ফাইল ছবি
শায়লা শবনম
দেশের রাজনীতিতে বহুবার নাটকীয় মোড় এসেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল প্রায় দুই বছর দেশে রাজনীতিই করতে পারছে না! ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের মুখে দলটি। কারণ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাহী আদেশে আরোপিত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের নিষেধাজ্ঞাকে এবার বিল আকারে সংসদে পাস করে আইনি ভিত্তি দিলো বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার!
সমালোচকেরা বলছেন, এ দেশের রাজনীতি কি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করাই একমাত্র পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে? নাকি এটি রাজনৈতিক বাস্তবতার এক কঠিন পরিণতি?
অথচ 'আওয়ামী লীগ' নামে এই দলটির নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরি হয়। এরপর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে লাল-সবুজ পতাকাখচিত 'বাংলাদেশ' নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিগত সরকারের পতনের পর সেই ঐতিহাসিক দলটি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সত্তায় পরিণত।
গত বুধবার (৮ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলো বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া দলটি এখন ইতিহাসের এক কঠিন ও অনিশ্চিত অধ্যায়ের মুখোমুখি।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়; বরং একটি ঐতিহাসিক ধারার প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—এই ধারাবাহিক সংগ্রামের প্রায় প্রতিটি অধ্যায়েই দলটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের নাম গভীরভাবে যুক্ত। ফলে দলটির বর্তমান নিষিদ্ধ অবস্থান রাজনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি এক ধরনের ঐতিহাসিক বিতর্কও তৈরি করেছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগ এক ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে। রাষ্ট্রক্ষমতা হারানো, সংগঠন ভেঙে পড়া, নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন—সব মিলিয়ে দলটি তখন প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগ আবার সংগঠিত হয়েছে। প্রবাসে থাকা নেতৃবৃন্দের উদ্যোগ, তৃণমূল কর্মীদের রাজনৈতিক আনুগত্য এবং জনসমর্থনের ওপর ভর করে দলটি ধীরে ধীরে রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আসে।
পরবর্তী দশকগুলোতে আওয়ামী লীগ দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। কখনো সরকারে, কখনো বিরোধী দলে—এই দুই ভূমিকাতেই দলটি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। দেশের বড় অংশের ভোটারদের কাছে দলটির একটি স্থায়ী সমর্থনভিত্তি রয়েছে—এমন ধারণাও দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা সেই ধারাবাহিকতাকে নাটকীয়ভাবে বদলে দেয়। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, সহিংসতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই সিদ্ধান্ত এখন সংসদীয় অনুমোদনের মাধ্যমে আইনি রূপ পেল।
এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমত রয়েছে। ক্ষমতাসীনদের দাবি—এটি জনমতের প্রতিফলন এবং গণঅভ্যুত্থানের দাবি পূরণের অংশ। তাদের মতে, যে দল বা সংগঠনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া যায় না। অন্যদিকে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকট কেবল আইনি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং এর পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও নানা বিতর্ক জমা হয়ে ছিল। ক্ষমতার দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্রীভূত হওয়া, বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সংঘাত, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ—এসব বিষয়ও দলটির বিরুদ্ধে জনমতের একটি অংশকে ক্ষুব্ধ করেছে বলে অনেকে মনে করেন।
তবে এটিও সত্য যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহাসিক শক্তি। একটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হলেও তার সামাজিক ভিত্তি বা রাজনৈতিক ঐতিহ্য একদিনে বিলীন হয়ে যায় না। দলটির অসংখ্য নেতাকর্মী এখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয়, যদিও তারা সংগঠিতভাবে রাজনীতিতে অংশ নিতে পারছেন না।
এই বাস্তবতায় বড় প্রশ্ন হলো—আওয়ামী লীগের সামনে এখন কোন পথ খোলা? রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, কঠিন সংকটের সময় দলগুলো সাধারণত তিনটি পথে হাঁটে: আত্মসমালোচনা ও পুনর্গঠন, নতুন রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ অথবা দীর্ঘ সময়ের জন্য রাজনৈতিক প্রান্তিকতায় চলে যাওয়া। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও সম্ভবত এই তিন সম্ভাবনার কোনো একটি সামনে আসবে।
কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ফলে যে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, সেগুলো নিয়ে আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, দলটির ঐতিহাসিক পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে নতুন করে সমর্থন সংগঠিত করার চেষ্টা হতে পারে।
দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ—রাজনীতির মাঠ কখনো দীর্ঘ সময় শূন্য থাকে না। একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হলে অন্য শক্তি সেই জায়গা পূরণ করার চেষ্টা করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি ক্ষমতায় এবং অন্যান্য দলও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। ফলে আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতির মাঠে ফিরে আসা আগের চেয়ে কঠিন হতে পারে।
তবে ইতিহাস বলছে, আওয়ামী লীগ অতীতেও একাধিকবার প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছে। ১৯৭৫–পরবর্তী সময়, সামরিক শাসনের বছরগুলো কিংবা বিরোধী রাজনীতির দীর্ঘ সময়— প্রতিবারই দলটি নতুন কৌশল নিয়ে ফিরে এসেছে। ফলে বর্তমান সংকটও হয়তো সেই দীর্ঘ ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় মাত্র।
প্রশ্নটি এখন আর শুধু নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নয়; বরং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পথ নিয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতি কি আবারও সেই দলটিকে ফিরে পাবে, যে দল একসময় স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়েছিল? নাকি ইতিহাসের মোড়ে এসে দলটি নতুন রূপে আবির্ভূত হবে? উত্তরটি সময়ই দেবে।
প্রেক্ষাপট যেমনই হোক নিশ্চিতভাবে বলা যায়—দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অধ্যায় এখানেই শেষ হয়ে গেছে, এমন ঘোষণা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। বরং নিষিদ্ধ রাজনীতির এই অধ্যায় হয়তো ভবিষ্যতের আরও বড় রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।
ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো শক্তি স্থায়ীভাবে বিলীন হয়ে যায় না; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন রূপে ফিরে আসে। তবে এটিও সত্য, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা একটি দল হঠাৎ নিষিদ্ধ হয়ে গেলে তার সাংগঠনিক কাঠামো দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান। অনেকেই অন্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পথ খোঁজেন। ফলে সংগঠনগতভাবে টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগের সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্যও এই সিদ্ধান্ত সহজ কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়। একটি বড় রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ রেখে দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক রাজনীতি চালিয়ে যাওয়া কতটা সম্ভব— সেই প্রশ্নও সামনে আসছে। কারণ শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি দেশের রাজনীতির এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। এটি যেমন একটি দলের রাজনৈতিক যাত্রার কঠিন অধ্যায়, তেমনি দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। ইতিহাসে আওয়ামী লীগ বহুবার প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে এবং আবার ফিরে এসেছে। এবারও সেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হবে কি না— তার উত্তর সময়ই বলে দেবে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন