মঙ্গলবার, ১৩ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** জার্মানিতে অপমানিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে হেনস্তার শিকার ইউনূস, ‘সন্ত্রাসী’ বলে স্লোগান *** জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে আনা হবে না, কারাগার থেকে ভার্চ্যুয়ালি শুনানিতে অংশ নেবেন: প্রসিকিউটর *** শাসন করায় রাস্তায় গাছের ডাল দিয়ে শিক্ষককে পেটাল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র *** মানবতাবিরোধী অপরাধ: জিয়াউল আহসানের হাজিরা ভার্চুয়ালি *** বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও কমাল আইএমএফ, মূলে জ্বালানি ও ব্যাংক খাতে সংকট *** ২২ ঘণ্টা ধরে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ চুয়েট উপাচার্য *** বিমানবন্দরে বারবার প্রাণঘাতী হামলা, সৌদির আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা কেন বাজেনি *** দুর্গাপূজায় নৌপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধসহ ১৬ নির্দেশনা *** সোনার দাম চার দিন পর কমল কত *** এসআইআর স্থগিতসহ ১০ দফা দাবি রাহুল গান্ধীর

সুখবর এক্সপ্লেইনার

স্পেনে ঢুকে পড়া অভিবাসীরা আবারও কেন মরক্কো ফিরে যাচ্ছেন

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ১২:০৬ পূর্বাহ্ন, ২রা আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় নজিরবিহীন অভিবাসী ঢলের মাত্র এক দিনের মধ্যেই দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। ইউরোপে প্রবেশের আশায় যারা জীবন বাজি রেখে সমুদ্র সাঁতরে বা সীমান্তঘেঁষা বাঁধ টপকে স্পেনের ভূখণ্ডে ঢুকেছিলেন, তাদের বড় অংশই আবার স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে যাচ্ছে। 

ঘটনাটি শুধু একটি সীমান্ত সংকট নয়; এটি ইউরোপের অভিবাসননীতি, মানবিক সংকট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব, মানবপাচারকারী চক্রের কৌশল এবং ইউরোপ-উত্তর আফ্রিকা সম্পর্কের জটিল বাস্তবতাকেও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ স্থল ও সমুদ্রপথে সেউতায় প্রবেশ করেন। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের মধ্যে প্রায় ৪৮ হাজার ৩০০ জন মরক্কোয় ফিরে গেছেন। তবে সেউতার স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান হুয়ান হেসুস ভিভাস দাবি করেছেন, গত দুই দিনে সীমান্ত অতিক্রমকারীর প্রকৃত সংখ্যা ৬০ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।

রয়টার্স জানিয়েছে, এই অনুপ্রবেশের সময় অন্তত ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। কেউ সমুদ্রে ডুবে, কেউ আবার সীমান্তের বাঁধে উঠতে গিয়ে পদদলিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। মরক্কোর অংশেও আরও হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—যারা এত ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে ঢুকলেন, তারা আবার এত দ্রুত কেন ফিরে যাচ্ছেন?

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা অনেক অভিবাসী জানিয়েছেন, সেউতায় পৌঁছে তারা বুঝতে পারেন বাস্তবতা তাদের ধারণার সঙ্গে একেবারেই মেলে না। সেখানে পর্যাপ্ত খাবার নেই, আশ্রয়ের সংকট রয়েছে, দোকানপাটের অনেকগুলো বন্ধ, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সেউতা থেকে মূল স্পেনে চলে যাওয়ার কোনো সহজ পথ নেই। সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা থাকায় তারা কার্যত একটি ছোট ভূখণ্ডেই আটকে পড়েন। অনেকেই সেউতাকে "কারাগারের মতো" বলেও বর্ণনা করেছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে তানজিয়ারের এক তরুণ মরক্কোর নাগরিক বলেন, "সত্যি বলতে, আমি কেন এসেছিলাম তা-ই জানি না। এখন ফিরে যাচ্ছি।" এই মন্তব্য অভিবাসীদের মানসিক অবস্থারও প্রতিফলন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য এবং মানবপাচারকারী চক্রের প্রচারণায় বিশ্বাস করেছিলেন যে একবার সেউতায় পৌঁছাতে পারলেই সহজে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে চলে যাওয়া যাবে। বাস্তবে গিয়ে তারা দেখেছেন, সেই ধারণা ভুল ছিল।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, স্পেনের সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে স্পেনের একটি সাধারণ ক্ষমা কর্মসূচিকে এমনভাবে প্রচার করা হয় যেন নতুন করে সীমান্ত পেরোলেই সবাই বৈধ হওয়ার সুযোগ পাবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই কর্মসূচি কেবল আগে থেকেই স্পেনে অবস্থানরত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য ছিল।

একইভাবে স্পেনের সর্বোচ্চ আদালতের একটি রায় নিয়েও ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ে। মানবপাচারকারী চক্র অনেককে বোঝায় যে সমুদ্রপথে পৌঁছাতে পারলে তাদের আর দ্রুত ফেরত পাঠানো যাবে না। এই ভুল ধারণাও হাজারো মানুষকে ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, অনেক অভিবাসী কয়েক মাস ধরে এই যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কেউ সাঁতার শিখেছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমান্ত পার হওয়ার কৌশল শেয়ার করেছেন। কিন্তু সেউতায় পৌঁছানোর পর বাস্তবতা তাদের প্রত্যাশাকে ভেঙে দেয়। মূল স্পেনে যাওয়ার পথ বন্ধ থাকায় এবং স্থানীয় গ্রহণক্ষমতা দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ায় অধিকাংশই ফিরে যাওয়াকেই একমাত্র বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ঘটনাটিকে দেশের "ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন" বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সেউতা সফর করে অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগের কথা জানান। একই সময়ে সীমান্তে স্পেন সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি জোরদার করা হয়। অন্যদিকে মরক্কোও সীমান্তে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে নতুন করে প্রবেশের চেষ্টা ঠেকানোর চেষ্টা চালায়।

ঘটনার রাজনৈতিক অভিঘাতও কম নয়। ইতালি স্পেনের সঙ্গে শেনজেন ব্যবস্থার কার্যকারিতা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। ফ্রান্সও সীমান্তে অতিরিক্ত পুলিশ ও নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। ফলে একটি সীমান্ত সংকট খুব দ্রুত ইউরোপীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় নানা রাজনৈতিক দাবি সামনে এলেও তার অনেকগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ দাবি করেছেন, মরক্কো ইচ্ছাকৃতভাবে সীমান্ত খুলে দিয়েছিল; আবার কেউ স্পেনের অভিবাসননীতিকে পুরো ঘটনার জন্য দায়ী করেছেন। তবে সংবাদ সংস্থাটি বলছে, যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী সামাজিক বৈষম্য, ভুয়া তথ্যের বিস্তার এবং মানবপাচারকারী চক্রের সক্রিয়তাই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সেউতা ও মেলিয়া বহু বছর ধরেই ইউরোপে প্রবেশের প্রতীকী দরজা। আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত হলেও শহর দুটি স্পেনের অংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহিঃসীমান্ত। ফলে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষ মনে করেন, একবার এই ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পারলেই ইউরোপে নতুন জীবন শুরু করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আশ্রয় প্রক্রিয়া এবং প্রত্যাবাসন নীতির কারণে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল।

শরণার্থী ও অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, কেবল সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়িয়ে অভিবাসন সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে ইউরোপমুখী করছে। মরক্কো বহু বছর ধরেই ইউরোপগামী অভিবাসনের একটি প্রধান ট্রানজিট বা যাত্রাবিরতির দেশ।

রয়টার্সের আগের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মরক্কো শত শত মানবপাচারকারী চক্র ভেঙে দিলেও অভিবাসনের চাপ কমছে না; বরং পথ বদলাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজারো মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। মানুষ বিশ্বাস করেছিলেন, সীমান্ত পার হলেই তাদের জন্য ইউরোপের দরজা খুলে যাবে। বাস্তবে তারা পেয়েছেন ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা, সীমাবদ্ধতা এবং শেষ পর্যন্ত ফিরে যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত।

সেউতার এই ঘটনা ইউরোপের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। সীমান্ত সুরক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি ভুয়া তথ্য প্রতিরোধ, মানবপাচারকারী চক্র দমন এবং অভিবাসনের মূল কারণগুলো মোকাবিলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় একই ধরনের মানবিক বিপর্যয় ভবিষ্যতে আবারও ঘটতে পারে।

সব মিলিয়ে সেউতায় কয়েক ঘণ্টার এই নজিরবিহীন অভিবাসী ঢল শেষ পর্যন্ত ইউরোপে প্রবেশের সফল অভিযানে পরিণত হয়নি। বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে, স্বপ্ন আর বাস্তবতার ব্যবধান কতটা নির্মম হতে পারে। হাজারো মানুষ জীবন বাজি রেখে যে সীমান্ত পেরিয়েছিলেন, তাদের বড় অংশই শেষ পর্যন্ত সেই পথেই আবার মরক্কোয় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। আর পেছনে রেখে গেছেন অন্তত ৫৭টি প্রাণহানির বেদনাদায়ক স্মৃতি, ইউরোপীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক এবং বিশ্বজুড়ে অভিবাসন সংকট নিয়ে আরও গভীর প্রশ্ন।

স্পেন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

জার্মানিতে অপমানিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে হেনস্তার শিকার ইউনূস, ‘সন্ত্রাসী’ বলে স্লোগান

🕒 প্রকাশ: ০১:৪৭ অপরাহ্ন, ১৩ই অক্টোবর ২০২৬

জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে আনা হবে না, কারাগার থেকে ভার্চ্যুয়ালি শুনানিতে অংশ নেবেন: প্রসিকিউটর

🕒 প্রকাশ: ১২:৪৬ অপরাহ্ন, ১৩ই অক্টোবর ২০২৬

শাসন করায় রাস্তায় গাছের ডাল দিয়ে শিক্ষককে পেটাল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র

🕒 প্রকাশ: ১২:৩৭ অপরাহ্ন, ১৩ই অক্টোবর ২০২৬

মানবতাবিরোধী অপরাধ: জিয়াউল আহসানের হাজিরা ভার্চুয়ালি

🕒 প্রকাশ: ১২:১৭ অপরাহ্ন, ১৩ই অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও কমাল আইএমএফ, মূলে জ্বালানি ও ব্যাংক খাতে সংকট

🕒 প্রকাশ: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন, ১৩ই অক্টোবর ২০২৬

Footer Up 970x250