রবিবার, ২২শে মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৭ই চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘খায়রুল হক, সেলিনা আইভীসহ অনেকে বিএনপির আমলেও মনগড়া মামলার শিকার’ *** সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে প্রধানমন্ত্রীর ফোন *** হামলার ঝুঁকির মধ্যেই খোলা আকাশের নিচে ইরানিদের ঈদের নামাজ *** তারকারা কে কোথায় আছেন ঈদের ছুটিতে *** পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশে *** গ্যাস-সংকটে রান্না বন্ধ, ভারতে দলে দলে বাড়ি ফিরছেন পোশাকশ্রমিকেরা *** নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেলথ মিথ ভেঙে দিল ইরান *** কতটা ছড়ালো ঈদের সিনেমার নতুন গান *** ঈদে মুক্তি পেল ৫ সিনেমা, সবচেয়ে বেশি হলে শাকিব খানের ‘প্রিন্স’ *** যমুনায় সর্বসাধারণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন প্রধানমন্ত্রী

‘খায়রুল হক, সেলিনা আইভীসহ অনেকে বিএনপির আমলেও মনগড়া মামলার শিকার’

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১১:৫১ অপরাহ্ন, ২১শে মার্চ ২০২৬

#

ফাইল ছবি

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যানের অভিযোগ, বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, কিংবা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী শুধু  নন; বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে আরও অনেকে মনগড়া ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ মামলার শিকার হচ্ছেন। জামিনে তাদের মুক্তি ঠেকাতে মনগড়া ‘গ্রেপ্তার দেখানোর’ মামলা দায়ের করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। এ ধরনের কৌশল ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিএনপি আসলে কিভাবে আওয়ামী লীগ, এমনকি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়ে আলাদা? জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এ বিষয়ে নীরব থেকেছে—যা অন্তত এই ইঙ্গিত দেয় যে, তারা রাষ্ট্রের দমনমূলক যন্ত্রের এই ব্যবহারকে সমর্থন করছে। এই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক আটকগুলোর বিরুদ্ধে কি একজনও বিএনপি বা জামায়াতের রাজনীতিক প্রতিবাদ জানিয়েছেন?

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী ও প্রসিকিউটরদের ওপর যদি এমন চাপ সৃষ্টি করা হয় যে, তারা পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের রাজনীতিকদের অথবা তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যদের জুলাই ২০২৪ সালের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করেন, তাহলে এতে পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তার মতে, এই ট্রাইব্যুনাল যদি যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়ার ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়ে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে এটি আগের আওয়ামী লীগ আমলের ট্রাইব্যুনালের মতোই একটি বিষাক্ত সুনাম অর্জনের গুরুতর ঝুঁকিতে পড়বে।

গত বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া দুটি পোস্টে ডেভিড বার্গম্যান এসব কথা বলেন। তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি কর্তৃপক্ষের ভেরিফায়েড করা নয়। তবে সুখবর ডটকম নিশ্চিত হয়েছে, অ্যাকাউন্টটি ডেভিড বার্গম্যান নিজেই পরিচালনা করেন।

বার্গম্যান একটি ফেসবুক পোস্টে বলেন, ৩ মার্চ ২০২৬ সালে আওয়ামী লীগের এক সাবেক সংসদ সদস্যের ছেলে শাহেদ আহমেদ মজুমদার জুলাই ২০২৪ সালের একটি হত্যা মামলায় জামিন পান। কিন্তু তার পরিবার যখন মুক্তির প্রত্যাশায় ছিল, তখনই পুলিশ তাকে আরেকটি অনুরূপ মামলায় ‘গ্রেপ্তার দেখায়’। এ পোস্টের মন্তব্যের ঘরে তিনি গত রোববার ডেইলি স্টারে প্রকাশিত নিজের লেখা কলামের লিংক সংযুক্ত করেন।

দেশে জামিন পাওয়ার পরও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো বা শ্যেন অ্যারেস্ট করার প্রবণতা আবারও ফিরে আসছে—এমন উদ্বেগ ডেইলি স্টারের ওই কলামে প্রকাশ করেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। তিনি মনে করেন, এই ধরনের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে অতীতে যে ধরনের আইনের অপব্যবহার হয়েছিল, তা পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি করবে এবং বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে।

ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে রোববার—কন্টিনিউড ইউজ অব পোস্ট-বেইল ‘শোন অ্যারেস্টেড’ কেইসেস রিস্কস রিপিটিং পাস্ট অ্যাবিউজেস—শিরোনামে প্রকাশিত কলামে তিনি লেখেন, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একই ধরনের বিতর্কিত কৌশল ব্যবহার করা হলে তা আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াবে।

বার্গম্যানের মতে, আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও কোনো ব্যক্তিকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে আটকে রাখা হলে সেই জামিন কার্যত অর্থহীন হয়ে যায়। তিনি বলেন, এটি বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হলে তা গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

কলামে ডেভিড বার্গম্যান স্মরণ করিয়ে দেন যে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের পক্ষ থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে যদি একই ধরনের আটক ও গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে, তবে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

তার মতে, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যদি রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পায়, তাহলে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বার্গম্যান আরও উল্লেখ করেন, ফৌজদারি কার্যবিধির একটি বিধান অনুযায়ী কারাগারে থাকা কোনো ব্যক্তিকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটকে নিশ্চিত হতে হবে যে আবেদনের পেছনে যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই শর্ত প্রায়ই কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কলামে তিনি উল্লেখ করেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক একাধিক মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পরও আরেকটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়। যদিও সেই মামলার মূল এফআইআরে তার নাম ছিল না।

তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। একাধিক মামলায় জামিন পাওয়ার পরও তাকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই ঘটনাগুলো বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় বলে মন্তব্য করেন বার্গম্যান।

এদিকে গত রোববারের ফেসবুক পোস্টে ডেভিড বার্গম্যান লেখেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী এবং চট্টগ্রামভিত্তিক ধর্মীয়-রাজনৈতিক সংগঠন মুনিরিয়া যুব তাবলিগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্রাট রোবায়েত নতুন চিফ প্রসিকিউটরের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ঘুষ নিয়ে সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর ছেলেকে গ্রেপ্তার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এবং দাবি করেছেন যে “৫৫ জন সাক্ষী” তার নাম উল্লেখ করেছেন।

তিনি লেখেন, রোবায়েত মুনিরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহকর্মীদের নিয়ে, পূর্বে চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফজলে করিম চৌধুরীর প্রাথমিক আটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যে আটকাদেশগুলো তখন কোনো প্রমাণভিত্তিক ছিল না। তিনি চৌধুরীর ফাঁসির দাবিতে আন্দোলনও করেছেন। এখন দেখা যাচ্ছে, তিনি চৌধুরীর ছেলে ফারাজের গ্রেপ্তারের জন্য চাপ দিচ্ছেন—আবারও কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি ‘জুলাই হত্যাকাণ্ড ও আওয়ামী এমপি: কাঠগড়ায় কি ভুল মানুষ’ শিরোনামে প্রথম আলোতে প্রকাশিত কলামে বার্গম্যান বলেন, আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে ভুল মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ফজলে করিমের নির্বাচনী এলাকা রাউজানে (যা চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে) জুলাইয়ের অস্থিরতার সময় কোনো গুলির ঘটনা ঘটেনি, কেউ গুরুতর আহত হননি, এমনকি কোনো আন্দোলনকারী নিহতও হননি।’

তিনি বলেন, ‘ফজলে করিম চৌধুরীর আটকাদেশ দেওয়ার কয়েক মিনিট পরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বাইরে এক তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করেন দুজন। এই দুজন হলেন আবদুল্লাহ আল মামুন ও জুবায়ের আহমেদ। তারা ফজলে করিমের সাবেক নির্বাচনী এলাকা রাউজানকেন্দ্রিক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী মুনিরিয়া যুব তাবলিগ-এর সঙ্গে যুক্ত। কেউ কেউ এই সংগঠনটিকে একটি স্বাভাবিক ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে দেখেন।’

তিনি বলেন, ‘আবার অনেকের মতে এটি চরমপন্থী এবং ভূমি দখলসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। মুনিরিয়ার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ কতটা সত্য, তা আলাদা বিষয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে রাউজানের সংসদ সদস্য থাকাকালে ফজলে করিম ও মুনিরিয়া যুব তাবলিগের মধ্যে প্রায়ই পরষ্পর বিরোধিতা হয়েছে। ফজলে করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তাদের অপরাধমূলক তৎপরতা দমনে চেষ্টা করেছিলেন।’

বার্গম্যান বলেন, ‘ফজলে করিমের পরিবার মনে করে, এই দ্বন্দ্বই তার দীর্ঘ আটক থাকার মূল কারণ। তাদের দাবি—এখন প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে মুনিরিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা চাপ সৃষ্টি করছেন, আর সেই চাপের ফলেই তার বিরুদ্ধে মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া এগোচ্ছে। এটা নিশ্চিতভাবেই দেখা যাচ্ছে যে মুনিরিয়ার সঙ্গে যুক্ত এবং নতুন কিছু ছাত্রগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা বারবার ফজলে করিমের আটক, বিচার, এমনকি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।’

তিনি বলেন, এই মামলার দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কৌঁসুলি আবদুল্লাহ নোমান স্বীকার করেছেন, ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার জন্য ট্রাইব্যুনালের ওপর বাইরের কিছু গোষ্ঠী চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কৌঁসুলিরা এমন চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন না।

ডেভিড বার্গম্যান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250