ছবি: সংগৃহীত
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যানের দুটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে। আজ সোমবার তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া আলাদা দুটি পোস্টে জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর জামিন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং গুমবিরোধী অধ্যাদেশ নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এবং নেটিজেনদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
প্রথম পোস্টে ডেভিড বার্গম্যান উল্লেখ করেন, শিরীন শারমিন চৌধুরীকে শুরুতেই আটক করা উচিত হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেহেতু গ্রেপ্তারের ভিত্তি দুর্বল ছিল, তাই ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জামিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত ‘সম্পূর্ণ সঠিক’। তবে একই সঙ্গে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন—শিরীন শারমিন চৌধুরীর মতো যারা প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার ও আটক হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রেও কি একইভাবে আদালত জামিন দেবেন?
বার্গম্যান তার পোস্টে ইঙ্গিত দেন, বিচারিক সিদ্ধান্তে সমতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তার মতে, যদি কোনো ব্যক্তির প্রভাব বা ‘সঠিক জায়গায়’ যোগাযোগ থাকার কারণে শিরীন শারমিন চৌধুরী সুবিধা পান, তবে তা বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। বিশেষ করে আইনমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে শিরীন শারমিনের সম্পর্ক আছে কিনা ইঙ্গিত করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আদালতের সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীনভাবে নেওয়া হচ্ছে।
বার্গম্যান বলেন, শিরীন শারমিন চৌধুরীর মুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে, এখন কি আদালত তাদেরও জামিন দেবেন, যারা তার মতোই প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার ও আটক হয়েছেন—নাকি চৌধুরী শুধু এতটাই সৌভাগ্যবান যে তার ‘সঠিক জায়গায়’ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, বিশেষ করে আইনমন্ত্রীর কাছাকাছি প্রভাবশালী মহলে?
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আদালতকে অবশ্যই ন্যায়সংগত ও ধারাবাহিকভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। শুধু নির্বাহী বিভাগের ‘সবুজ সংকেত’ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হলে বিচার বিভাগ কার্যত নির্বাহী বিভাগের অংশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তার এই মন্তব্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, একই দিনে দেওয়া আরেকটি পোস্টে ডেভিড বার্গম্যান গুমবিরোধী অধ্যাদেশ নিয়ে সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে সরকারের অন্যতম যুক্তি—জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ইতিমধ্যেই আইসিটির আওতায় বিচারযোগ্য—‘অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর’।
বার্গম্যানের ব্যাখ্যায়, আইসিটির এখতিয়ার সীমিত। এটি কেবল সেইসব ঘটনার বিচার করতে পারে, যেগুলো একটি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ‘ব্যাপক বা পদ্ধতিগত’ আক্রমণের অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ জোরপূর্বক গুম এই মানদণ্ড পূরণ করে না। ফলে সাধারণ গুমের ঘটনাগুলো আইসিটির আওতার বাইরে থেকে যেতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি গুমবিরোধী অধ্যাদেশ কার্যকর না হয়, তাহলে বহু ঘটনা বিচারবহির্ভূত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, এতে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে কেবল বড় পরিসরের বা সংগঠিত গুমের ঘটনাই বিচার পাবে, কিন্তু বিচ্ছিন্ন বা কম সংখ্যক ঘটনা উপেক্ষিত থাকবে।
বার্গম্যান আরও অভিযোগ করেন, এই অধ্যাদেশ আটকে দেওয়ার ফলে একটি ‘আইনি শূন্যতা’ তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে গুমের ঘটনার বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তার ভাষায়, এর ফলে আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো কার্যত বিচারের বাইরে থেকে যেতে পারে—যদি না সেগুলো আন্তর্জাতিক আইনের নির্ধারিত উচ্চমাত্রার মানদণ্ডে পড়ে।
ডেভিড বার্গম্যানের এসব বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ব্যবহারকারী তার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত পোষণ করে মন্তব্য করেছেন যে, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তাদের মতে, আইনের প্রয়োগে বৈষম্য থাকলে তা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
অন্যদিকে, কিছু নেটিজেন বার্গম্যানের মন্তব্যকে একপাক্ষিক বলেও অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, দেশের বিচারব্যবস্থা ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া একটি জটিল বিষয়, যা বিশ্লেষকদের সরলীকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। কেউ কেউ আবার মনে করছেন, গুমবিরোধী আইন নিয়ে সরকারের অবস্থান বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আইনবিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, গুমের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে আলাদা আইন থাকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাদের মতে, জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর আইন থাকলে ভুক্তভোগীরা দ্রুত বিচার পেতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রেও আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
খবরটি শেয়ার করুন