প্রতীকী ছবি
তিন দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত পাঁচজনকে গণপিটুনির ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অপরাধ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি দেশের সমাজে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ, পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম ও শেরপুর—ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন এসব এলাকার ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি মিল স্পষ্ট: অপরাধের অভিযোগ উঠতেই আইনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার আগেই ক্ষুব্ধ জনতা বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ মানুষের আবেগকে নাড়া দেয়—এটি স্বাভাবিক। বিশেষ করে যখন ভুক্তভোগী শিশু হয়, তখন সামাজিক ক্ষোভ আরও তীব্র হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ বিচারব্যবস্থার বিকল্প হয়ে উঠছে। এতে তাৎক্ষণিক জনরোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।
সর্বশেষ ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ছয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে দুই যুবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয় লোকজন অভিযুক্তদের একজনকে ধরে পিটুনি দেয়। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগে এক মসজিদের ইমামকে স্থানীয়রা মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। শেরপুরে গৃহবধূ ধর্ষণের অভিযোগে এক যুবককে গণপিটুনির পর পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। এর আগে চট্টগ্রামেও একই ধরনের দুটি ঘটনা ঘটেছে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, কিন্তু অভিযোগ ও অপরাধ প্রমাণ এক বিষয় নয়। আইন অনুযায়ী তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ, আদালত—সবকিছুর মধ্য দিয়ে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সামাজিক ক্ষোভ আদালতের আগেই রায় দিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতার পেছনে প্রধান কারণগুলোর একটি হলো বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, অপরাধীকে পুলিশের হাতে দিলেও হয়তো সে ছাড়া পেয়ে যাবে, মামলা বছরের পর বছর চলবে অথবা প্রভাবশালী কেউ হলে শেষ পর্যন্ত শাস্তি এড়াতে পারবে। এই মানসিকতা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও তীব্র হয়েছে। মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে তাৎক্ষণিক প্রতিশোধই কার্যকর বিচার।
দেশে গণপিটুনির ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের মধ্যে গভীর আস্থার সংকট কাজ করছে। অনেকেই মনে করেন, রাষ্ট্র তার বিচারিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছে না; ফলে মানুষ নিজেরাই বিচারের দায়িত্ব নিতে চাইছে। একই সঙ্গে ক্রোধ ও হতাশা মিলে তৈরি হচ্ছে বিপজ্জনক সামাজিক প্রতিক্রিয়া।
শুধু বিচারব্যবস্থার ধীরগতি নয়, সামাজিক মাধ্যমও এই প্রবণতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন সমাজবিশ্লেষকেরা। একটি ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুক লাইভ, পোস্ট, ভিডিও, মন্তব্য—সব মিলিয়ে মুহূর্তেই জনমত তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সেখানে আদালতের মতো প্রমাণের প্রয়োজন হয় না; আবেগই হয়ে ওঠে সত্যের মাপকাঠি। অতীতে গুজব ছড়িয়ে শিশু চোর সন্দেহে মানুষ হত্যার ঘটনাও বাংলাদেশ দেখেছে। ফলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই জনতা সহিংস হয়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ছে। গবেষণাতেও দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যম অনেক সময় সহিংসতা ও উন্মত্ততা ছড়িয়ে দেওয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানীরা আরেকটি দিকের কথাও বলছেন—দীর্ঘ সময় ধরে সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘাত এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক অসাড়তা তৈরি করে। যখন সমাজে বারবার দেখা যায় যে শক্তিশালী ব্যক্তি পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনগত পথের বদলে প্রতিশোধমূলক পথের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি পরে নির্দোষ প্রমাণিত হন, তাহলে সেই দায় কে নেবে?
দেশে এমন বহু ঘটনা আছে, যেখানে চোর, ডাকাত বা শিশু অপহরণকারী সন্দেহে মানুষকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, পরে দেখা গেছে অভিযোগটি ভিত্তিহীন ছিল। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ শুধু সন্দেহের ভিত্তিতেই প্রাণ হারিয়েছেন। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতি তাই শুধু অভিযুক্তের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য বিপজ্জনক।
কারণ গণপিটুনির সংস্কৃতি একবার সামাজিক স্বীকৃতি পেয়ে গেলে এর সীমা থাকে না। আজ ধর্ষণের অভিযোগে কেউ গণপিটুনির শিকার হচ্ছে, কাল চুরির অভিযোগে, পরশু ধর্মীয় গুজবে, তার পরদিন রাজনৈতিক বিরোধে। ধীরে ধীরে আইনের জায়গা দখল করে নেয় জনতার আবেগ।
পুলিশও বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর বলেছে, মব জাস্টিস বা গণপিটুনি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের বক্তব্য হলো, কেউ অপরাধী হলেও তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে; শাস্তি দেওয়ার অধিকার রাষ্ট্রের, জনতার নয়।
তবে শুধু সতর্কবার্তা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। মানুষের মধ্যে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। ধর্ষণসহ গুরুতর অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। পুলিশি তদন্তের মান উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
ধর্ষণের মতো অপরাধে মানুষের ক্ষোভ স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি আইনের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজ। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হলো বিচার নিশ্চিত করা। যখন মানুষ নিজেরাই বিচার শুরু করে, তখন সেটি কেবল একজন অভিযুক্তকে পেটানোর ঘটনা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থার প্রকাশ।
আর কোনো সমাজে যদি আদালতের আগে গণপিটুনির রায় কার্যকর হতে শুরু করে, তাহলে সেটি কেবল অপরাধের সংকট নয়; সেটি আইনের শাসনেরও সংকট।
খবরটি শেয়ার করুন