শনিবার, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আওয়ামী লীগকে কী নিষিদ্ধই করতে যাচ্ছে সরকার?

উপ-সম্পাদকীয়

🕒 প্রকাশ: ০৯:০৬ অপরাহ্ন, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

শায়লা শবনম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত প্রশ্ন— বর্তমান সরকার কী বাস্তবে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে কার্যত নিষিদ্ধ করার পথে হাঁটছে? সরাসরি নিষেধাজ্ঞার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ, আইনগত উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য মিলিয়ে এমন একটি ধারণা রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে যে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে ধীরে ধীরে কোণঠাসা করার একটি প্রক্রিয়া হয়তো চলমান।

রাজনীতিতে দল নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিশ্ব ইতিহাসে নতুন নয়। তুরস্ক, পাকিস্তান, মিশর কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে বিভিন্ন সময় সরকার রাজনৈতিক দল বা আন্দোলনকে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি সবসময়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। কারণ একটি বড় রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা মানে কেবল একটি সংগঠনকে থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং তার সঙ্গে যুক্ত লাখো কর্মী-সমর্থক, ভোটার এবং একটি রাজনৈতিক ধারাকে কার্যত অকার্যকর করে দেওয়া।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহাসিক দল। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটি ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়া এই দলটি পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায়ও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছে। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে যে কোনো প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় রাজনীতিতে বড় আলোচনার জন্ম দেয়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বহুবার রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে যেতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় দলটির ওপর নানা ধরনের চাপ ছিল। সামরিক শাসনের সময়ও দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত ছিল। কিন্তু সেই সময়েও আওয়ামী লীগ রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের সংগঠন টিকিয়ে রেখেছিল। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় দলটি আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরে আসে।

ইতিহাস বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো সমাজে বড় রাজনৈতিক শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া সহজ নয়। কারণ রাজনৈতিক দল শুধু সংগঠন নয়; এটি সামাজিক সমর্থন, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং রাজনৈতিক পরিচয়েরও প্রতিফলন।

সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা, সংগঠনগত কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা এবং মাঠের রাজনীতিতে উপস্থিতি কমে যাওয়ার নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব পদক্ষেপকে আইনি প্রক্রিয়া বা প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও সমালোচকরা বলছেন, এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে দলটির রাজনৈতিক ক্ষেত্র সংকুচিত করা হচ্ছে।

রাজনীতিতে একে অনেক সময় ‘কার্যত নিষিদ্ধ’ অবস্থা বলা হয়। অর্থাৎ কাগজে-কলমে দলটির অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে সভা-সমাবেশ, সংগঠন পরিচালনা বা রাজনৈতিক কর্মসূচি চালানো কঠিন হয়ে যায়। এতে দলটির রাজনৈতিক প্রভাব কমে আসে। এক পর্যায়ে দলটি কাগজে-কলমে থাকলেও কার্যত রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব হারায়।

 এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর তার প্রভাব কী হতে পারে—সেটিও এখন আলোচনার বিষয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বড় একটি রাজনৈতিক দলকে মাঠের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিলে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি দুর্বল হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক গতিও ব্যাহত হতে পারে।

 সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপ মিলিয়ে একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে দলটি আইনি ভাবে নিষিদ্ধ না হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

তবে সরকারের সমর্থকরা এই বিশ্লেষণকে পুরোপুরি অস্বীকার করছেন। তাদের মতে, আইনের শাসনের প্রশ্নে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল বিশেষ সুবিধা পেতে পারে না। যদি কোনো নেতার বিরুদ্ধে আইনি অভিযোগ থাকে, তবে তা তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোবে। এটিকে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে আইনের বাইরে রাখা হলে সেটিই বরং আইনের শাসনের পরিপন্থী হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজপথের আন্দোলন বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক দল— সবাই কোনো না কোনো সময় আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। ফলে একটি দল প্রশাসনিক বা আইনি চাপে পড়লেও রাজনীতির বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বড় রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত তিনভাবে সংকট মোকাবিলা করে— সংগঠন পুনর্গঠন, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক কৌশলের পরিবর্তন। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে এমন কোনো পরিবর্তন দেখা যেতে পারে বলে তারা মনে করেন।

অন্যদিকে যদি রাজনৈতিক ক্ষেত্র সংকুচিত হতে থাকে, তাহলে তার প্রভাব পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে। প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি দুর্বল হলে গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একটি শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি না থাকলে সংসদীয় রাজনীতির কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, কোনো বড় দলকে দীর্ঘ সময় রাজনীতি থেকে দূরে রাখা প্রায় অসম্ভব। রাজনৈতিক শক্তির সামাজিক ভিত্তি থাকে। নেতৃত্ব দুর্বল হতে পারে, সংগঠন ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু সেই রাজনৈতিক ধারা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।

এই বাস্তবতার কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, রাজনৈতিক সমস্যার শেষ সমাধান রাজনৈতিক পথেই খুঁজতে হয়। সংলাপ, নির্বাচনি প্রতিযোগিতা এবং জনগণের ভোটের মাধ্যমেই রাজনৈতিক শক্তির প্রকৃত অবস্থান নির্ধারিত হয়।

বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে এ দেশের রাজনৈতিক সমস্যা-সংকটসহ স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে মূল প্রশ্নটি শুধু আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ পথে? দেশ কি আরও সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক পরিসরের দিকে এগোবে, নাকি আবারও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হবে?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, কোনো বড় দলকে দীর্ঘ সময় রাজনৈতিকভাবে আটকে রাখা প্রায় অসম্ভব। রাজনৈতিক শক্তি সমাজের ভেতরেই থাকে। কোনো দল দুর্বল হতে পারে, নেতৃত্ব বদলাতে পারে, কিন্তু তার সামাজিক ভিত্তি একদিনে মুছে যায় না। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পথেই খুঁজতে হয়। সংলাপ, প্রতিযোগিতা এবং জনগণের ভোটের মাধ্যমেই রাজনৈতিক শক্তির প্রকৃত অবস্থান নির্ধারিত হয়।

আওয়ামী লীগকে কার্যত নিষিদ্ধ করার সম্ভাবনা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেটি হয়তো কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক। আবার এটিও হতে পারে ভবিষ্যতের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের ইঙ্গিত। তবে যে পথই সামনে আসুক, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির ধারাকে টিকিয়ে রাখাই হবে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

শায়লা শবনম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250