ছবি: সংগৃহীত
একটি শিশুর হাতে যখন বই, সনদ বা পুরস্কার ওঠে, তখন সেটি কেবল একটি অর্জনের স্বীকৃতি নয়; বরং তার কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রতি সমাজের আস্থারও প্রকাশ। সেই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করার লক্ষ্যেই সৃষ্টি বিশ্বময় ও লন্ডন বাংলা বইমেলা পর্ষদের উদ্যোগে আয়োজিত শিশু–কিশোর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ২০২৫–এর পুরস্কার ও সনদ বিতরণের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে।
দুই দিনের এই আয়োজন শুধু পুরস্কার বিতরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না; শিশুদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিক বিকাশ নিয়ে অভিভাবক, অতিথি ও আয়োজকদের আন্তরিক ভাবনা–বিনিময়ে তা পরিণত হয় এক আনন্দঘন মিলনমেলায়।
পুরস্কার ও সনদ বিতরণের দ্বিতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় গত ৩১ জুলাই, শুক্রবার ঢাকার কাটাবনে অবস্থিত ‘সুখবর ডটকম’ কার্যালয়ে। এ পর্বে ঢাকা, ময়মনসিংহ, আখাউড়া ও শ্রীমঙ্গলের প্রতিযোগীরা অংশ নেয়। বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী শিশু–কিশোরদের হাতে পুরস্কার ও সনদ তুলে দেন ‘সুখবর ডটকম’-এর সম্পাদক, কবি ও সংস্কৃতিপ্রেমী খোকন কুমার রায়, অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান শাহীন, নীলমণি আইচ, সানোয়ারা জাহান নীতু, জাকারিয়া সুমন, অ্যাডভোকেট মুন্নী এবং সৃষ্টি বিশ্বময়ের সাধারণ সম্পাদক ও লন্ডন বাংলা বইমেলা পর্ষদের বাংলাদেশ প্রতিনিধি অলক দাশগুপ্ত। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিযোগীদের অভিভাবকেরাও।
এর পরদিন, ১ আগস্ট, শনিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটায় নারায়ণগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় পর্যায়ের পুরস্কার ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠান। এতে নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের প্রতিযোগীরা অংশ নেয়। বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী শিশু–কিশোরদের হাতে পুরস্কার ও সনদ তুলে দেন সৃষ্টি বিশ্বময়ের সহসভাপতি পুলক রাহা, আবৃত্তিশিক্ষক ও সংগঠক পিন্টু সাহা, সীমা ধর, বর্ষা রাহা, বৈশাখী সাহা এবং সৃষ্টিবিশ্বময়ের সাধারণ সম্পাদক ও লন্ডন বাংলা বইমেলা পর্ষদের বাংলাদেশ প্রতিনিধি অলক দাশগুপ্ত। এ অনুষ্ঠানেও বিপুলসংখ্যক অভিভাবক উপস্থিত থেকে শিশুদের উৎসাহিত করেন।
দুই পর্বের অনুষ্ঠানেই ছিল উৎসবের আবহ। পুরস্কার গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি শিশু–কিশোর প্রতিযোগীরা গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন করে নিজেদের প্রতিভার বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটায়। তাদের প্রাণবন্ত পরিবেশনা উপস্থিত অতিথি, অভিভাবক ও দর্শকদের মুগ্ধ করে।
প্রতিটি পরিবেশনার পর করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং অভিভাবকদের আন্তরিক উপস্থিতি আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত ও অর্থবহ করে তোলে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শিশু–কিশোরদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময়। আলোচনায় উঠে আসে শিশুদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীল চিন্তা, আত্মবিশ্বাস এবং সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবার ও সমাজের ভূমিকার বিষয়টি। বক্তারা বলেন, শিশুর বিকাশ শুধু প্রথাগত শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সাহিত্য, সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য ও অন্যান্য সৃজনশীল চর্চাও তার ব্যক্তিত্ব গঠনে সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আলোচনায় বক্তা ও অভিভাবকেরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, এমন এক সময়ে এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন সামাজিক পরিবেশ থেকে শিশু–কিশোরদের খেলার মাঠ, সংস্কৃতিচর্চা এবং সেই চর্চার পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। এই বাস্তবতায় লন্ডন বাংলা বইমেলা পর্ষদ ও সৃষ্টিবিশ্বময়ের উদ্যোগকে তারা সময়োপযোগী ও কালজয়ী উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেন। তাদের মতে, শিশুদের হাতে প্রযুক্তির পাশাপাশি বই, শিল্প ও সংস্কৃতির অনুষঙ্গও তুলে দিতে হবে, যাতে তারা মানবিক ও সৃজনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
অনুষ্ঠানে অভিভাবকদের উদ্দেশে সন্তানদের নিয়মিত সাহিত্য পাঠে উৎসাহিত করা, সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্যসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে নানা পরামর্শ দেওয়া হয়। অভিভাবকেরাও তাদের মতামত তুলে ধরে বলেন, এ ধরনের আয়োজন শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যতে দেশের আরও বেশি অঞ্চলে এ ধরনের আয়োজন ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তারা।
আয়োজকদের ভাষ্য, শিশু–কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি তাদের মধ্যে সাহিত্যপ্রেম, সাংস্কৃতিক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশু–কিশোরদের একত্রিত করে তাদের সৃজনশীল বিকাশের সুযোগ তৈরি করা এবং একটি মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও সংস্কৃতিমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়েই সৃষ্টিবিশ্বময় ও লন্ডন বাংলা বইমেলা পর্ষদ কাজ করে যাচ্ছে।
আয়োজকেরা জানান, প্রতি বছরের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এ বছরও এই প্রতিযোগিতা অনলাইনে অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আরও বেশি শিশু–কিশোরকে সম্পৃক্ত করে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বিস্তৃত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা। এ উদ্যোগ সফল করতে প্রতিযোগীদের আন্তরিক অংশগ্রহণ এবং অভিভাবকদের সহযোগিতার জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আয়োজকেরা।
একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের স্বপ্ন, কল্পনা ও মানবিক বোধের ওপর। সেই স্বপ্নকে লালন করার জন্য প্রয়োজন বই, সংস্কৃতি, শিল্পচর্চা এবং সৃজনশীলতার অনুকূল পরিবেশ। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের এই দুই দিনের আয়োজন যেন সেই বার্তাই নতুন করে মনে করিয়ে দিল—পুরস্কার কেবল সাফল্যের স্বীকৃতি নয়, বরং আগামী দিনের আলোকিত, সংস্কৃতিমনস্ক ও মানবিক প্রজন্ম নির্মাণের পথে একেকটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
খবরটি শেয়ার করুন