ফাইল ছবি
বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি কে—এ প্রশ্নের কোনো আইনসিদ্ধ উত্তর নেই। অনেকে বলে থাকেন, শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব দেশের প্রথম ফার্স্ট লেডি। এরপর খালেদা জিয়া দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও জনপ্রিয় ফার্স্ট লেডি। এর কোনো আইনগত, বা আনুষ্ঠানিক ভিত্তি নেই। দেশে ফার্স্ট লেডির বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়। তখন আনুষ্ঠানিকভাবে তার স্ত্রী রওশন এরশাদকে ফার্স্ট লেডি ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমান ফার্স্ট লেডি কে—এ প্রশ্নের যেমন মীমাংসিত উত্তর নেই, তেমনি আইনগত ভিত্তিও নেই। তবে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ধারার কারণে সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ কারণে তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ক্ষমতা বলয়ে অনেক গুরুত্ব পেয়ে থাকেন। ক্ষমতার ও সামাজিক বলয়ে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনের স্ত্রী রেবেকা সুলতানার সক্রিয়তা ও গুরুত্ব সে বিবেচনায় নেই বললেই চলে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে ভিভিআইপি গ্যালারির প্রথম সিটটি সংরক্ষিত ছিল ডা. জুবাইদা রহমানের জন্য। অবশ্য জাতীয় সংসদে প্রেসিডেন্টের জন্য প্রেসিডেন্ট বক্স রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ফার্স্ট লেডি প্রত্যয়টির একটি আইনসিদ্ধ ব্যাখ্যা ও গুরুত্ব ক্রমশই অনিবার্য হয়ে উঠছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ও আইনগতভাবে কে ফার্স্ট লেডি হবেন, তার ভূমিকাই বা কী হবে—এ প্রশ্নের আনুষ্ঠানিক মীমাংসা থাকলে তিনি রাষ্ট্রীয় কাজে সহযোগিতার পাশাপাশি সামাজিক দায়দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন।
দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে ফার্স্ট লেডি নামে কোনো সাংবিধানিক পদ বা স্বীকৃতি না থাকলেও বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের জীবনসঙ্গীকে ঘিরে অতীতে ফার্স্ট লেডি পরিচিতিটি জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে। এই বাস্তবতা, প্রেক্ষাপট ও বিতর্ককে সামনে এনে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশিষ্ট সাংবাদিক মারুফ কামাল খান সম্পাদিত প্রতিদিনের বাংলাদেশ। এই প্রতিবেদনে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আসাদুজ্জামান সম্রাট বিষয়টির বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
গত ১৭ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশ ‘বাংলাদেশে ফার্স্ট লেডি কে’ শিরোনাম প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। প্রতিবেদনটির লিংক ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা চলে। এর আগে ফার্স্ট লেডি পদবি আলোচনায় আসে গত বছরের ডিসেম্বরে। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা গেলে তার পরিচিতিতে দেশে-বিদেশের গণমাধ্যম উল্লেখ করে তিনি দেশের সাবেক ফার্স্ট লেডি ছিলেন।
কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা গত ৩০ ডিসেম্বর প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘ফার্স্ট লেডি থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, জলপাইগুড়ির পুতুল হয়ে উঠেছিলেন বেগম জিয়া’ শিরোনামে। এতে বলা হয়, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ছ’বছর পরে, ১৯৭৭ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট হন খালেদার স্বামী জিয়াউর রহমান। তার পরের বছর ‘দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ’ করতে তৈরি করেন জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। জিয়াউর প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পদাধিকার বলে ফার্স্ট লেডি হন তার পত্নী খালেদা। সেই প্রথম আপাত অন্তর্মুখী স্বভাবের পুতুল জনসমক্ষে আসেন।
একই তারিখে ঢাকার দৈনিক কালবেলার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ইতিহাসে একমাত্র নারী হিসেবে খালেদা জিয়া একই সঙ্গে ফার্স্ট লেডি এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। স্বামী জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে তিনি ছিলেন ফার্স্ট লেডি, আর পরে নিজ যোগ্যতায় রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে অধিষ্ঠিত হন। গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়কে রূপান্তরের এই গল্প বিশ্ব রাজনীতিতেও বিরল।
সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজের একক ক্ষমতাবলে তার স্ত্রীকে ফার্স্ট লেডি ঘোষণা করলেও এর আইনগত কোনো ভিত্তি তৈরি ও অনুমোদন করে যাননি। ফলে তার ক্ষমতা ত্যাগের পরপরই ফার্স্ট লেডি পদটি এক অর্থে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় অধিকাংশ সময়েই প্রধানমন্ত্রী নারী হওয়ার কারণে ফার্স্ট লেডির বিষয়টি আর আলোচনায় আসেনি। জনমনেও এ নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। দীর্ঘ বছর পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনেকে আলোচনায় আগ্রহী।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা অনুসরণ করে, যেখানে রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যনির্বাহী প্রধান। কিন্তু সংবিধানের কোথাও রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীকে ফার্স্ট লেডি হিসেবে উল্লেখ করার কোনো বিধান নেই। ফলে ফার্স্ট লেডি ধারণাটি এখানে মূলত একটি সামাজিক বা অনানুষ্ঠানিক পরিচিতি, আইনি বা সাংবিধানিক মর্যাদা নয়।
পত্রিকাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশে ফার্স্ট লেডি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকা বহন করে। সেখানে রাষ্ট্রপতির স্ত্রী নির্দিষ্ট প্রোটোকল, দাপ্তরিক কর্মসূচি ও সামাজিক উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা নির্ধারিত দায়িত্ব নেই।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময় শীর্ষ নেতাদের পরিবার-পরিজন জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ফার্স্ট লেডি বলা হয়নি। বরং এটি গণমাধ্যম বা সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত একটি প্রচলিত শব্দ, যা মূলত আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাবেই এসেছে।
সাংবাদিক আসাদুজ্জামান সম্রাটের লেখা প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, দেশে নারী নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নারীরা একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন, যা বিশ্ব রাজনীতিতেও উল্লেখযোগ্য। ফলে এখানে ফার্স্ট লেডি নয়, বরং সরাসরি নারী নেতৃত্বই রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—এমন বাস্তবতা অন্য অনেক দেশের তুলনায় ভিন্ন।
তবে অনেকে বলছেন, ‘ফার্স্ট লেডি’ ধারণাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি খাপ খায় না। এটি মূলত একটি ধার করা শব্দ, যার ব্যবহার প্রেক্ষাপটভেদে ভিন্ন অর্থ বহন করে। তাই এই শব্দ ব্যবহারে সচেতনতা ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করা জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন থেকেই যায়—বাংলাদেশে ফার্স্ট লেডি কি কেবলই একটি প্রচলিত উপাধি, নাকি ভবিষ্যতে এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে? বর্তমান বাস্তবতায় এর উত্তর স্পষ্ট না হলেও বিতর্কটি যে এখনও প্রাসঙ্গিক, তা বলাই যায়।
কারো কারো প্রশ্ন—বাংলাদেশে আদৌ ফার্স্ট লেডি ধারণার প্রয়োজন আছে কি না। যেহেতু সংবিধানে এর কোনো স্বীকৃতি নেই, তাই এই পরিচয় ব্যবহার অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্রের কাঠামো ও প্রোটোকলের ক্ষেত্রে এটি অপ্রাসঙ্গিক প্রত্যাশা তৈরি করে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেতাদের পরিবারও আলোচনায় আসে। এই প্রেক্ষাপটে ফার্স্ট লেডি শব্দটি কখনো কখনো প্রতীকীভাবে ব্যবহার করা হলেও তা রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
কেউ কেউ বলছেন, ফার্স্ট লেডির আনুষ্ঠানিক পদের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও রয়েছে মতভেদ। একদিকে এটি সামাজিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক কাঠামো ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে নতুন বিতর্কও উসকে দিতে পারে। তাই এ বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজন বিস্তৃত জনআলোচনা, নীতিগত স্পষ্টতা এবং সাংবিধানিক বিশ্লেষণ।
এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তারেক রহমান যেভাবে তার বাবার মতো জনগণের সঙ্গে মিশে কাজ করছেন, তাতে আমার মনে হয় না এমন বিষয় তার মাথায় রয়েছে। তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান বিভিন্ন পরিসরে সামাজিক কাজ করছেন, এটা ভালো একটি দিক। কিন্তু একেবারেই আনুষ্ঠানিকভাবে এরশাদের মতো করে তাকে ফার্স্ট লেডি ঘোষণা করা হবে... প্রধানমন্ত্রী এ রকম করবেন বলে আমার মনে হয় না।’
খবরটি শেয়ার করুন