ছবি: সংগৃহীত
জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন ও বিচার—এই তিনটি প্রধান দাবিকে সামনে রেখে যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন নিয়ে এখন নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এ প্রেক্ষাপটে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, “পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না”—সংস্কার থেকে সরে গেলে স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের আশঙ্কা থেকেই যাবে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনগণের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাষ্ট্র মেরামত ও মৌলিক সংস্কার। এ লক্ষ্যে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে, যার মধ্যে নির্বাচনব্যবস্থা ও সংবিধান সংস্কার কমিশন ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরে আরও পাঁচটি কমিশন গঠিত হয়।
তিনি বলেন, “প্রথম ছয়টি কমিশন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিপোর্ট দেওয়ার পর ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনের কাজ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে মৌলিক বিষয়গুলোতে ঐকমত্য তৈরি করা, যাতে স্বৈরাচারী কাঠামো থেকে বের হয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব হয়।”
সংস্কার কমিশনগুলোর সহস্রাধিক প্রস্তাব থেকে ১৬৬টি বাছাই করে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয় বলে জানান তিনি। এরপর তিন ধাপে আলোচনা হয়—প্রথমে লিখিত মতামত, পরে একক বৈঠক এবং শেষে সব দলের সঙ্গে যৌথ বৈঠক।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “দীর্ঘ প্রায় আট মাস আলোচনার মাধ্যমে আমরা ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাই। এই ৮৪টি বিষয়ই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ হিসেবে গৃহীত হয়।”
তিনি জানান, এসব বিষয়ের মধ্যে ৩৬টি নির্বাহী আদেশ বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য, আর বাকি ৪৮টির জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হয়। এই ৪৮টি বিষয় নিয়েই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার সংস্কারের পক্ষে মত দেন।
রাষ্ট্রপতির জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ’-এর ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বৈত ভূমিকা পালনের কথা ছিল—একদিকে সংসদ সদস্য, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য।
কিন্তু এ পর্যায়ে এসে রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে বিএনপির নির্বাচিত সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
এ প্রসঙ্গে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “যেহেতু জনগণ গণভোটে এই প্রক্রিয়ার পক্ষে মত দিয়েছে, তাই শপথ নেওয়া তাদের জন্য বাধ্যতামূলক। জনগণের মতামতই সর্বোচ্চ আইন—এটি অগ্রাহ্য করা জনগণের রায়ের প্রতি অসম্মান।”
নির্বাচনের পর বিএনপি রাষ্ট্রপতির আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং দাবি করে, তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা দ্বিমতগুলো গণভোটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
তবে এ যুক্তিকে ‘অসার’ বলে মন্তব্য করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, “নোট অব ডিসেন্ট হলো সংখ্যালঘু মতামত। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে। তাই সংখ্যালঘু মতামত গণভোটে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি অযৌক্তিক।”
তিনি আরও বলেন, “বিএনপি আগে এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলেনি, কিন্তু নির্বাচনের পর তারা অবস্থান বদলেছে। এটি সংস্কার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার শামিল।”
ড. বদিউল আলম মজুমদার অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অনুমোদনে অনীহা দেখিয়েছে বর্তমান সরকার। এর মধ্যে কিছু রহিত করা হয়েছে, আবার কিছু সংসদীয় কমিটিতে তোলাই হয়নি।
তার ভাষায়, “এই অধ্যাদেশগুলো ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এগুলো বাস্তবায়নে অনীহা একটি অশনিসংকেত।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “বিদ্যমান সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতাই অতীতে স্বৈরাচারের জন্ম দিয়েছে। এগুলো অক্ষুণ্ন থাকলে ভবিষ্যতেও একই ঝুঁকি থাকবে।” সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্ব বা অনীহা ভবিষ্যতে গুরুতর রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “যদি মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার না করা হয় এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাগুলো প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে আমরা আবারও পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাব। এতে স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
তিনি আরও বলেন, “পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না; বরং আমরা উল্টো দিকে হাঁটছি।” জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে থাকা মানুষের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, এই সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে তা হবে ঐ আত্মত্যাগের প্রতি অবিচার।
তার ভাষায়, “বহু মানুষের রক্তের বিনিময়ে এই সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদি আমরা মৌলিক সংস্কারে ব্যর্থ হই, তাহলে স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথই প্রশস্ত করব। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংস্কারের প্রশ্নটি নতুন নয়, তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পর এটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ড. বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তার দাবি, গণভোটে প্রাপ্ত জনসমর্থন ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে শুরু হওয়া এই সংস্কার প্রক্রিয়া যদি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে তা শুধু রাজনৈতিক অচলাবস্থাই নয়, ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন