বৃহস্পতিবার, ১০ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৬শে ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে কী লাভ-ক্ষতি বাংলাদেশের *** ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট নেই, তবুও ‘মাদ্রাসা নিয়ে কটূক্তি’র অভিযোগে হিন্দু শিক্ষক আটক *** হামের বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু ২৫ সেপ্টেম্বর: স্বাস্থ্যমন্ত্রী *** ড. ইউনূসকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দিতে হবে: হাইকোর্ট *** জুলাই জার্নালিস্ট ইউনিটির আত্মপ্রকাশ *** মায়ের মৃত্যুতে ৫ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পাচ্ছেন চিন্ময় কৃষ্ণ *** সংবাদমাধ্যমে হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছা নেই: তথ্যমন্ত্রী *** স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে না: প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম‎ *** মোবাইল হ্যাক, ভয়েস ক্লোন ও স্বাক্ষর জাল নিয়ে সংসদ সদস্যদের চিফ হুইপের সতর্কতা *** ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধি পাঠানোর সুযোগ নেই: হুমায়ুন কবির

ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট নেই, তবুও ‘মাদ্রাসা নিয়ে কটূক্তি’র অভিযোগে হিন্দু শিক্ষক আটক

শুভ্র বড়ুয়া

🕒 প্রকাশ: ০৫:৩৫ অপরাহ্ন, ১০ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহীর চারঘাটে ইসলাম ধর্ম ও মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘কটূক্তিপূর্ণ’ পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে নারায়ণ চন্দ্র (৫০) নামের এক স্কুলশিক্ষককে আটক করেছে পুলিশ। তবে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ঘেঁটে এমন কোনো পোস্ট পাওয়া যায়নি বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশও বলছে, তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা হয়নি। অভিযোগটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে চারঘাট উপজেলার ভাটপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে নারায়ণ চন্দ্রকে আটক করা হয়। তিনি ওই বিদ্যালয়ে ২৫ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন। তিনি হিন্দু ধর্মের শিক্ষক। স্থানীয় তৌহিদী জনতার অভিযোগ, নারায়ণ চন্দ্র তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন সময়ে ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য প্রকাশ করে আসছিলেন। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে ইসলাম ধর্ম ও মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়েছে বলে তারা দাবি করে।

তবে নারায়ণ চন্দ্রের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ঘেঁটে সুখবর ডটকম ওই অভিযোগের সঙ্গে মেলে এমন কোনো পোস্ট দেখেনি। বরং বুধবার সকালে তার নিজের একটি ছবি দিয়ে জ্ঞান, শিক্ষা ও সত্য সম্পর্কে একটি লেখা প্রকাশ করা হয়েছিল। এর তিন দিন আগে শিশুদের খেলার একটি ভিডিও এবং পাঁচ দিন আগে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি পোস্ট দেখা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পর বুধবার সকালে বিদ্যালয়ে নারায়ণ চন্দ্রের খোঁজ করা হয়। পরে তাকে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে তাকে থানায় নিয়ে যায়।

ভাটপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রাবিয়া খাতুন আজ মুঠোফোনে সুখবর ডটকমের কাছে দাবি করেন, এর আগেও নারায়ণ চন্দ্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট করেছিলেন। স্থানীয় লোকজন আপত্তি জানালে তাকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে এবার মাদ্রাসা নিয়ে করা কথিত পোস্টের বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।

চারঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান সুখবর ডটকমকে মুঠোফোনে বলেন, স্থানীয় লোকজনের দাবির কারণে শিক্ষককে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, যে পোস্টকে কেন্দ্র করে একজন শিক্ষককে বিদ্যালয় থেকে আটক করে থানায় নেওয়া হলো, সেটি আসলে কে দিয়েছেন। পোস্টটির উৎস কী, নারায়ণ চন্দ্রের অ্যাকাউন্ট থেকে সেটি প্রকাশ হয়েছিল কি না এবং তার অ্যাকাউন্টে ওই পোস্টের কোনো ডিজিটাল আলামত আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

দেশে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো পোস্টকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের আটক বা গ্রেপ্তারের ঘটনা নতুন নয়। এসব ঘটনার কয়েকটিতে পরে অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে রসরাজ দাসের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ইসলাম ধর্ম অবমাননাকর ছবি প্রকাশের অভিযোগ ওঠে। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের ফরেনসিক পরীক্ষায় রসরাজের ফেসবুক, মুঠোফোন ও মেমোরি কার্ডে ওই ছবির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফরেনসিক তথ্য অনুযায়ী রসরাজ ওই পোস্ট দেননি। এর মধ্যেই তাকে সাড়ে তিন মাস কারাগারে থাকতে হয়েছিল।

রসরাজের ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এ কারণে যে, কথিত ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে হামলার ঘটনায় বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা হলেও ওই ধর্মীয় অবমাননাকর পোস্টটি আসলে কে দিয়েছিলেন, সেটি স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যায়নি।

এ ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে কক্সবাজারের রামুতে। সেখানে বৌদ্ধ যুবক উত্তম বড়ুয়ার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ তুলে সহিংসতা হয়। পরে জানা যায়, তার ফেসবুক পরিচিতি ব্যবহার করে অন্য কেউ ওই পোস্ট করেছিল। প্রথম আলোর একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে ভুয়া ফেসবুক পরিচিতি ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরেও একই ধরনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে আকাশ দাস নামের এক তরুণের বিরুদ্ধে অন্যের ফেসবুক পোস্টে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে। এরপর হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে এবং তাকে আটক করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও পরে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় এক হিন্দু কিশোরের বিরুদ্ধে মহানবীকে (সা.) নিয়ে কটূক্তি করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং একই অভিযোগকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়।

চারঘাটের ঘটনাতেও মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই। কোনো ব্যক্তি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছেন কি না, তা নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট পোস্টটি সত্যিই তার অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত হয়েছিল কি না, অ্যাকাউন্টটি তার নিয়ন্ত্রণে ছিল কি না, পোস্টটি সম্পাদিত বা অন্য কোনোভাবে তার নামে ছড়ানো হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে ডিজিটাল প্রমাণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পোস্টের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়লেই সেটিকে মূল পোস্ট হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারও অ্যাকাউন্টে অন্য ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারেন, ভুয়া পরিচিতি ব্যবহার করতে পারেন, পুরোনো পোস্টের ছবি সম্পাদনা করে নতুন বক্তব্য হিসেবে ছড়িয়ে দিতে পারেন। অতীতে এমন ঘটনার নজিরও রয়েছে। নাসিরনগরের ঘটনায় ফরেনসিক পরীক্ষায় রসরাজের অ্যাকাউন্টে কথিত পোস্টের অস্তিত্ব না পাওয়ার বিষয়টি সেই ঝুঁকিই সামনে আনে।

চারঘাটের ঘটনায় স্থানীয় মানুষের ক্ষোভের পর একজন শিক্ষককে বিদ্যালয় থেকে থানায় নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। অর্থাৎ আটক করার পর্যায়েই অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ‘ধর্ম অবমাননাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে দেওয়া হলে তা তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার আগেই সামাজিক শাস্তির পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় অনেকে যাচাই ছাড়া কাউকে দোষী না করার আহ্বান জানিয়েছেন। রাকিব হাসান নামের এক নেটিজেনের ভাষ্য, ‘‘অভিযোগ গুরুতর হলে তদন্ত হোক, কিন্তু পোস্টটি কোথায় এবং কে দিয়েছেন—সেটি আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার।’’ সৌম্য সেন নামের আরেক নেটিজেনের মন্তব্য, ‘‘একজন সংখ্যালঘু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই জনতার চাপে তাকে আটকের ঘটনা উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে সত্যিই অপরাধ হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।’’ তানিয়া রহমান নামের আরেকজনের মত, ‘‘স্ক্রিনশট বা মুখে মুখে ছড়ানো অভিযোগের চেয়ে ডিজিটাল তদন্তের ফলকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ স্পর্শকাতর। তাই এ ধরনের অভিযোগে পুলিশ ও প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করা নয়; অভিযোগের উৎস, সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব, প্রকাশের সময়, ব্যবহার করা যন্ত্র এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল আলামত যাচাই করাও জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, হুমকি কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করার ঘটনা না ঘটে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

চারঘাটের নারায়ণ চন্দ্রের ক্ষেত্রে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ফলে তিনি অভিযুক্ত—এটিও এখন পর্যন্ত অভিযোগের পর্যায়ে। তার অ্যাকাউন্টে কথিত পোস্টের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে কি না, সেটিই তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তাকে ‘ধর্ম অবমাননাকারী’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। অতীতের কয়েকটি ঘটনার অভিজ্ঞতা অন্তত এটুকু মনে করিয়ে দেয়—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ আর প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়।

সংখ্যালঘু নির্যাতন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250