শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৮ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** সাজেক সড়কে অবরোধ অব্যাহত, রিসোর্টের ৬০ শতাংশ বুকিং বাতিল *** দ্রুততম মানব ইমরানুর, মুকুট ধরে রাখলেন শিরিনও *** ১৩ বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণে সহায়তা করেছিলেন মাদ্রাসাশিক্ষকের স্ত্রী, গ্রেপ্তার *** কোনো কিছুই পক্ষে নেই, কেন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি সৌদি যুবরাজ *** ‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন’ জানিয়ে নওগাঁয় মাইকিং *** ছাত্রীকে যৌন হয়রানির খবরে মহিলা মাদ্রাসায় আগুন, শিক্ষককে পুলিশে সোপর্দ *** ১৩ বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদরাসা শিক্ষক পলাতক *** টঙ্গীতে শিশুকে যৌন নিপীড়ন: মাদ্রাসাশিক্ষককে থাপ্পড়ের ভিডিও ভাইরাল, থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ *** বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্টের আগে সুখবর দিল বিসিবি *** সৌদির বিভিন্ন কারাগারে সাড়ে ৭ হাজার বাংলাদেশি বন্দি

সুখবর এক্সপ্লেইনার

কোনো কিছুই পক্ষে নেই, কেন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি সৌদি যুবরাজ

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৬:৫৯ অপরাহ্ন, ২৩শে অক্টোবর ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের যুবরাজ ও কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানের সামনে এখন একসঙ্গে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব পড়ছে তেল অবকাঠামো, বিমান চলাচল ও বিনিয়োগের পরিবেশে। একই সঙ্গে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা তিনি নিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের চাপও বাড়ছে। ফলে আধুনিক, সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় সৌদি আরব গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রায় এক দশক ধরে সৌদি আরবের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি তার শাসনামলের অন্যতম বড় পরীক্ষা। যে হুতি বিদ্রোহীদের সামরিকভাবে পরাস্ত করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি একসময় ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন, তারাই এখন সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়ে দেশটির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনাকে চাপে ফেলছে। জাপান টাইমসও ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন প্রকাশ করে যুবরাজের সামনে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের বিষয়টি তুলে ধরেছে।

চলতি অক্টোবরের শুরুতে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বিমানবন্দরে তৃতীয় দফার হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুই বাংলাদেশিও ছিলেন। হামলার পর বিমান চলাচল ব্যাহত হয়, একাধিক ফ্লাইট বাতিল করা হয় এবং কিছু উড়োজাহাজকে অন্য বিমানবন্দরে পাঠানো হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলাটি ছিল এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে প্রাণহানির দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি।

বিমানবন্দরে হামলার তাৎপর্য শুধু প্রাণহানি বা যাত্রীদের নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রিয়াদ সৌদি আরবের প্রশাসনিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র। রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, পর্যটক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের যাতায়াতেও প্রভাব পড়ে। সৌদি আরব যখন দেশটিকে বৈশ্বিক ব্যবসা ও পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, তখন এমন হামলা সেই উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

রয়টার্স জানায়, বিমানবন্দরে হামলার পরও সৌদি আরবের দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আসার খবর পাওয়া যাচ্ছিল। দেশটির নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে নতুন হামলার হুমকির কথা জানানো হয়। এর আগে হুতিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ফলে নিরাপত্তাঝুঁকিটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার বদলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে যুবরাজের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হলো, বিপুল সামরিক ব্যয় সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে কতটা নিরাপদ রাখা সম্ভব। সৌদি আরব বিশ্বের বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশগুলোর একটি। কিন্তু আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম থাকলেই সব ধরনের হামলা ঠেকানো যায় না। বিশেষ করে কম খরচে তৈরি করা বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যয়বহুল প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যবহার করতে হলে প্রতিরক্ষার খরচ দ্রুত বাড়ে। হামলাকারীকে প্রতিবার ঠেকানোর ব্যয় যদি প্রতিরোধী অস্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি হয়, তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে সেই প্রতিরক্ষা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।

রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুতিরা আবারও বড় পরিসরে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। তারা শুধু সৌদি আরবের শহর ও তেল স্থাপনাকে হুমকির মুখে ফেলছে না, লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। ওই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় সামরিক অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হলেও দেশটির দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অনেক বেশি কঠিন।

অর্থাৎ, সৌদি আরবের সামরিক শক্তি ও আর্থিক সামর্থ্য থাকলেও হুতিদের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং চূড়ান্ত সাফল্য নিশ্চিত করা সহজ নয়। ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা এবং সংঘাতের সঙ্গে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর বিরোধের সংযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, ইয়েমেনের ভেতরে অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হুতিরা এখন আগের তুলনায় বেশি বৈচিত্র্যময় সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে। ফলে শুধু অস্ত্র সরবরাহের পথ বন্ধ করে তাদের হামলার সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া কঠিন। অন্যদিকে, ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর সংঘাতের কারণে আঞ্চলিক দেশগুলোর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে।

সৌদি আরবের নিরাপত্তাসংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ছিল রিয়াদের প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার। কিন্তু বর্তমান সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সরাসরি সামরিক সহায়তা দেবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, যুবরাজের জন্য এখন মিত্রদের সমর্থন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, নিজের ভূখণ্ড রক্ষা করার পাশাপাশি তাকে এমন একটি অর্থনৈতিক রূপান্তর অব্যাহত রাখতে হচ্ছে, যার সাফল্য অনেকাংশে বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক আস্থার ওপর নির্ভরশীল।

তবে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সংকটের পুরোটা শুধু সাম্প্রতিক হামলার ফল নয়। দেশটির অর্থনীতিতে আগে থেকেই তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো, বিপুল উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় সামলানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ ছিল। মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে ২০১৬ সালে শুরু হওয়া ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির লক্ষ্য হলো পর্যটন, প্রযুক্তি, শিল্প, বিনোদন ও অন্যান্য খাতের বিকাশের মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি সম্প্রসারণ করা।

এই পরিকল্পনার আওতায় সৌদি আরব আন্তর্জাতিক পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করতে চেয়েছে। নতুন শহর নির্মাণ, বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ, খেলাধুলা ও বিনোদন আয়োজন এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে এসব খাতের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত সৌদি আরববিষয়ক মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, আঞ্চলিক যুদ্ধ বাণিজ্য, তেল রপ্তানি এবং তেলবহির্ভূত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সংস্থাটি তখন ২০২৬ সালে সৌদি আরবের মোট দেশজ উৎপাদনে ১ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সৌদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রাক্‌-বাজেট বিবৃতিতে ২০২৬ সালে প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার প্রাথমিক অনুমান দেওয়া হয়। এতে তেল খাতে ২১ দশমিক ৮ শতাংশ পতনের আশঙ্কার কথা বলা হয়। দুটি পূর্বাভাসের সময় ও পরিস্থিতি আলাদা; তাই এগুলোকে একই সময়ের হিসাব হিসেবে দেখা যাবে না।

বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহেও দুর্বলতার লক্ষণ রয়েছে। সৌদি আরবের সরকারি পরিসংখ্যানভিত্তিক তথ্যভান্ডার ‘ডেটা সৌদি’ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ ছিল ১৯ দশমিক ১ বিলিয়ন সৌদি রিয়াল, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ কম। তবে এই হিসাবটি আগের প্রান্তিকের সঙ্গে তুলনা; একে বছরওয়ারি পতন হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

বিনিয়োগকারীদের মনোভাব কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা ব্যাখ্যা করেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরাও। মার্কিন সাময়িকী ‘ফরচুনের’ এক প্রতিবেদনে সৌদি আরবের সরকারি বিনিয়োগ তহবিলের সাবেক জ্যেষ্ঠ পরিচালক জেমস রিভের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তার মতে, সৌদি আরবে আগে থেকে করা বিনিয়োগ রাতারাতি প্রত্যাহার করা না হলেও নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে নিরাপত্তাঝুঁকির প্রভাব পড়তে পারে। একই প্রতিবেদনে কিংস কলেজ লন্ডনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, বিমানবন্দরে হামলা ও যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব স্পষ্ট হলেও কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতা থেকেই সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ব্যর্থতা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সংকট কত দিন স্থায়ী হয়, সেটিই বড় বিষয়।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ আকাঙ্ক্ষা সামদানিও এক প্রতিবেদনে বলেছেন, হামলার প্রাথমিক প্রভাব ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ বাতিল হওয়ার বদলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে দেখা যেতে পারে। পর্যটন, আতিথেয়তা, বিমান পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল খাতগুলো তুলনামূলক দ্রুত প্রভাবিত হতে পারে। তার এই মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার অপেক্ষায় বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্পে অর্থ ঢালতে দেরি করতে পারেন।

অর্থনীতির এই চাপের সঙ্গে রয়েছে রাজস্ব ঘাটতি ও সরকারি ব্যয়ের প্রশ্ন। সৌদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সেপ্টেম্বরের প্রাক্‌-বাজেট বিবৃতিতে ২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ১ হাজার ৩৯২ বিলিয়ন রিয়াল ব্যয় এবং ১ হাজার ২০২ বিলিয়ন রিয়াল রাজস্বের প্রাক্কলন করা হয়েছে। ঘাটতির পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। এর অর্থ, উন্নয়ন পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সরকারকে ঋণ, ব্যয় ও রাজস্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

এখানে মোহাম্মদ বিন সালমানের রাজনৈতিক কৌশলের প্রশ্নও সামনে আসে। তার শাসনামলে নারীদের গাড়ি চালানোর অধিকার, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং বিনোদন খাত সম্প্রসারণের মতো পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনাও রয়েছে। তার আধুনিকায়ন কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো তরুণ জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নত জীবন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু নতুন শিল্প ও বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হলে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ বাড়বে।

সৌদি আরবের সামনে অবশ্য সব পথ বন্ধ হয়ে যায়নি। দেশটির বিপুল আর্থিক সম্পদ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল এবং তেল রপ্তানির সক্ষমতা সংকট সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। আইএমএফের মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও অর্থনীতিকে বহুমুখী করার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ দেশটিকে ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করতে পারে। তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সেই সক্ষমতার ওপরও চাপ বাড়বে।

এ অবস্থায় শুধু সামরিক হামলার জবাব দেওয়া দিয়ে যুবরাজের সমস্যার সমাধান হবে না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, তেলবহির্ভূত অর্থনীতির বিকাশ অব্যাহত রাখা এবং আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোও জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা কতটা পাওয়া যাবে, ইরান ও হুতিদের সঙ্গে সংঘাত কোন দিকে যাবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতা কতটা জোরদার করতে পারবে—এসব বিষয়ও তার সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে যুবরাজের বক্তব্যে অতীতের রাজপরিবারের ঐতিহ্য ও শাসনধারার ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টিও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ভবিষ্যতের আধুনিক সৌদি আরব গড়ার স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি তিনি এখন রাজপরিবারের দীর্ঘ শাসন-ঐতিহ্যকে নিজের নেতৃত্বের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছেন। বর্তমান সংকটে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে: উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতার বার্তাও দিতে চাইছেন তিনি।

তবে সৌদি আরবের সামনে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি একটিই—দেশটির নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি একই সঙ্গে কতটা রক্ষা করা সম্ভব। হুতিদের হামলা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, বিদেশি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায় এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়তে থাকে, তাহলে ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে।

বিপরীতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পারলে দেশটির আর্থিক সক্ষমতা ও চলমান সংস্কার কর্মসূচি সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য তাই এই পরীক্ষা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; দেশের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার ক্ষেত্রেও।

মোহাম্মদ বিন সালমান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250