ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মিরপুরে একটি বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সী এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পর তার সন্তানদের অবহেলার বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে। নূরজাহান বেগম নামের এই নারীর এক ছেলে যুগ্ম সচিব, এক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং এক মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর এই নারীর যে ছেলে যুগ্ম সচিব, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী আজ বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন আছে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে ওই কর্মকর্তার (যুগ্ম সচিব) বক্তব্য গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। ইতিমধ্যে প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। খবর প্রথম আলোর।
নূরজাহান বেগম তার মেয়ের সঙ্গে যে বাসায় থাকতেন, সেই বাসার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নূরজাহান বেগমের ঘরসহ পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা, অস্বাস্থ্যকর। মরদেহের ফুটেজেও নূরজাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো পড়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পল্লবী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাতে পোকার অস্তিত্ব দেখেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মিরপুরের সেকশন ৬, ব্লক সি, ১৩ নম্বর সড়কের ভবনটির চতুর্থ তলায় গিয়ে গণমাধ্যমের কর্মীরা দীর্ঘ সময় কলবেল দিয়ে অপেক্ষা করলেও কেউ দরজা খোলেননি। তবে ভবনটিতে থাকা এবং আশপাশের প্রতিবেশীরা বলছেন, ঘরের ভেতরে একজন প্রবীণ নারী যেভাবে মারা গেলেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এলাকাবাসী এমন মৃত্যুকে অমানবিক বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নূরজাহান বেগমের মরদেহ পুলিশ উদ্ধারের পর আবার আলোচনায় এসেছে ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনটি। ২০২৩ সালে এ আইনের বিধিমালাও করা হয়। আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন। পিতা ও মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবেন। আইন না মানলে অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন বা অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
সুখবর ডটকমের অনুসন্ধান বলছে, নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩। আইনটিতে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, সন্তানের পক্ষ থেকে পিতা-মাতার জন্য সঙ্গ, চিকিৎসা ও নিয়মিত খোঁজখবর রাখার বিষয়টিও ভরণপোষণের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সক্ষম সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে তারা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে দায়িত্ব ভাগ করে নেবেন। আইন অনুযায়ী ভরণপোষণ বলতে খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সঙ্গদানও বোঝায়।
দেশে প্রবীণদের অধিকার রক্ষার জন্য ২০১৩ সালে আইনটি প্রণয়ন করা হলেও এর প্রয়োগ তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। আইনটি কার্যকর হওয়ার দীর্ঘ সময় পরও মামলার সংখ্যা খুব কম এবং বাস্তবায়নে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
দেশে এর আগে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে সন্তানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পৃথক কোনো আইন ছিল না। ২০১৩ সালের আইনটি সেই শূন্যতা পূরণ করলেও এর বাস্তব প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে বলে অধিকারকর্মীরা মনে করেন।
নূরজাহান বেগমের ঘটনায় প্রতিবেশীরা তার সন্তানদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত সন্তান থাকা সত্ত্বেও একজন মায়ের এমন করুণ পরিণতি সমাজের জন্য উদ্বেগজনক এবং এ ঘটনায় দায় নিরূপণ হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন মা সারা জীবন সন্তানের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন, কিন্তু বয়সের শেষ পর্যায়ে এসে যদি তিনি প্রয়োজনীয় যত্ন ও দায়িত্বশীলতা না পান, তাহলে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ঘটনাটি সমাজে ক্রমবর্ধমান আত্মকেন্দ্রিকতার একটি প্রতিফলন। একই সঙ্গে তিনি পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় প্রবীণদের জন্য মানসম্মত ও সুশাসিত আবাসিক সেবাকেন্দ্র বা বৃদ্ধনিবাসের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু পারিবারিক দায়বদ্ধতার ওপর নির্ভর না করে প্রবীণদের সুরক্ষায় সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
আইনবিদ ও গবেষকদের মতে, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আইন হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করে সচেতনতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং প্রশাসনিক প্রয়োগের ওপর। অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণ পিতা-মাতা নিজের সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে অনিচ্ছুক থাকেন, ফলে আইন প্রয়োগের সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নূরজাহান বেগমের যুগ্ম সচিব পুত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খবরটি শেয়ার করুন