ফাইল ছবি
নওগাঁর মান্দা উপজেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে প্রচার চালানো হয়েছে। গতকাল ২২ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের ছোট মুল্লুক গ্রামে ব্যাটারিচালিত একটি অটোরিকশায় মাইক লাগিয়ে প্রকাশ্যে এ প্রচার চালানো হয়।
প্রচারে দাবি করা হয়, আগামী ডিসেম্বর মাসে শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন। একই সঙ্গে দলমত-নির্বিশেষে তাকে স্বাগত জানানোর আহ্বান জানানো হয়। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, চলন্ত অটোরিকশায় মাইক লাগিয়ে এক যুবক প্রচার চালাচ্ছেন। শুরুতে তিনি মান্দা উপজেলাবাসীকে সালাম জানান। পাশাপাশি অন্য ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের প্রতি আদাব ও শুভেচ্ছা জানান তিনি। এরপর প্রচারে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কথা বলা হয়। প্রচারের শেষ দিকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়া হয়।
তবে প্রচারে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার যে সময়ের কথা বলা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নওগাঁয় নেতৃত্ব দেওয়া সমন্বয়ক ফজলে রাব্বী। তিনি এভাবে প্রকাশ্যে প্রচার চালানোর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে এমন প্রচার চালানোর সাহস পাচ্ছেন, কারণ বিগত সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকে এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন।
ফজলে রাব্বী বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে দিনের বেলায় জনবহুল এলাকায় এভাবে প্রকাশ্যে মাইকিং করা হলো। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের পুলিশরা বড় বড় চেয়ারে বহাল তবিয়তে থাকায় আজকের এই সাহস দেখিয়েছে আওয়ামী লীগ। এর দায় মান্দার ওসি এড়াতে পারেন না। এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা না হলে মান্দায় ওসি তার চেয়ারে থাকার যোগ্যতা হারাবেন।’
তার বক্তব্যে ঘটনাটিকে শুধু একটি প্রচার কার্যক্রম হিসেবে নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার প্রশ্ন হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। তবে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা বা কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে প্রচারকারীদের যোগসাজশের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফজলে রাব্বীর বক্তব্যকে তার অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
এ বিষয়ে মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফজাল হোসেন বলেন, মাইকিংয়ের সময় অটোরিকশায় বসে থাকা ১৪ বছর বয়সী এক শিশুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার মূলহোতা হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা টিপুকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে ওই নেতার পূর্ণ পরিচয়, তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং প্রচার কার্যক্রমের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিস্তারিত পুলিশি বক্তব্যে জানা যায়নি।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। অটোরিকশায় থাকা ১৪ বছর বয়সী শিশুটির ভূমিকা কী ছিল, সে নিজে প্রচারে অংশ নিয়েছিল কি না, নাকি অন্য কেউ তাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল—এসব বিষয়ও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। শিশুটিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ; তবে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ভিডিওটি ঘিরে প্রতিক্রিয়ার প্রধান বিষয় হচ্ছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলের নামে প্রকাশ্যে মাইকিং করার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো এবং প্রচারে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার যে সময় উল্লেখ করা হয়েছে, তার ভিত্তি কী। কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বলে ঘটনাটিকে ঘিরে আলোচনার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে এসব প্রতিক্রিয়ার সমর্থনে নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীর নাম, মন্তব্যের মূল বক্তব্য বা যাচাইযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সব ব্যবহারকারী একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
দেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারত চলে যান। এরপর থেকে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, দেশে ফেরার সম্ভাবনা এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক পরিসরে আলোচনা চলছে। তবে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা সমর্থকের বক্তব্য, দলীয় প্রচার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবি দিয়ে তার দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিত করা যায় না।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি আইনি ও কূটনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। তার বিরুদ্ধে আদালতে চলা মামলা, বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপট এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মান্দায় প্রচারিত বক্তব্যে এসব বিষয়ে কোনো তথ্য বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে ডিসেম্বর মাসে তার দেশে ফেরার দাবি কীসের ভিত্তিতে প্রচার করা হয়েছে, তা এখনো অস্পষ্ট।
খবরটি শেয়ার করুন