রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের *** আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ *** তেজগাঁওয়ে মসজিদে গোপন বৈঠক: উগ্রবাদ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ১২ জন ৩ দিনের রিমান্ডে *** কেরানীগঞ্জে থানার সামনে ট্রাকে আগুন, আব্দুল্লাহপুরে ককটেল বিস্ফোরণ *** রাজধানীর মিরপুর ও মধ্যবাড্ডায় ৩ বাসে অগ্নিসংযোগ, যাত্রাবাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণ *** ‘আসিফ মাহমুদের দুর্নীতি ও লুটপাটের গডফাদার ড. ইউনূস’ *** শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগেই সরকারের ওপর ‘চাপ’ সৃষ্টি করতে চায় আওয়ামী লীগ

বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটকালে সাংবাদিকতা

উপ-সম্পাদকীয়

🕒 প্রকাশ: ০৫:১৩ অপরাহ্ন, ৭ই এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

শিতাংশু ভৌমিক অংকুর

ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান ধারা নিঃসন্দেহে মোবাইল জার্নালিজম বা মোজো। একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং ন্যূনতম প্রশিক্ষণ থাকলেই আজ একজন মানুষ সংবাদকর্মীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন। ফলে সংবাদ সংগ্রহ, প্রচার ও উপস্থাপনায় একধরনের গণতান্ত্রিক বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু এই সহজলভ্যতার মধ্যেই তৈরি হয়েছে এক গভীর সংকট, গুণগত সাংবাদিকতার জায়গায় ভিউ নির্ভরতার বিস্তার। নিজের ও মাঠপর্যায়ে কাজ করা অনেকের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একজন মোজো সাংবাদিক হিসেবে আমার নিজের এবং অনেকের অভিজ্ঞতাও এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। 

বহুবার দেখা গেছে, একটি ঘটনার গভীরতা, প্রেক্ষাপট বা তথ্যগত নির্ভুলতার চেয়ে অফিস থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ভিডিওটি কত দ্রুত প্রকাশ করা যাবে এবং সেটি কত ভিউ পাবে। কখনো কখনো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এমন চাপও থাকে, যাতে কনটেন্টটি আরও আকর্ষণীয় বা উত্তেজনাকর করে তোলার চেষ্টা করা হয়। এই বাস্তবতা একজন সাংবাদিককে নৈতিকতা ও পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে আপস করার এক কঠিন দ্বিধায় ফেলে।

দেশের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এখন কনটেন্টের মানের চেয়ে তার জনপ্রিয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একটি ভিডিও কত ভিউ পেল, কত শেয়ার হলো, সেটিই হয়ে উঠছে কর্মীদের মূল্যায়নের প্রধান সূচক। এর ফলে মাঠপর্যায়ের মোজো সাংবাদিকরা একধরনের অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ছেন, যেখানে সত্যতা, প্রেক্ষাপট ও নৈতিকতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কীভাবে দ্রুত ভাইরাল হওয়া যায়।

এই ভিউ নির্ভর প্রতিযোগিতার একটি উদ্বেগজনক সামাজিক প্রতিক্রিয়াও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ক্রমেই সাধারণ মানুষের একটি অংশ মোজো সাংবাদিকদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ না করে বরং এড়িয়ে চলতে শুরু করেছেন। অনেকেই ক্যামেরা দেখলেই মুখ লুকান, স্থান ত্যাগ করেন, এমনকি বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দেখান। নিজের কাজের অভিজ্ঞতায়ও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যেখানে মানুষ সরাসরি বলেছেন তারা ক্যামেরার সামনে আসতে চান না, কারণ তারা আশঙ্কা করেন তাদের কথা বা চিত্র ভুলভাবে উপস্থাপিত হতে পারে। 

এই ভয় কেবল ব্যক্তিগত অস্বস্তির বিষয় নয়, এটি গণমাধ্যমের প্রতি আস্থার সংকটের প্রতিফলন। যখন সাংবাদিক মানুষের কাছে তথ্যের উৎস না হয়ে আতঙ্কের কারণ হয়ে ওঠেন, তখন সেটি পুরো পেশার জন্যই একটি সতর্কবার্তা।

এই প্রবণতা সাংবাদিকতার মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ সাংবাদিকতা কখনোই কেবল মনোযোগ আকর্ষণের মাধ্যম নয়, এটি জনস্বার্থে সত্য ও তথ্য উপস্থাপনের একটি দায়িত্বশীল পেশা। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালাও এ কথাই বলে। Society of Professional Journalists এর নীতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, সংবাদ পরিবেশনের সময় সম্ভাব্য ক্ষতি কমিয়ে আনা সাংবাদিকের অন্যতম দায়িত্ব। অর্থাৎ তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি সেই তথ্য যেন কারো মর্যাদা, নিরাপত্তা বা ব্যক্তিগত জীবনে অপ্রয়োজনীয় আঘাত না হানে। এই নীতি আন্তর্জাতিক গবেষণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেমন দেখানো হয়েছে গবেষণায় “Mobile Journalism: Using Smartphone in Journalistic Work” (ResearchGate, 2020), যা মোবাইল সাংবাদিকতার কার্যকরী দিক এবং নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

মোবাইল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এই নৈতিকতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মোবাইল ক্যামেরা সহজেই মানুষের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, কারো ব্যক্তিগত মুহূর্ত, দুর্বলতা বা বিব্রতকর অবস্থাকে ক্যামেরাবন্দি করা হচ্ছে শুধু ভাইরাল হওয়ার আশায়। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মানহানি যেমন ঘটে, তেমনি সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাম্প্রতিক গবেষণা “Digital Journalism and the Crisis of Trust” (ResearchGate, 2023) দেখিয়েছে যে, ভিউ নির্ভরতার ফলে ডিজিটাল মিডিয়ায় জনবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও সংবেদনশীল। সমাজের এমন অনেক গোষ্ঠী রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য ও উপেক্ষার শিকার। তাদের নিয়ে সংবাদ করার সময় অতিরিক্ত মানবিকতা ও সতর্কতা প্রয়োজন। ইউনেস্কোর গাইডলাইনেও বলা হয়েছে, কোনো গোষ্ঠীকে উপস্থাপনের সময় এমন কিছু করা যাবে না, যা তাদের প্রতি বিদ্বেষ বা ভুল ধারণা তৈরি করে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এই সীমারেখা অতিক্রম করা হচ্ছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, সাংবাদিক কি কেবল একজন পর্যবেক্ষক, নাকি তিনি নিজেই ঘটনার অংশ হয়ে উঠছেন? যখন কোনো সাংবাদিক কারো পিছু নেন, উসকানিমূলক আচরণ করেন, কিংবা এমনভাবে ভিডিও ধারণ করেন যা পরিস্থিতিকে উত্তেজিত করে তোলে, তখন তিনি আর নিরপেক্ষ থাকেন না। বরং তিনি নিজেই ঘটনাকে প্রভাবিত করতে শুরু করেন। এটি শুধু পেশাগত বিচ্যুতি নয়, অনেক সময় তা ঝুঁকিপূর্ণও হয়ে ওঠে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনগত বৈধতা এবং নৈতিক বৈধতা এক নয়। জনসমাগমে ভিডিও ধারণ অনেক ক্ষেত্রে আইনগতভাবে বৈধ হতে পারে, কিন্তু সেটি কীভাবে করা হচ্ছে সেটিই মূল প্রশ্ন। যদি সেই প্রক্রিয়ায় কারো মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় বা সে মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তাহলে সেটি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কখনোই এমন আচরণের অনুমতি দেয় না।

এক্ষেত্রে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি তারা কর্মীদের কেবল ভিউ দিয়ে মূল্যায়ন করে, তাহলে সাংবাদিকেরাও স্বাভাবিকভাবেই সেই লক্ষ্যের দিকেই ছুটবেন। তাই প্রয়োজন নীতিগত পরিবর্তন, যেখানে কনটেন্টের গুণগত মান, তথ্যের নির্ভুলতা এবং নৈতিক মানদণ্ডকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। ভিউ গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেটি কখনোই একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না।

একজন আদর্শ মোজো সাংবাদিকের জন্য তাই কিছু বিষয় অপরিহার্য। পেশাগত দূরত্ব বজায় রাখা, তথ্য যাচাই করা, সম্মতি ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং প্রয়োজনে ক্যামেরা নামিয়ে মানবিক আচরণ করা। কারণ সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব।

ডিজিটাল যুগে দ্রুততা একটি বড় শক্তি, কিন্তু সেটিই সবচেয়ে বড় ফাঁদও হতে পারে। দ্রুততার সঙ্গে দায়িত্ববোধ না থাকলে সাংবাদিকতা সহজেই বিভ্রান্তি, উত্তেজনা এবং সামাজিক বিভাজনের উৎসে পরিণত হতে পারে। তাই এখনই সময় আত্মসমালোচনার, আমরা কী কেবল ভিউয়ের জন্য কাজ করছি, নাকি সত্যিকার অর্থে জনস্বার্থে সাংবাদিকতা করছি।

শেষ পর্যন্ত ভিউ সাময়িক সাফল্য এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে শুধু বিশ্বাসযোগ্যতা। আর সেই বিশ্বাসযোগ্যতাই একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

রেফারেন্স:

*Mobile Journalism: Using Smartphone in Journalistic Work, ResearchGate, 2020

*Digital Journalism and the Crisis of Trust: Cultural Implications in the Information Age, ResearchGate, 2023

*Mobile Media and Journalism Pedagogy, SAGE Journals, 2021

*UNESCO Guidelines on Media and Marginalized Communities, UNESCO, 2019

লেখক: সাংবাদিক

সাংবাদিকতা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ

🕒 প্রকাশ: ০১:২২ পূর্বাহ্ন, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি

🕒 প্রকাশ: ০১:১০ পূর্বাহ্ন, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান

🕒 প্রকাশ: ০১:০০ পূর্বাহ্ন, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের

🕒 প্রকাশ: ১১:৪৯ অপরাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ

🕒 প্রকাশ: ১১:৪১ অপরাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250