শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ব্যাটারির রিকশার সর্বোচ্চ গতি ২৫ কিমি, নিবন্ধন ফি ৮-১০ হাজার টাকা *** ১ লাখ ৩১ হাজার ভোট ব্যবধানে বিজয়ী ধানের শীষ, আজ বিক্ষোভ জামায়াতের *** বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ১৭তম লন্ডন বাংলা বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব *** ভোটকেন্দ্রে জাল ভোটের চেষ্টা, হাতেনাতে ধরা তিন শিক্ষার্থী *** ‘অনেক বিচারক বেলা ১১টায় আসেন, দেড়টা-দুইটায় চলে যান—এটা চলবে না’ *** বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার: এখনই মন্তব্য করতে চান না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** ফের মার্কিন হামলা হলেও কয়েক মাস টিকে থাকার খাদ্য–জ্বালানি মজুত আছে ইরানের *** আজ ঢাকায় গাইবেন পাকিস্তানের মুর্তজা কিজিলবাশ *** দিল্লিতে পাকিস্তানকে আমন্ত্রণ জানাল ভারত *** শুধু ব্যবস্থা নেওয়া নয়, অপরাধের ঝুঁকি কমানো আমাদের লক্ষ্য: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ঢাকায় আফগান জঙ্গির অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৬:২৭ অপরাহ্ন, ৬ই মে ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

বাংলা স্ট্রিমে গতকাল মঙ্গলবার (৫ মে) প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রাজধানীর অদূরের একটি মাদ্রাসাকে ঘিরে অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিদেশি নাগরিকের অবস্থান এবং সম্ভাব্য জঙ্গি যোগাযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে আফগান নাগরিক নিয়ামাতুল্লাহ মাঙ্গালের বাংলাদেশে প্রবেশ, অবস্থান এবং পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন তেহরিকে তালিবান পাকিস্তানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়ামাতুল্লাহ মাঙ্গাল আফগানিস্তানের পাকতিয়া প্রদেশের বাসিন্দা। ১৯৯১ সালের ৩১ জুলাই জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তি ২০১৭ সালে পাসপোর্ট পেলেও সেটির মেয়াদ ২০২২ সালে শেষ হয়ে যায়। এরপর আর নবায়ন না করেই তিনি অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, তিনি ভারত হয়ে যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।

বাংলাদেশে প্রবেশের পর তিনি রাজধানীর অদূরে একটি কওমি মাদ্রাসায় প্রায় এক মাস অবস্থান করেন। এই সময় তার সঙ্গে যোগাযোগ হয় টিটিপির কথিত বাংলাদেশ শাখার প্রধান ইমরান হায়দারের। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি শুধু নিজেই যোগাযোগ রাখেননি, বরং মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে ওই ব্যক্তির পরিচয় করিয়ে দেন।

নিরাপত্তা সংস্থার একটি সূত্র জানিয়েছে, নিয়ামাতুল্লাহ দেশ ছাড়ার পর বিষয়টি তাদের নজরে আসে। এরপর সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসা পরিদর্শন করে তারা কিছু ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে। এর মধ্যে এক শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোনে ভয়েস ও টেক্সট বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যদিও এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই–বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

ঘটনাটির আন্তর্জাতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ আফগানিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, নিয়ামাতুল্লাহ দীর্ঘদিন পাকিস্তানে অবস্থান করেছেন। তবে তার বাংলাদেশে প্রবেশের বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয় ঘাটতির একটি ইঙ্গিত হতে পারে।

আইনগতভাবে বিষয়টি স্পষ্ট। বাংলাদেশে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কোনো বিদেশি নাগরিকের প্রবেশ ও অবস্থান শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ফরেনার্স অ্যাক্ট ১৯৪৬ অনুযায়ী, এ ধরনের অনুপ্রবেশ এবং তা সহায়তা করার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবু প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে একজন বিদেশি নাগরিক সীমান্ত অতিক্রম করে রাজধানীর কাছাকাছি এলাকায় দীর্ঘদিন অবস্থান করতে পারলেন, অথচ তাৎক্ষণিকভাবে তা নজরে আসেনি।

মাদ্রাসা পরিচালকের বক্তব্যে জানা যায়, নিয়ামাতুল্লাহকে দালালচক্র পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসে এবং পরে তাকে ‘মেহমান’ হিসেবে আশ্রয় দেওয়া হয়। তিনি দাবি করেছেন, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বিদেশি নাগরিককে রাখা যে বেআইনি—তা তার জানা ছিল না। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই ব্যাখ্যাকে যথেষ্ট বলে মনে করছেন না। তাদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানে অচেনা বিদেশিকে আশ্রয় দিলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

প্রতিবেদনটিতে মাদ্রাসার পরিচালকের অতীত কর্মকাণ্ডও আলোচনায় এসেছে। তার বিরুদ্ধে আগে উগ্রবাদী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি মুক্তি পান এবং আবার ধর্মীয় কার্যক্রমে সক্রিয় হন। একইভাবে, নিয়ামাতুল্লাহকে মাদ্রাসায় নিয়ে আসা খণ্ডকালীন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও অতীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলার তথ্য রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, যখন অতীতে উগ্রপন্থার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আবার সক্রিয় হন, তখন তাদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারণ তারা পুরোনো নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন করতে পারেন বা নতুন করে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।

প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তরুণ শিক্ষার্থীদের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ২১ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী নিয়ামাতুল্লাহর মাধ্যমে টিটিপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বর্তমানে পাকিস্তানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরিবারকে তিনি ‘উচ্চশিক্ষার’ কথা বলে রাজি করিয়েছেন।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, তরুণ বয়সে আদর্শগত প্রভাব গ্রহণের প্রবণতা বেশি থাকে। যদি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা নেটওয়ার্ক তাদের কাছে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপিত হয়, তাহলে তারা দ্রুত সেই দিকে আকৃষ্ট হতে পারে। এটি প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সব পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিয়ামাতুল্লাহ বাংলাদেশ ছাড়ার পর তারা বিষয়টি জানতে পারেন এবং তখন মাদ্রাসায় তদন্ত চালানো হয়। তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অনুপ্রবেশ নয়; বরং এটি বৃহত্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলো প্রায়ই সীমান্ত অতিক্রম করে সক্রিয় থাকে এবং দুর্বল নজরদারির সুযোগ নেয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা বলেন, বাংলাদেশ অতীতে জঙ্গিবাদ দমনে সফলতার নজির দেখিয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন ধরনের আন্তঃসীমান্ত সংযোগ তৈরি হচ্ছে। এসব মোকাবিলায় শুধু অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নয়, আঞ্চলিক সহযোগিতাও জোরদার করতে হবে।

সব মিলিয়ে, বাংলা স্ট্রিমে প্রকাশিত এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যু সামনে এনেছে। নিয়ামাতুল্লাহ মাঙ্গালের অনুপ্রবেশ, মাদ্রাসায় অবস্থান এবং সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়টি এখন তদন্তাধীন। তবে এটি স্পষ্ট যে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, গোয়েন্দা সমন্বয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের সচেতনতা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়, এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা হয়—সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট সবার।

জঙ্গি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250