প্রতীকী ছবি (সংগৃহীত)
রবিউল হক
বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির ভাণ্ডারকে পূর্ণতা দান করেছে লোকসংগীত। এদেশের লোকসংগীত খুবই বৈচিত্র্যময়। নানান বিষয় নিয়ে নানান প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে লোকগান। এর মধ্যে ধান-পাট নিড়ানোর গানও লক্ষ করা যায়। ধান-পাট বুননের পর কিছুটা বড় হলে তা নিড়ানি দেয়ার সময় যে গান গাওয়া হয় যা জারি গান হিসেবে বিবেচ্য। অফুরান আনন্দে মেতে ক্ষেত খামারের কাজ করতে করতে যখন তারা করুণ অথচ মধুর সুরে গান গাওয়া শুরু করে তখন মেয়েরা কুড়ে ঘরের বেড়ায় কান পেতে সেই গান শোনে। আবার কেউ কেউ পাট ক্ষেতের সরু আলে দাঁড়িয়ে পাটশাক তোলে ও মনের আনন্দে চাষীদের গান শোনে। চাষীরা গেয়ে ওঠে:
ওকি দাদারে-আইসে মানুষ দাদা
বিকিয়া না খান ক্যানে।
আশে পাশে দাদা গুয়া পান কাটে
যৌবোন জ্বালায় দাদা পান না বাচে রে!
ওকি দাদারে-আইসে মানুষ দাদা
বিকিয়া না খান ক্যানে।
আইসে মানুষ দাদা বইসে কাচে
বুকের কাপড় দাদা আপনে পড়ে রে!
ওকি দাদারে- আইসে মানুষ দাদা
বিকিয়া না খান ক্যানে।
আবার তারা কখনো কখনো দুঃখের সঙ্গে গেয়ে ওঠে:
ধুয়া: কালারে তব মন ভালা না
তর সনে পীরিত কইরা
আমার সুখ হইল না।
আর ভালা..
জল ভর যয়বতী কইন্যা
জলে দিছ গো ঢেউ
হাসি মুখে কওনা কথা ঘাটে নাই আর কেউ রে।।
আর ভালা..
নিত্যি নিত্যি যাও গো কইন্যা
যাও আমারে বাড়াইয়া
আইজকা পাইয়াছি লাগুল
না দিবাম ছাড়িয়া রে।।
আর ভালা..
আরো পড়ুন : বাংলার কৃষক বিদ্রোহের গান
এসব গান ছাড়াও পাটক্ষেত নিড়ানোর সময় ময়মনসিংহ জেলায় “নাল্যার বারমাসী” গান গীত হয়। নিম্নে নাল্যার বারমাসী গানটি নমুনা স্বরূপ:
পৌষ না মাসেতে ভাইরে পুষ্প অন্ধকারী
নাল্যার লাগি গিরস্তেরা নালয় ঘরবাড়ি।
দিশা: ও নিলকে, শরীর কল্লাম কালারে ভাই নাল্যা নিড়াইতে।।
মাঘ না মাসেতে ভাইরে ক্ষেতে দিলাম আল (চাষ)।
লাঙন ভাঙলাম জোয়াল ভাঙলাম আরো ভাঙলাম ফাল।।
ফালগুন মাসেতে ভাই ক্ষেতে দিলাম মই।
দুবরা ভেদাল্যা কয় আমরা যাইবাম কই।।
চৈত্র না মাসেতে ভাইরে রবির বড় জ্বালা।
নাল্যা ক্ষেতে গোবর ফালতে শরীর কল্লাম কালা।।
বৈশাখ মাসেতে ভাইরে নাল্যার ফালরাম আলি
বাকি আলি (বীচি) বেচ্যা আনলাম ভাউজের লাগ্যা বাল।।
নাল্যা নিড়াও গো তুমি ধানত নিড়াও না।
গোসা করইয়া বইয়া থাকবাম ভাতত রানতাম না।।
জ্যৈষ্ঠি না মাসেতে ভাইরে নাল্যার আল্যা পড়ে আগা।
নাল্যা বেচ্যা কিনন্যা আনবাম ভাউজের লাগ্যা তাগা।।
আষাঢ় মাসেতে ভাইরে গাঙে নয়া পানি।
ইউরীর আগে বউয়ে কয় ‘নাইওর যাইতাম আমি’।।
অগ্রান মাসেতে ভাইরে সবে নয়া যায়।
নাল্যা বেচার যত ট্যেহা খাজনা-কাজনায় খায়।।
ও নিলকে, শরীর কালা কল্লামরে ভাই নাল্যা নিড়াইতে।।
তথ্যসূত্র
১. সামীয়ূল ইসলাম, বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের শ্রেণীবিন্যাস, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৭
২. সিরাজউদ্দিন কাশিমপুরী, বাংলাদেশের লোকসংগীত পরিচিতি।
৩. সামীয়ূল ইসলাম, উত্তর বাংলা লোকসাহিত্য।
এস/ আই.কে.জে/