শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৮ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান *** রুয়েটের বাসে প্রধানমন্ত্রী, ‘স্নাইপারের অভাব ছিল’ মন্তব্যের জেরে আইনের আওতায় বাবা-ছেলে *** প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা, মিরপুরে গ্রেপ্তার ১ *** প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকালে রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় রাখার সিদ্ধান্ত *** মাজারের সিন্দুক ও মসজিদের দানবাক্স ভেঙে টাকা চুরি *** এআই-ছবি ছড়িয়ে ঘৃণা উসকে দেওয়া সব ধর্মের জন্য অবমাননাকর: রুমিন ফারহানা *** সাজেকে পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর গুলি, ৩ হাজার পর্যটক উদ্ধার *** সাজেককে ঘিরে ‘কী হচ্ছে’, প্রশ্ন শফিকুর রহমানের *** সৌদি আরবে ১২ বছরে ২০৮৪ জনের মৃত্যুদণ্ড, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ১০০ *** সারোগেসি পদ্ধতিতে প্রথম সন্তানের অপেক্ষায় নেদারল্যান্ডসের প্রথম সমকামী প্রধানমন্ত্রী

‘নারী চালক মানেই নারী যাত্রী হতে হবে কেন’

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ১০:১৩ অপরাহ্ন, ১৮ই আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

নারী চালক হলে নারী যাত্রীই হতে হবে—এমন ধারণার সমালোচনা করেছেন লেখক ও নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন। তিনি বলেছেন, নারীদের জন্য আলাদা বাস সাময়িক ও ঐচ্ছিক নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে কাজে লাগতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হওয়া উচিত নারী-পুরুষ সবার জন্য নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করা। আজ মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তসলিমা নাসরিন এসব কথা বলেন।

তার বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বাংলাদেশে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট বাস চালুর উদ্যোগ। চলতি বছরের মার্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকায় নারীদের জন্য আলাদা বাসসেবা চালুর নির্দেশ দেন। পরে সরকার জানায়, সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) এই বাসে নারী চালক, কন্ডাক্টর ও সহকারী রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। জুনে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, নারীদের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজ দুপুরে তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ট্রাক ডিপোতে এ সেবার উদ্বোধন করেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

তসলিমা নাসরিন তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, বাংলাদেশ প্রথম দেশ নয় যেখানে নারীদের জন্য আলাদা বাস চালু হয়েছে। ভারতের বিহারে ২০২৫ সাল থেকে নারীদের জন্য ‘উইমেন-অনলি’ (শুধু নারীদের জন্য) ‘পিংক বাস’ চলছে এবং ২০২৬ সালে নারী চালকেরাও এসব বাস চালাচ্ছেন। পাকিস্তানের লাহোর ও করাচিতেও নারীদের জন্য আলাদা বাস চালুর উদাহরণ রয়েছে। নেপালের কাঠমান্ডুতেও এ ধরনের বাস চালু হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিহারের প্রসঙ্গে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিহার স্টেট রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের প্রথম ছয় নারী বাসচালক ‘পিংক বাস’ চালানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। এসব বাস নারীদের জন্য নির্ধারিত।

তবে নারীদের জন্য আলাদা পরিবহনব্যবস্থাকে স্থায়ী বা আদর্শ সমাধান মনে করেন না তসলিমা। তার মতে, যেখানে নারীরা নিয়মিত হয়রানির শিকার হয়ে পড়াশোনা, চাকরি বা স্বাভাবিক চলাফেরা পর্যন্ত ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, সেখানে আলাদা বাস স্বল্পমেয়াদে নিরাপত্তা দিতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাব্যবস্থাও জরুরি।

তসলিমার বক্তব্যের পক্ষে কিছু গবেষণার তথ্যও রয়েছে। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোর শহরতলির রেলব্যবস্থা নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় ৩৬৩ নারী যাত্রীর প্রায় ২২ হাজার যাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণ অংশে যাতায়াতকারী নারীরা মোট যাত্রার ১৮ শতাংশে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। আর নারী-নির্ধারিত অংশে যাতায়াতের সুযোগ পাওয়া নারীরা শারীরিক হয়রানির শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ শতাংশ কম ঝুঁকিতে ছিলেন। গবেষণাটি নিয়ে ভক্সডেভ (ভক্স ডেভেলপমেন্ট, উন্নয়নবিষয়ক গবেষণা প্ল্যাটফর্ম) বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে।

তবে একই গবেষণা ও এ বিষয়ে প্রকাশিত বিশ্লেষণে আলাদা পরিবহনব্যবস্থার একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, নারীকে আলাদা জায়গায় সরিয়ে দেওয়ার ফলে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে নারীদের নিরাপদ থাকার জন্য পুরুষদের থেকে আলাদা থাকাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ হয়রানির দায় অপরাধীর বদলে পরোক্ষভাবে নারীর চলাচলের ওপর গিয়ে পড়তে পারে। এ বিষয়ে মেক্সিকো সিটির নারী-নির্দিষ্ট পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে গবেষণাতেও অনুরূপ বিতর্ক পাওয়া গেছে।

মেক্সিকো সিটির মেট্রোরেল নিয়ে ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, নারী-নির্দিষ্ট কামরা চালুর ফলে নারীদের যৌন হয়রানি প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ পয়েন্ট কমেছিল। তবে একই সঙ্গে পুরুষদের মধ্যে যৌন নয় এমন আগ্রাসী আচরণ—যেমন গালাগাল বা ধাক্কাধাক্কি—১৫ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছিল। গবেষকেরা অবশ্য বলেন, এই ফলাফল থেকে নারী-নির্দিষ্ট পরিবহনের সুবিধা তার ক্ষতির চেয়ে কম—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

এই বিষয়টিই সামনে এনে তসলিমা লিখেছেন, নারীকে সরিয়ে দিলে হয়রানিকারী পুরুষের আচরণ বদলায় না। তার প্রশ্ন, নারী-নির্দিষ্ট বাস থেকে নামার পর একজন নারী কোথায় যাবেন? অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়, বাজার, রাস্তা কিংবা পরিবার—সব জায়গাতেই তো নারী-পুরুষ পাশাপাশি থাকেন। তাই তার মতে, ‘কিছু পুরুষ নারীকে হয়রানি করে, অতএব নারীকে পুরুষ থেকে সরিয়ে দাও’—এটি স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।

তসলিমা নাসরিনের মতে, সমাধান হওয়া উচিত হয়রানিকারীকে থামানো, আইনের আওতায় আনা ও শাস্তি দেওয়া এবং ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের নারী-পুরুষের সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা দেওয়া। একই সঙ্গে গণপরিবহনে ভিড় কমানো, পর্যাপ্ত আলো, নিরাপদ বাসস্টপ, সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা), দ্রুত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত কর্মী ও পুলিশ এবং ‘জিরো টলারেন্স’ (কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার) নীতি কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

তার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নারী চালক ও নারী যাত্রীকে একই ধারণায় না দেখার আহ্বান। তসলিমার মতে, নারীকে বাসচালক, কন্ডাক্টর বা পরিবহনকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপ। এতে পুরুষ-অধ্যুষিত একটি পেশায় নারীর প্রবেশ ঘটে। কিন্তু নারী চালক মানেই যে বাসের যাত্রীও নারী হতে হবে, তা নয়। একজন নারী চালক পুরুষ ও নারী—দুই ধরনের যাত্রী নিয়েই বাস চালাতে পারেন। বরং এতে আরও শক্তিশালী বার্তা যায় যে নারী শুধু নারীদের জন্য কাজ করবেন না, তিনি পুরো সমাজের পরিবহনব্যবস্থার অংশ।

তাই তসলিমা নাসরিনের প্রস্তাব, নারীদের জন্য আলাদা বাস যদি প্রয়োজন হয়, তা অতিরিক্ত ও সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে রাখা যেতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন নিরাপদ মিশ্র গণপরিবহনব্যবস্থা (নারী-পুরুষ সবার জন্য একই পরিবহন) তৈরি করা, যেখানে আলাদা বাসের প্রয়োজনই থাকবে না। তার ভাষায়, সমতার চূড়ান্ত লক্ষ্য আলাদা করে রাখা নয়; একই জায়গায় নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

নারীর অধিকার ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে তসলিমা নাসরিনের নিজের জীবন দীর্ঘদিন ধরে নির্বাসনের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তার লেখালেখি ও বিশেষ করে ‘লজ্জা’ উপন্যাসকে ঘিরে ধর্মীয় মৌলবাদীদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন তিনি। ১৯৯৩ সালে সিলেটে তার হত্যার জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল বলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরের বছরও বিভিন্ন ইসলামপন্থী গোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে মৃত্যুর আহ্বান জানায়।

১৯৯৪ সালে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং ওই বছরই বাংলাদেশ ছাড়েন। এ সময়ের ঘটনাবলি নিয়ে এপি আর্কাইভ (অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সংরক্ষণাগার)-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামি মৌলবাদীদের দেওয়া মৃত্যুর হুমকির কারণে নাসরিন বাংলাদেশে নির্বাসিত জীবন বেছে নিতে বাধ্য হন। প্রতিবেদনে তাকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকা একজন লেখক হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

জার্মানির ডি য়ৎসাইট পত্রিকার ১৯৯৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নাসরিনের মাথার জন্য অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল এবং মৌলবাদী নেতারা তার মৃত্যুর দাবি তুলেছিলেন।  পরে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর ১৯৯৮ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে ঘোষিত ৫০ হাজার টাকার পুরস্কারের হুমকি তখনও তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বড় বাধা ছিল।

দীর্ঘ নির্বাসনের পর গত ৩১ জুলাই কলকাতায় ফেরেন তসলিমা নাসরিন। প্রায় ১৯ বছর পর তার এই ফেরা। ২০০৭ সালে তার ‘দ্বিখণ্ডিত’ বইকে কেন্দ্র করে কলকাতায় সহিংস বিক্ষোভের পর তাকে শহর ছাড়তে হয়েছিল। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া তার ২০২৬ সালের কলকাতা প্রত্যাবর্তনকে ২০০৭ সালের ঘটনার পর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ফিরে আসা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

৩১ জুলাই কলকাতায় পৌঁছে তসলিমা বলেন, সেখানে ফিরে তার ভালো লাগছে। পরদিন ১ আগস্ট কলকাতার রবীন্দ্র সদনে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। দ্য ইকোনমিক টাইমস তার এই প্রত্যাবর্তনকে আবেগঘন ‘হোমকামিং’ (ঘরে ফেরার অনুভূতি) হিসেবে তুলে ধরে।

ফলে নির্বাসনের দীর্ঘ ইতিহাসের পর কলকাতায় ফিরে নারী-নিরাপত্তা, নারীর চলাচলের স্বাধীনতা ও সমতার প্রশ্নে তসলিমার নতুন করে বক্তব্য দেওয়া তার দীর্ঘদিনের লেখালেখি ও অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর নারী-নির্দিষ্ট বাস নিয়ে তার আজকের বক্তব্যের মূল প্রশ্নটি হলো—নারীকে নিরাপদ রাখতে কি তাকে আলাদা করতে হবে, নাকি এমন একটি সমাজ ও পরিবহনব্যবস্থা তৈরি করতে হবে যেখানে নারী-পুরুষ পাশাপাশি থেকেও সমান নিরাপদ থাকবেন?

তসলিমা নাসরিন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250