ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬–এর ভোটগ্রহণের নির্ধারিত সময় শেষ হলো। সারাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট সম্পন্ন হয়েছে। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে ভোট ছিল শান্তিপূর্ণ।
নির্বাচন চলাকালে পৃথক ঘটনায় মোট চার ব্যক্তির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে কিছু অভিযোগ এসেছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১২ই ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দেড় বছর পর একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আজ ভোট দিলেন দেশের ভোটারেরা।
একই সঙ্গে ভোটারেরা গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট দিয়ে নিজেদের মত জানালেন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে তা হবে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের সূচনা।
প্রধান উপদেষ্টা বললেন ‘ঈদ মোবারক’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সকালে রাজধানীর গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন। ভোট দিয়ে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আজ নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন। আজ তার জীবনের মহাআনন্দের দিন। বাংলাদেশের সবার জন্য মহাআনন্দের দিন। মুক্তির দিন। দুঃস্বপ্নের অবসান, নতুন স্বপ্নের শুরুর দিন। সবাইকে মোবারকবাদ জানান তিনি। সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ঈদ মোবারক’।
‘বাংলাদেশ গণতন্ত্রায়নের ট্রেনে উঠে গেছে’
সকালে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভোট দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। ভোট দেওয়া শেষে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
নাসির উদ্দিন বলেন, আজকের ঐতিহাসিক ভোটগ্রহণের দিনের শুভসূচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্রায়নের ট্রেনে উঠে গেছে। বাংলাদেশ যে গণতন্ত্রের পথে রওনা দিয়েছে, গণতন্ত্রের এই ট্রেন স্টেশনে পৌঁছাবে, এটা তার দৃঢ় বিশ্বাস।
‘জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী’
সকালে একই কেন্দ্রে ভোট দেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও ঢাকা-১৭ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী তারেক রহমান। ভোট দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী বলে উল্লেখ করেন। দুপুরে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, নির্বাচন যদি নিরপেক্ষ হয়, বিতর্কহীন হয়, তাহলে তার দল ফলাফল মেনে নেবে।
‘সরকার গঠনে আশাবাদী’
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সকালে রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ভোট শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু, সন্ত্রাস ও দখলমুক্ত, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হোক, এটাই তাদের প্রত্যাশা। এই ভোটের মাধ্যমে এমন সরকার গঠন হোক, যা কোনো ব্যক্তি, পরিবার, দলের হবে না, যা হবে ১৮ কোটি মানুষের। তারা সেই সরকার গঠনের ব্যাপারে আশাবাদী। ভোট যদি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়, তারা সেই ফলাফল মেনে নেবেন। অন্যদেরও তা মানতে হবে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
‘আমরা সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে’
সকালে রাজধানীর বেরাইদের এ কে এম রহমত উল্লাহ কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তার দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট (১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য) গড়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ভোট দেওয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘১১–দলীয় জোট সরকার গঠনের লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে। আমরা মনে করছি, আমরা সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি।’
চারজনের মৃত্যু
ভোট চলাকালে দেশের তিন স্থানে পৃথক ঘটনায় তিন ব্যক্তির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাড়া খেয়ে রাজ্জাক মিয়া (৫৫) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের আগানগর দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রামে ভোট দিতে গিয়ে কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে এক ভোটারের মৃত্যু হয়েছে। তার নাম মো. মনু মিয়া (৫৭)। সকাল ৭টা ৩৫ মিনিটে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।
খুলনায় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে বিএনপির নেতা মহিবুজ্জামান কচি (৬০) মারা গেছেন। সকাল ৯টার দিকে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসার ভোটকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। মহিবুজ্জামান খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক ছিলেন।
বিএনপির অভিযোগ, মহিবুজ্জামান সকালে ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়েছিলেন। কেন্দ্রের ভেতরে ভোট চাওয়ার বিরোধিতা করলে প্রতিপক্ষ জামায়াতের লোকজন তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। এতে তিনি পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা সদরের কাচারি পাড়া এলাকায় সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম মিলনায়তন ভোটকেন্দ্রে সকাল আটটার দিকে জ্ঞান হারিয়ে হেলে পড়েন ২ নম্বর বুথের পোলিং কর্মকর্তা মো. মুজাহিদুল ইসলাম (৪৮)।
পরে লোকজন তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইসলামী ফাউন্ডেশনের শিক্ষক ছিলেন।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথদীঘি ইউনিয়নের আতাকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই ভোট গ্রহণ চলছিল। কুমিল্লা-১১ আসনের এই কেন্দ্রে সকাল থেকে ভোটারদের দীর্ঘ সারি ছিল। তবে দুপুর ১২টার দিকে কেন্দ্রটিতে একের পর এক ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে ভোটাররা প্রাণভয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার একটি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলাকালে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে দুই আনসার সদস্যসহ তিনজন আহত হন। আজ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রেশমা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ভোটকেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটে।
ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল ইসলাম জানান, সকাল থেকে কেন্দ্রটিতে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলছিল। এ সময় দুর্বৃত্তরা কেন্দ্রের বাইরে খালের ওপার থেকে ককটেল নিক্ষেপ করে। বিস্ফোরণে দায়িত্বরত দুই আনসার সদস্য এবং একজন ভোটারের সঙ্গে আসা শিশু আহত হয়। বিস্ফোরণের শব্দে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
আহতেরা হলেন আনসার সদস্য সুকন্ঠ মজুমদার ও জামাল হোসেন এবং পৌরসভার আরামবাগ এলাকার আসশাফ আলির মেয়ে আমেনা খানম (১৪)। তাদের স্থানীয় ক্লিনিক প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ জানায়, ঘটনায় ভোটকেন্দ্রের মূল ফটক আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে। ঘটনার পর কেন্দ্রটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন