ছবি: সংগৃহীত
সাংবাদিকতার ব্যস্ত দিনগুলোয় ঘড়ির কাঁটা থামেনি। ভোরের ঘুম ভাঙা থেকে রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত খবর, সম্পাদনা, বৈঠক, হিসাব, পত্রিকার ছাপা, টেলিভিশনের অনুষ্ঠান—সবকিছুর ভেতর দিয়েই কেটেছে তার কর্মজীবন। একই দিনে একাধিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সামলে কাজকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখেছেন তিনি। সেই দীর্ঘ কর্মজীবন, আয়-ব্যয়, সুযোগ-সুবিধা ও পরিবারের সম্পদ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক নঈম নিজাম।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নঈম নিজাম গতকাল শুক্রবার (১৪ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে বলেছেন, দেশের বাইরে তার, তার স্ত্রী বা দুই সন্তানের কোনো সম্পদ নেই। একই সঙ্গে তিনি তুলে ধরেছেন তার কর্মজীবনের ব্যস্ততা, প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া বেতন ও সুযোগ-সুবিধা, ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়ে থাকার কথা এবং সন্তানদের জীবনযাপনের কথাও।
নিজের কর্মজীবনের পরিচয় দিতে গিয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নঈম নিজাম লিখেছেন, তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিউজ টোয়েন্টিফোরের সিইও ও প্রধান সম্পাদক এবং রেডিও ক্যাপিটালের সিইও হিসেবেও কাজ করেছেন। তার ভাষায়, “বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক, একই সঙ্গে নিউজ টোয়েন্টিফোরের সিইও ও প্রধান সম্পাদক এবং রেডিও ক্যাপিটালের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।”
শুধু বাংলাদেশে প্রকাশিত পত্রিকার দায়িত্বেই তার কাজ সীমাবদ্ধ ছিল না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, লন্ডন ও নিউইয়র্ক থেকেও সপ্তাহে এক দিন করে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন তিনি। তবে এসব সংস্করণের যাবতীয় কাজ হতো ঢাকা থেকে। পোস্টে তিনি লিখেছেন, “লন্ডন ও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত হলেও সাপ্তাহিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের যাবতীয় কাজ হতো ঢাকা থেকে। আলাদা টিম ছিল।”
সেই সময়ের কর্মজীবনের একটি দিনের চিত্রও তুলে ধরেছেন কলামিস্ট নঈম নিজাম। তিনি জানিয়েছেন, রাত যত গভীরেই ঘুমাতে যান না কেন, প্রতিদিন সকাল সাতটায় তার ঘুম ভাঙত। এরপর সাড়ে আটটার মধ্যে প্রায় ১৫টি বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্র পড়তেন। গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবর বাদ পড়েছে কি না, তা নোট করতেন। নতুন কোনো পরিকল্পনা মাথায় এলে সেটিও লিখে রাখতেন। জরুরি প্রয়োজন হলে সকালেই সহকর্মীদের ফোন করতেন।
তিনি লিখেছেন, “সপ্তাহে একদিন নিয়মিত কলাম লিখতাম বাংলাদেশ প্রতিদিনে। সকাল ১১টার মধ্যে অফিসে পৌঁছাতাম।” অফিসে পৌঁছানোর পরও বিশ্রামের সুযোগ ছিল না বলে নিজের পোস্টে উল্লেখ করেছেন নঈম নিজাম। তার ভাষ্য, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চেকে স্বাক্ষর করতে হতো তাকে। কোনো কোনো দিন শুধু চেক স্বাক্ষর করতেই প্রায় এক ঘণ্টা চলে যেত। এরপর শুরু হতো সম্পাদকীয় কাজ।
পরের দিনের পত্রিকার সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় পাতা, ফিচার ও বিনোদন পাতার পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করতেন তিনি। বিজ্ঞাপন বিভাগের প্রধানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতেন। প্রয়োজন হলে পুরো বিভাগের সঙ্গেও বৈঠক করতেন। দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করার পাশাপাশি সার্কুলেশন বিভাগের কাজও তার দায়িত্বের অংশ ছিল বলে উল্লেখ করেছেন।
পত্রিকার বিক্রি ও প্রচারের সঙ্গে যুক্ত এজেন্ট ও হকারদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন তিনি। তার বর্ণনায়, “সংবাদপত্র বিক্রির সঙ্গে জড়িত সারাদেশের এজেন্ট হকারদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো। তাদের সঙ্গে কথা হতো।”
দুপুরে বাসায় গিয়ে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করলেও কাজের চাপ বেশি থাকলে অফিসেই খেয়ে নিতেন। এরপর বিকেল থেকে শুরু হতো পরের দিনের পত্রিকা প্রকাশের আরেক দফা ব্যস্ততা। বড় কোনো খবর না থাকলে নিজেই অনুসন্ধানে যুক্ত হতেন। বড় সার্কুলেশন ধরে রাখাকে তিনি প্রতিদিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন।
টেলিভিশন ও রেডিওর দায়িত্বও একই সময় সামলাতে হতো তাকে। নঈম নিজাম লিখেছেন, নিউজ টোয়েন্টিফোরে গিয়ে সংবাদ, টক শো ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠক করতেন। রেডিও ক্যাপিটালের সহকর্মীরাও অনেক সময় তার জন্য অপেক্ষা করতেন। কাজের ধরন বোঝাতে তিনি লিখেছেন, “হাঁটতে হাঁটতে কথা বলেছি, লিফট পার হয়েছি, গাড়িতে উঠতে উঠতেও কাজের আলোচনা চলেছে। ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত জীবনজুড়ে ছিল শুধু কাজ আর কাজ।”
কর্মজীবনের এই বর্ণনার পরই নিজের সম্পদ ও আর্থিক অবস্থান নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন নঈম নিজাম। তিনি লিখেছেন, “আজ যারা নানা ধরনের কথা বলেন, তাদের একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই, বসুন্ধরা গ্রুপের বাইরে আমার জগৎ ছিলো না।”
নিজের বেতন ও অফিস থেকে পাওয়া সুযোগ-সুবিধার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তার দাবি, তিনি সবচেয়ে বেশি বেতনে কাজ করতেন এবং সেই বেতন থেকেই অফিসের মাধ্যমে কর পরিশোধ করতেন। তার ভাষায়, “বেতনের টাকার অফিস থেকে দেওয়া কর হিসাবে মিডিয়া থেকে সেরা করদাতা হতাম।”
বিদেশ সফরের খরচ, গাড়ি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়েও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। লিখেছেন, “বিদেশ গেলে টিকেট, খরচ অফিস দিতো। দুটো গাড়িসহ সকল সুবিধা অফিস দিতো। এর বাইরে যখন যা চাইতাম পেতাম গ্রুপ থেকে।”
তবে তার পোস্টের সবচেয়ে স্পষ্ট বক্তব্য এসেছে দেশের বাইরে তার ও পরিবারের সম্পদ নিয়ে। নঈম নিজাম লিখেছেন, “বাংলাদেশের বাইরে পৃথিবীর কোনো প্রান্তে আমার, আমার স্ত্রী কিংবা আমার দুই সন্তানের কোনো সম্পদ নেই।” নিজের ব্যাংক হিসাব নিয়েও তিনি দাবি করেছেন, “আমার ব্যাংক হিসাব বন্ধ। বেতনের পাওয়া টাকা তুলতে পারি না ইউনূস জমানা থেকে।”
পরিবারের সদস্যদের প্রসঙ্গ টেনে নঈম নিজাম তার ছেলে-মেয়ের জীবনযাপন নিয়েও কথা বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তার মেয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান হার্ভার্ডে কাজ করছেন। ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে বর্তমানে একটি বিদেশি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করছেন। সন্তানদেরও দেশের বাইরে বাড়িঘর বা সম্পদ নেই বলে দাবি করেছেন তিনি। লিখেছেন, “তারাও পৃথিবীর কোথাও ঘরবাড়ি বা সম্পদের মালিক হয়নি। ছেলে বেজমেন্টের একটি ছোট রুমে থাকে।”
নিজের স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিনের প্রসঙ্গও এসেছে তার পোস্টে। তিনি লিখেছেন, “ফরিদা ইয়াসমিন দুটি কাজ করে। তাতেই তারা সন্তুষ্ট।”
নঈম নিজামের সাংবাদিকতা ও সম্পাদকীয় সংগঠনে ভূমিকার কথাও তার পোস্টে এসেছে। সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এর আগে সহকারী সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও কাজ করার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। সাংবাদিকতার পেশাগত অধিকার ও মর্যাদার জন্য লড়াইয়ের কথাও বলেছেন।
২০১৯ সালে ডেইলি স্টার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহ্ফুজ আনামকে সভাপতি এবং নঈম নিজামকে সাধারণ সম্পাদক করে সম্পাদক পরিষদের নতুন কমিটি গঠিত হয়েছিল। সে সময় প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশিত হয়। ২০২১ সালের জুলাইয়ে নঈম নিজাম সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের বিষয়টি নিয়েও তখন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।
তবে নিজের সাম্প্রতিক পোস্টে অতীতের পদ-পদবির চেয়ে কাজের কথাই বেশি সামনে এনেছেন নঈম নিজাম। তিনি মনে করেন, সাংবাদিকতার বাইরে মিডিয়ায় এখনো কাজের অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। তার ভাষায়, “এখনো মনে করি মিডিয়ায় কাজের হাজারো সুযোগ আছে। বই লেখা যায়, সিনেমা তৈরি করা যায়, নতুন প্রতিষ্ঠান গড়া যায়, নতুন চিন্তা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়।”
দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা উত্থান-পতনের ভেতর দাঁড়িয়ে নিজের দর্শনের কথাও বলেছেন তিনি। সমালোচকদের উদ্দেশে তার বক্তব্য, “আমি কাজপাগল মানুষ ছিলাম, এখনো কাজকেই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি মনে করি।”
পোস্টের শেষাংশে নঈম নিজাম কাজের প্রতি নিষ্ঠাকে জীবনের কঠিন সময় পার হওয়ার এক ধরনের শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যে রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া এক সরল বিশ্বাস—কাজের প্রতি নিষ্ঠা শেষ পর্যন্ত মানুষকে তার গন্তব্যের দিকে নিয়ে যায়।
তিনি লিখেছেন, “জীবনের কঠিন সময়ে বলছি, কাজকে ইবাদত হিসেবে নিয়ে, নিষ্ঠার সঙ্গে লেগে থাকলে সাফল্য একদিন না একদিন আসবেই।”
নঈম নিজামের এই দীর্ঘ পোস্ট মূলত তার নিজের কর্মজীবন, আর্থিক সুযোগ-সুবিধা, পরিবার ও সম্পদ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব হিসেবে দেওয়া ব্যক্তিগত বক্তব্য। সেখানে তিনি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা অভিযোগের বিস্তারিত নাম উল্লেখ না করে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি দাবি—সাংবাদিকতার দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কাজ ও দায়িত্বের মধ্যেই নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন এবং দেশের বাইরে তার বা তার পরিবারের কোনো সম্পদ নেই।
তার বর্ণিত কর্মদিবনের ব্যস্ততা যেন শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে সেই পুরোনো কথাতেই—খবরের কাগজের পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায়, রেডিওর মাইক্রোফোনে কিংবা অফিসের বৈঠকে, তার জীবনের বড় অংশজুড়েই ছিল কাজ। আর সেই কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি নিজের সম্পদ নয়, বরং নিজের শ্রম ও কর্মজীবনের কথাই সামনে এনেছেন।
খবরটি শেয়ার করুন