ছবি: সংগৃহীত
বাউলশিল্পীদের নিয়ে দেওয়া বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে সমালোচনার মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন বাউলশিল্পী হাসিনা সরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিও বক্তব্যে তিনি দাবি করেছিলেন, নারী বাউলশিল্পীদের অনেক সময় কুপ্রস্তাবের মুখে পড়তে হয় এবং ‘বেডে’ না গেলে অনুষ্ঠান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি। তবে তার এই বক্তব্য বাউল অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পরে আজ বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন এবং সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
ভিডিও বার্তায় হাসিনা সরকার বলেন, “সকল বাউলশিল্পীর কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। সবাই যেন আমাকে আগের মতো আগলে রাখেন, সেই প্রত্যাশা করছি।” তিনি আরও বলেন, তার বক্তব্যে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আগের ভিডিওতে হাসিনা সরকার অভিযোগ করেছিলেন, নারী শিল্পীদের অনেক সময় অনৈতিক প্রস্তাবের মুখে পড়তে হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা বিশেষ ‘লিংক’ ছাড়া অনেক সময় অনুষ্ঠান পাওয়া যায় না। সেই বক্তব্যকে ঘিরে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ তার বক্তব্যকে সাহসী বলে উল্লেখ করেন, আবার অনেকে অভিযোগ করেন, তিনি পুরো বাউল অঙ্গনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
সমালোচনার মুখে বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা ভিডিও বার্তায় হাসিনা সরকার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তিগতভাবে নানা ধরনের চাপ ও অপমানের মুখে পড়েছিলেন তিনি। তার দাবি, মিরপুরে থাকা তার একটি অফিস কিছু লোক এসে বন্ধ করে দেয়। শুধু তা–ই নয়, ‘হাসিনা সরকার’ নাম থাকার কারণেও বিভিন্ন মঞ্চ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “অনেক জায়গায় বলা হয়েছে, হাসিনা সরকার নামে কোনো শিল্পী গান গাইতে পারবে না। শিল্পীদের ক্লাব থেকে আমাকে গানের অফার দেওয়া হলেও পরে সেটা অন্য শিল্পীদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।” এই শিল্পীর ভাষ্য, দীর্ঘদিনের হতাশা ও ক্ষোভ থেকেই তিনি বিতর্কিত মন্তব্যটি করেছিলেন। তিনি বলেন, “রাগের মাথায় বলেছিলাম, যার সঙ্গে যার লিংক থাকে, তাদের অনুষ্ঠান দেওয়া হয়। আমার সঙ্গে কারও সম্পর্ক না থাকায় আমাকে ডাকা হয় না। এটা বলা আমার ভুল হয়েছে।”
ভিডিও বার্তায় তিনি আরও উল্লেখ করেন, কিছু অদক্ষ শিল্পী অনুষ্ঠান পেলেও প্রকৃত বাউলশিল্পীরা অনেক সময় অবহেলিত হন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তার বক্তব্যে যদি বাউল অঙ্গনের কেউ আহত হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি সবার কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। হাসিনা সরকারের ক্ষমা চাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার অবস্থানকে মানবিকভাবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন, আবার কেউ মনে করছেন, প্রমাণ ছাড়া এমন মন্তব্য করা দায়িত্বজ্ঞানহীন ছিল।
ফেসবুকে সাংস্কৃতিক কর্মী পরিচয়ে পরিচিত নেটিজেন রাফি মাহমুদ লিখেছেন, “একজন শিল্পী যখন ক্ষোভ থেকে কথা বলেন, তখন তার কথার ভেতরে ব্যক্তিগত কষ্টও থাকে। হাসিনা সরকারের বক্তব্য হয়তো অতিরঞ্জিত ছিল, কিন্তু শিল্পীদের ভেতরের প্রতিযোগিতা ও অনিয়মের প্রশ্ন একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।” নেটিজেন সাবিহা নওরীন মন্তব্য করেন, “কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেটা প্রমাণসহ বলা উচিত। পুরো বাউল সম্প্রদায়কে বিতর্কের মধ্যে ফেলা ঠিক হয়নি। ক্ষমা চাওয়াটা ভালো সিদ্ধান্ত।”
ইউটিউবে হাসিনা সরকারের ভিডিওর নিচে আরেক ব্যবহারকারী মাহিরুল ইসলাম লিখেছেন, “মানুষ ভুল করতে পারে। কিন্তু নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস সবার থাকে না। তিনি অন্তত সেটা করেছেন।” তবে সমালোচনাও কম হয়নি। নেটিজেন সোহেল রানা লিখেছেন, “ভাইরাল হওয়ার জন্য অনেকেই এখন যেকোনো মন্তব্য করেন। পরে আবার ক্ষমা চান। এতে শিল্পীদের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়।”
বাউল সংগীত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই বলছেন, এই ঘটনা শিল্পীদের ভেতরের হতাশা, প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাউলশিল্পী বলেন, “অনুষ্ঠান বণ্টন, গ্রুপিং কিংবা পরিচয়ের ভিত্তিতে সুযোগ পাওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। তবে সেটা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার আগে দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি।”
সংস্কৃতিবিষয়ক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে শিল্পীদের ব্যক্তিগত বক্তব্যও মুহূর্তেই জনপরিসরের আলোচনায় চলে আসে। ফলে আবেগের বশে দেওয়া মন্তব্য বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পীদের মানসিক চাপ, পেশাগত অনিশ্চয়তা ও সামাজিক আক্রমণের বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
হাসিনা সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। একদিকে তিনি নিজের বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন, অন্যদিকে শিল্পীজীবনের হতাশা ও অবহেলার কথাও তুলে ধরেছেন। ফলে ঘটনাটি কেবল একটি বিতর্কিত মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক, প্রতিযোগিতা এবং শিল্পীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
বাউল সংগীত দেশের লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ধারার শিল্পীরা দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ সমাজ, মেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে মানুষের কাছে গান পৌঁছে দিচ্ছেন। তাই এই অঙ্গনকে ঘিরে যেকোনো বিতর্ক সহজেই জনমনে আলোচনার জন্ম দেয়। হাসিনা সরকারের মন্তব্য ও পরবর্তী ক্ষমা প্রার্থনাও তার ব্যতিক্রম নয়।
এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনার পর বাউল অঙ্গনের ভেতরে নতুন কোনো আলোচনা বা আত্মসমালোচনার জায়গা তৈরি হয় কি না। তবে আপাতত নিজের বক্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করে সহশিল্পীদের কাছে আগের মতো সমর্থন ও ভালোবাসা চেয়েছেন হাসিনা সরকার।
খবরটি শেয়ার করুন