ছবি: সংগৃহীত
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের একটি প্রদর্শনী শেষ পর্যন্ত আর অনুষ্ঠিত হলো না। কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের বিরোধিতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং সম্ভাব্য উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির আশঙ্কায় আয়োজকেরা প্রদর্শনী স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। ঘটনাটি শুধু একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি দেশের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ধর্মীয় রক্ষণশীলতার প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে আজ শনিবার বিকেলে জেলা শহরের অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছিল। স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া তরুণদের এই সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল্পধারার চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও চলচ্চিত্রচর্চার সঙ্গে যুক্ত। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন, যার উদ্দেশ্য ছিল চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা ও দর্শক তৈরি করা।
কিন্তু প্রদর্শনীর ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হয়। কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এবং কয়েকজন ধর্মীয় নেতার বক্তব্যে সিনেমা প্রদর্শনীকে স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশের জন্য অনুপযুক্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফেসবুকে দেওয়া বিভিন্ন পোস্টে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ‘আলেম-ওলামার শহর’ উল্লেখ করে সিনেমা প্রদর্শনীর বিরোধিতা করা হয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে কিছু ধর্মীয় নেতা ও শিক্ষার্থী ঘোষণা দেন যে কোনো অবস্থাতেই চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে সতর্কতামূলক অবস্থান কর্মসূচিরও ঘোষণা আসে। এরপর আয়োজকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে সংঘাত বা হামলার ঘটনা ঘটতে পারে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার শাহরিয়ার জানিয়েছেন, বিভিন্ন ধরনের চাপ ও সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ভেন্যু কর্তৃপক্ষ অনুমতি প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে নতুন কোনো স্থান পাওয়া সম্ভব হয়নি। তার অভিযোগ, প্রশাসনের কাছ থেকেও কার্যকর সহায়তা মেলেনি। শেষ পর্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রদর্শনী স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঘটনার পর স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের অনেকের মতে, আইনগতভাবে বৈধ একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কেবল চাপের মুখে বন্ধ হয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য সুখকর বার্তা নয়। তারা প্রশ্ন তুলেছেন—যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন পছন্দ না করে, তবে তারা তাতে অংশ না নিলেই পারে; কিন্তু অন্যদের সেই আয়োজন থেকে বিরত রাখার অধিকার কোথা থেকে আসে?
দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। গত কয়েক দশকে নাটক, চলচ্চিত্র, ভাস্কর্য, সংগীতানুষ্ঠান কিংবা বইমেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় আপত্তি ও বাধার ঘটনা ঘটেছে। কখনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ, কখনো সামাজিক মূল্যবোধের প্রশ্ন তুলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার দাবি এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শিল্প ও সংস্কৃতির স্বাধীনতার প্রশ্ন।
সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষকদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সংস্কৃতি ও শিল্পের ভূমিকা কেবল বিনোদন দেওয়া নয়; বরং মানুষের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে বহুমাত্রিকভাবে প্রকাশ করা। ফলে কোনো শিল্পকর্মের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও তার অস্তিত্ব অস্বীকার করা বা প্রদর্শন বন্ধ করার দাবি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। কারণ জেলাটি দীর্ঘদিন ধরেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত। দেশের সংগীত, নাটক ও সাহিত্যচর্চায় এই জেলার অবদান উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে এটি ধর্মীয় শিক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে এখানে সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য বহু বছর ধরে পাশাপাশি অবস্থান করেছে। সেই বাস্তবতায় একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীকে ঘিরে এমন উত্তেজনা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছে।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, সমাজে ভিন্নমত ও বৈচিত্র্যের প্রতি সহনশীলতা কমে গেলে সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তারা মনে করেন, মতের অমিল থাকলে আলোচনা, সমালোচনা কিংবা বর্জনের পথ খোলা আছে; কিন্তু ভয়ভীতি বা চাপের মাধ্যমে কোনো অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক নজির তৈরি করে।
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীও অবশ্য এই ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সবাইকে এক করে দেখতে নারাজ। তাদের মতে, কওমি মাদরাসার সব শিক্ষার্থী সিনেমা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডবিরোধী নয়। একটি অংশের অবস্থানকে পুরো সম্প্রদায়ের মতামত হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু একটির প্রয়োগ অন্যটির অধিকার খর্ব করতে পারে না।
জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ বলেছেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় আপাতত প্রদর্শনী বন্ধ থাকবে। প্রশাসনের এই অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী রাষ্ট্র যদি সম্ভাব্য প্রতিবাদের মুখে সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ রাখাকেই সহজ সমাধান হিসেবে বেছে নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে যেকোনো সংগঠিত চাপগোষ্ঠী একই কৌশল ব্যবহার করে অন্য অনুষ্ঠানও বন্ধ করার চেষ্টা করতে পারে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের মতপ্রকাশ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। অবশ্যই সেই স্বাধীনতার সীমা রয়েছে এবং আইনভঙ্গের সুযোগ নেই। কিন্তু কোনো কার্যক্রম আইনগতভাবে বৈধ হলে সেটি বন্ধ করার যুক্তি হতে হবে আইনভিত্তিক, চাপভিত্তিক নয়।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী স্থগিত হওয়ার ঘটনাটি তাই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—দেশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ পরিসর কতটা সুরক্ষিত? একটি সমাজ কি ভিন্ন রুচি, ভিন্ন মত ও ভিন্ন সাংস্কৃতিক পছন্দকে একসঙ্গে ধারণ করতে পারছে? নাকি ক্রমশ এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে সংগঠিত আপত্তির মুখে শিল্প ও সংস্কৃতিকে পিছু হটতে হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো এখনই পাওয়া যাবে না। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি। বরং নতুন প্রজন্মের সাংস্কৃতিক চর্চা, ধর্মীয় পরিচয় এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কারণ একটি বহুত্ববাদী সমাজে ভিন্নমতকে সহ্য করার সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নির্ধারণ করে।
খবরটি শেয়ার করুন