের বিক্ষোভে প্রত্যাশার চেয়ে বড় জমায়েত এবং তার পর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ প্রশাসনের কাছে সতর্কবার্তা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সম্ভাব্য জমায়েত ছোট রাখা নয়; নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের সাংবিধানিক অধিকারও রক্ষা করা। সহিংসতার নির্দিষ্ট আশঙ্কা থাকলে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বিপরীতে, কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনার কারণে নাগরিকদের চলাচল আটকে দেওয়া হলে তা প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।
সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে ধরপাকড়ের ঘটনাটি তাই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এটি ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক, কেন্দ্রীয় সরকারের নিরাপত্তা-ভাবনা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যকার টানাপোড়েন সামনে এনেছে। আগের বিক্ষোভে সরকার যে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছিল, এবার তার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রশাসন আগেভাগে সক্রিয় হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত রয়েছে। কিন্তু জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের সাফল্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের বৈধতা পুরোপুরি বিচার করা যায় না। শেষ পর্যন্ত বিচার্য হবে, নিরাপত্তার যুক্তিতে নেওয়া ব্যবস্থাগুলো কতটা প্রয়োজনীয়, আইনসম্মত এবং নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
খবরটি শেয়ার করুন