রবিবার, ২৫শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** চার দিনের সরকারি সফরে আজ রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী *** সৌদিতে ২ বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের ঘটনার তথ্য চেয়েছে সংসদীয় কমিটি *** বাংলাদেশে ফের বিদ্যুৎ পাঠানো শুরু করেছে নেপাল *** নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে বট, প্রতিপক্ষকে আক্রমণে এআই *** ‘স্নাইপার এর অভাব ছিল’—মন্তব্য করা সেই যুবক ৭ দিনের রিমান্ডে *** হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে মামলা করলেন আসিফ আকবর *** টঙ্গীতে শিশুকে যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষকের জামিন নামঞ্জুর *** মাদকসংশ্লিষ্টতায় দুই মাসে ২৭ পুলিশ সদস্যকে জেলে পাঠানো হয়েছে: আইজিপি *** তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** ফের সোনার দামে বড় পতন, ভরিপ্রতি যত হলো

৫৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার একই মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী, যে কারণে এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, ২২শে আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

সরকারের মন্ত্রিসভায় রদবদলের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তৈরি হয়েছে একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি। একই মন্ত্রণালয়ে এখন দুজন প্রতিমন্ত্রী। আগে থেকেই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। নতুন করে একই পদে যুক্ত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। গতকাল শুক্রবার (২১ আগস্ট) তিনি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করবেন কি না, তা নিয়ে আলাদা করে সরকারি প্রজ্ঞাপন ও দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

স্বাধীনতার পর দেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে একই মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী রাখার এমন সিদ্ধান্ত বিরল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একজন প্রতিমন্ত্রী থাকার পরও হুমায়ুন কবিরকে কেন একই পদে আনা হলো?

কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হতে পারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নতুন আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। গত জুনে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৩ সদস্যের সংস্থাটির ভোটে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করেন। প্রায় ৪০ বছর পর বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয়বারের মতো এই পদে বসছেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হয়েছিলেন।

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে আগামী ৮ সেপ্টেম্বর। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। এক বছরের জন্য সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে হবে খলিলুর রহমানকে। এই দায়িত্বে তাকে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক, সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে।

খলিলুর রহমানের এই দায়িত্ব পালনের বিষয়টি অবশ্য তার জাতিসংঘের প্রার্থিতার সময়ই সামনে এসেছিল। গত ১৩ মে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তার একটি মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে অ্যান্ডোরার প্রতিনিধি তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করবেন কি না। জবাবে খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, পদত্যাগ করবেন না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে এক বছরের জন্য দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে পূর্ণকালীনভাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেবেন।

এই বক্তব্যের সঙ্গে গতকাল মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের একটি যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, খলিলুর রহমান যখন জাতিসংঘের দায়িত্বে ব্যস্ত থাকবেন, তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন রাজনৈতিক নেতৃত্বে একজন অতিরিক্ত প্রতিমন্ত্রীর প্রয়োজন হতে পারে। সেই জায়গা থেকেই হুমায়ুন কবিরকে প্রতিমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

হুমায়ুন কবির এই সরকারের কাছে নতুন কেউ নন। গত ছয় মাস তিনি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করা, বিদেশি প্রতিনিধি ও কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা বিষয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়েও তাকে সক্রিয় দেখা গেছে। গত ২০ আগস্ট তিনি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা ও মানবিক সংস্থা মেদসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়েরের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

কূটনৈতিক মহলের মতে, গত ছয় মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার কারণে হুমায়ুন কবির সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার ও কৌশল সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা পেয়েছেন। ফলে খলিলুর রহমানের অনুপস্থিতিতে মন্ত্রণালয়ের কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তার মতো একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিককে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া সরকারের কাছে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হয়ে থাকতে পারে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, হুমায়ুন কবির তো প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবেই কাজ করছিলেন। তাহলে তাকে আবার প্রতিমন্ত্রী করার প্রয়োজন হলো কেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে পদমর্যাদার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। উপদেষ্টা সরকারের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কাজ করতে পারেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব আলাদা। বিদেশি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং সরকারি পর্যায়ের আলোচনায় প্রতিমন্ত্রীর ভূমিকা আরও সরাসরি ও প্রাতিষ্ঠানিক। ফলে খলিলুর রহমানের অনুপস্থিতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব শক্তিশালী করার জন্য হুমায়ুন কবিরকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়ে থাকতে পারে।

তবে এর একটি অংশ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শুধু প্রটোকল বা বিদেশি মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের সুবিধার জন্য একজন উপদেষ্টাকে প্রতিমন্ত্রী করা প্রয়োজনীয় ছিল—এমন সিদ্ধান্তে সরাসরি পৌঁছানো ঠিক হবে না। সরকার বিশেষ দায়িত্ব দিলে একজন উপদেষ্টাও বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন এবং সরকারের অবস্থান তুলে ধরতে পারেন। তাই হুমায়ুন কবিরের নতুন পদকে শুধু ‘প্রটোকলগত সুবিধা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। বরং খলিলুর রহমানের অনুপস্থিতিতে মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই বড় কারণ হতে পারে বলে তারা মনে করেন।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ইতিমধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে হুমায়ুন কবিরকে নিয়োগের সিদ্ধান্তকে শুধু শূন্য পদ পূরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি দায়িত্ব ভাগাভাগি করে কাজ করার একটি কাঠামো হতে পারে। সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডেও শামা ওবায়েদ ও হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন কাজে সক্রিয় দেখা গেছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই বৈঠকের উপস্থিতির তালিকাটিও বর্তমান কাঠামোটি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সামগ্রিক নীতি ও মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে থাকবেন। শামা ওবায়েদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করবেন। আর হুমায়ুন কবির প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখছিলেন। এখন তাকে প্রতিমন্ত্রী করার ফলে এই তিনজনের দায়িত্ব আরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমন্বয় করার সুযোগ তৈরি হলো।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, এতে দায়িত্বের overlapping বা একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিও রয়েছে। একই মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী থাকলে কে কোন বিষয় দেখবেন, কার সিদ্ধান্তের পরিধি কতটুকু হবে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে কে কার্যত মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব দেবেন—এসব বিষয় স্পষ্ট না থাকলে সমন্বয়হীনতা তৈরি হতে পারে। তাই নিয়োগের পাশাপাশি দায়িত্ব বণ্টন স্পষ্ট করাটাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সরকারের বর্তমান সিদ্ধান্তের সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা হিসেবে সামনে আসছে খলিলুর রহমানের জাতিসংঘের দায়িত্ব। তিনি পদত্যাগ না করে এক বছরের জন্য পূর্ণকালীনভাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন—এমন প্রতিশ্রুতিই নির্বাচনের আগে দিয়েছিলেন। ফলে সরকার এখন তার অনুপস্থিতির সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কার্যকর রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন ব্যাখ্যাই বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন অনেক কূটনৈতিক বিশ্লেষক।

সেই হিসাবে হুমায়ুন কবিরের নিয়োগকে আকস্মিক বা অপ্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি হিসেবে দেখার চেয়ে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে দেখার যুক্তি বেশি। গত ছয় মাসে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা, খলিলুর রহমানের সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে তার ভূমিকা—সব মিলিয়ে তাকেই মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত রাজনৈতিক দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

অর্থাৎ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী রাখার আপাত অস্বাভাবিক সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ সম্ভবত একজন প্রতিমন্ত্রীর প্রয়োজন বাড়ানো নয়; বরং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক দায়িত্বের কারণে তার অনুপস্থিতির সময় মন্ত্রণালয়ের কাজের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। আর সেই দিক থেকে দেখলে, ৫৫ বছর পর একই মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী রাখার সিদ্ধান্তটি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি বিশেষ সময়ের জন্য নেওয়া কৌশলগত ব্যবস্থা বলেই মনে হয়।

শামা ওবায়েদ ইসলাম হুমায়ুন কবির

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250