রবিবার, ২২শে মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৮ই চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** একাত্তরের হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ স্বীকৃতির দাবিতে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব *** ‘খায়রুল হক, সেলিনা আইভীসহ অনেকে বিএনপির আমলেও মনগড়া মামলার শিকার’ *** সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে প্রধানমন্ত্রীর ফোন *** হামলার ঝুঁকির মধ্যেই খোলা আকাশের নিচে ইরানিদের ঈদের নামাজ *** তারকারা কে কোথায় আছেন ঈদের ছুটিতে *** পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশে *** গ্যাস-সংকটে রান্না বন্ধ, ভারতে দলে দলে বাড়ি ফিরছেন পোশাকশ্রমিকেরা *** নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেলথ মিথ ভেঙে দিল ইরান *** কতটা ছড়ালো ঈদের সিনেমার নতুন গান *** ঈদে মুক্তি পেল ৫ সিনেমা, সবচেয়ে বেশি হলে শাকিব খানের ‘প্রিন্স’

বিএনপি ভুল করলে বাংলাদেশ একাত্তরের পরাজিত শক্তির হাতে চলে যাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৪:৫১ অপরাহ্ন, ২০শে মার্চ ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নতুন কৌশল সাজাচ্ছে কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা আওয়ামী লীগ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাইরে থাকা দলটি এখন সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ—এই চার স্তরের নির্বাচনে কীভাবে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেই কৌশল খুঁজছে। তাদের লক্ষ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে আসা।

আত্মগোপনে থাকা এবং দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দলটির এমন চিন্তা-কৌশলের কথা জানা গেছে। দলটির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, স্থানীয় নির্বাচনের পাশাপাশি তাদের আরেকটি লক্ষ্য পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন। বিশেষ করে আইনজীবী সমিতিগুলোর নির্বাচনে কিছুটা জায়গা তৈরি করতে চায় তারা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকারের প্রায় সব স্তরের জনপ্রতিনিধিদের পদ শূন্য হয়ে যায়। এখন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এটাকে রাজনৈতিক ‘এন্ট্রি পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা। কারণ, এসব নির্বাচনে ব্যক্তিগত প্রভাব, স্থানীয় নানা ইস্যু এবং দলীয় সমর্থন—সবই ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এদিকে দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ কি ফিরে আসবে—শিরোনামে প্রকাশিত এক ভিডিওতে জনপ্রিয় উপস্থাপক জিল্লুর রহমান তার ইউটিউবভিত্তিক আলোচনায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে বিএনপির ভবিষ্যৎ ভূমিকা, আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাস নিয়ে তার বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জিল্লুর রহমানের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিএনপি যদি কৌশলগতভাবে ভুল করে, তাহলে দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এমন শক্তির হাতে চলে যেতে পারে, যাদের তিনি “একাত্তরের পরাজিত শক্তি” হিসেবে অভিহিত করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই শক্তিগুলো ঐতিহাসিকভাবে দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে এবং সুযোগ পেলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে।

বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ

জিল্লুর রহমান মনে করেন, বিএনপি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি এখন জনসমর্থন ও রাজনৈতিক সুযোগ—দুই দিক থেকেই একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। কিন্তু এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে দলটির কৌশলগত পরিপক্বতা জরুরি। তার মতে, “রাজনীতিতে শুধু আন্দোলন করলেই হয় না, রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতার বার্তাও জনগণকে দিতে হয়।”

তিনি আরও বলেন, বিএনপি যদি অভ্যন্তরীণ বিভাজন, নেতৃত্ব সংকট বা ভুল রাজনৈতিক জোটের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে সেটি শুধু দলটির জন্য নয়, পুরো দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, তখন রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হবে, যা অন্য শক্তি পূরণ করতে চাইবে।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও সাংগঠনিক সংকট

জিল্লুর রহমান তার আলোচনায় আওয়ামী লীগের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগের দৃশ্যমান কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো বা দায়িত্ব বণ্টন—কোনোটিই স্পষ্ট নয়।

তার ভাষায়, “দেশজুড়ে অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী আছেন, যারা জানেন না তারা কার নির্দেশনা অনুসরণ করবেন। এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মাঝে মাঝে শোনা যায় যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তবে এই পদ্ধতি কতটা কার্যকর এবং কতদিন ধরে এটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব—তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।

ইতিহাস থেকে উদাহরণ

আওয়ামী লীগের অতীত ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে জিল্লুর রহমান বলেন, দলটি এর আগে একাধিকবার সংকটের মুখে পড়েছে এবং প্রতিবারই ভিন্ন ভিন্ন নেতৃত্ব সেই সংকট মোকাবিলা করেছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে আমেনা বেগমের কথা উল্লেখ করেন, যিনি এক সময় দলের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিলেন বলে রাজনৈতিক মহলে পরিচিত। একইভাবে, আরেক সংকটকালে জোহরা তাজউদ্দীন মধ্য সারির নেতৃত্ব থেকে উঠে এসে দলকে সংগঠিত করেছিলেন।

এই উদাহরণগুলো তুলে ধরে তিনি বোঝাতে চান, আওয়ামী লীগের ইতিহাসে সংকট নতুন নয়, তবে সেই সংকট মোকাবিলার জন্য শক্তিশালী ও দৃশ্যমান নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই ধরনের নেতৃত্বের অভাব স্পষ্ট বলে তিনি মনে করেন।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা—সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে জিল্লুর রহমান বলেন, দলটি পুরোপুরি রাজনীতির বাইরে চলে গেছে—এমনটা বলা ঠিক হবে না। তবে তাদের কার্যক্রম এখন অনেকটাই অদৃশ্য এবং বিচ্ছিন্ন।

তার মতে, একটি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন সংগঠিত কাঠামো, দৃশ্যমান নেতৃত্ব এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। শুধু ভার্চুয়াল যোগাযোগ বা আড়ালে থেকে নির্দেশনা দিয়ে একটি দলকে দীর্ঘদিন সক্রিয় রাখা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ যদি পুনরায় শক্তভাবে রাজনীতিতে ফিরতে চায়, তাহলে তাদেরকে নতুন করে সংগঠিত হতে হবে, তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়াতে হবে এবং একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিতে হবে। অন্যথায়, দলটি দীর্ঘমেয়াদে প্রান্তিক হয়ে পড়তে পারে।

রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন

জিল্লুর রহমানের বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য। তার মতে, একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী সরকার এবং শক্তিশালী বিরোধী দল—দুইটিই প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে এই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি একটি বড় দল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অন্য দল কৌশলগত ভুল করে, তাহলে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হবে। আর সেই শূন্যতাই “অপ্রত্যাশিত শক্তি”কে সামনে নিয়ে আসতে পারে।

জিল্লুর রহমানের বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি একদিকে বিএনপিকে দায়িত্বশীল ও কৌশলী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অনুপস্থিতির দিকটি তুলে ধরেছেন।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি বড় দলের সিদ্ধান্ত দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভুল পদক্ষেপ শুধু একটি দলের ক্ষতি করবে না, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দায়িত্বশীলতা, দূরদর্শিতা এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অন্যথায়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকে যাবে, যা দেশের জন্য কোনোভাবেই শুভ সংকেত নয়।

জে.এস/

জিল্লুর রহমান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250