ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ এশিয়ার দুই মুসলমানপ্রধান দেশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাম হঠাৎ করেই ইসরায়েলের নিরাপত্তা আলোচনায় উঠে এসেছে। ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত রেউভেন আজার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে ইসরায়েল বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সম্ভাব্য হামাস-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে।
তার দাবি, হামাসের মতো সংগঠনগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও তাদের আদর্শিক ও সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে, যা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে নিয়ে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করছে ইসরায়েল? এই দুই দেশে কি সত্যিই হামাসের কোনো সংগঠিত উপস্থিতি রয়েছে, নাকি বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অংশ?
একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ফিলিস্তিনের প্রতি জনসমর্থন এবং হামাসের প্রতি সমর্থন—দুটি বিষয়কে কি এক করে দেখা হচ্ছে? বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসরায়েলের বর্তমান নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রে রয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা। ওই হামলার পর ইসরায়েল শুধু গাজা নয়, বরং বিশ্বব্যাপী হামাস-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক, অর্থায়ন, প্রচারণা এবং সমর্থন কাঠামোর ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়াও সেই পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে।
এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ নতুন নয়। পাকিস্তান বিশ্বের কয়েকটি দেশের একটি, যারা এখনো ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। দেশটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিসরে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান দীর্ঘদিনের। গাজা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বড় আকারের বিক্ষোভ হয়েছে, যেখানে অনেক অংশগ্রহণকারী হামাসকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইসলামাবাদের রাষ্ট্রীয় অবস্থান যদিও মূলত ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে, তবু ইসরায়েলি নিরাপত্তা মহল পাকিস্তানকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং বাংলাদেশের পাসপোর্টেও দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ভ্রমণ নিষিদ্ধ। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশ সবসময় স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার, রাজনৈতিক দল, ইসলামি সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
তবে এখানেই তৈরি হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। বাংলাদেশে ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতি অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও তা সবসময় হামাসের প্রতি সমর্থনের সমান নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমর্থন এসেছে গাজার বেসামরিক জনগণের মানবিক দুর্দশা, দখলদারত্ববিরোধী অবস্থান এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবিকে কেন্দ্র করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ফিলিস্তিনের প্রতি জনসমর্থনকে হামাসের সাংগঠনিক উপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।
তাহলে ইসরায়েল কেন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দিকে নজর রাখছে?
প্রথম কারণ, আদর্শিক প্রভাবের প্রশ্ন। ইসরায়েলের ধারণা, হামাস কেবল একটি সশস্ত্র সংগঠন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক আন্দোলনও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্রচারণা এবং আন্তর্জাতিক সংহতি কর্মসূচির মাধ্যমে হামাসের ভাবধারা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে তারা মনে করে।
দ্বিতীয় কারণ, ৭ অক্টোবরের হামলার পর নিরাপত্তা কৌশলের পরিবর্তন। হামাসের হামলাকে ইসরায়েল একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বের যেসব অঞ্চলে ফিলিস্তিনপন্থী জনমত শক্তিশালী, সেগুলোকেও তারা বাড়তি নজরদারির আওতায় রাখছে।
তৃতীয় কারণ, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি। বর্তমানে ইরান, পাকিস্তান, কাতার, তুরস্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শক্তিকে ঘিরে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাদের অবস্থানও ইসরায়েলের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রদূত রেউভেন আজারের বক্তব্যে কাতার ও পাকিস্তান সম্পর্কে সমালোচনামূলক মন্তব্যও সেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ।
তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে এমন কোনো নির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি, যা বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে হামাসের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ কারণে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইসরায়েলের বক্তব্যকে সরাসরি গোয়েন্দা তথ্যের প্রকাশ হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত নিরাপত্তা বার্তা হিসেবেও দেখা উচিত।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ফিলিস্তিনের প্রতি জনসমর্থন দীর্ঘদিনের এবং তা মূলত রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও মানবিক অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে ইসরায়েল এই সমর্থনের ভেতরে কোনো সংগঠিত নেটওয়ার্ক বা নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্ভাবনা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে চাইছে। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন হামাস নয়, বরং ফিলিস্তিন প্রশ্নকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার জনমত, ভূরাজনীতি এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের জটিল সম্পর্ক।
খবরটি শেয়ার করুন