বুধবার, ২১শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** কী খবর মাসুদ, ভালো?—চট্টগ্রামের এসপিকে প্রধানমন্ত্রী *** ইরানে সরকার পতন হলে হিজবুল্লাহ থামবে এবং শান্তি আসবে: নেতানিয়াহু *** সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, সরকারের এখন করণীয় কী *** সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুই বাংলাদেশির বিষয়ে ‘গোপনীয়’ চিঠিতে যা আছে *** পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুই পক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী *** চট্টগ্রামে দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান *** ডিজে পার্টি-কাণ্ডে অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির প্রত্যাহার *** বার্সার ম্যাচ দেখেননি, তবু রেফারিং নিয়ে খোঁচা মরিনহোর *** মালদ্বীপকে উড়িয়ে ফাইনালে ভারতের সঙ্গী বাংলাদেশ *** মেসিবিহীন আর্জেন্টিনায় একের পর এক চোটের হানা

সুখবর এক্সপ্লেইনার

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, সরকারের এখন করণীয় কী

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ১২:৪৫ পূর্বাহ্ন, ২১শে অক্টোবর ২০২৬

#

ফাইল ছবি

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া শুধু দুটি প্রাণহানির ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের নাগরিকদের বিদেশে বিচার পাওয়ার অধিকার, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং সরকারের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণার আগে বাংলাদেশ সরকার বা জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে অবহিত ছিল না। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকর হওয়ার আগে তাদের পক্ষে কূটনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপের সুযোগ কেন তৈরি হলো না।

সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশি নাগরিক নাজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সিতে প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মসজিদের ভেতরে কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। সৌদি আদালত ইসলামী আইনের তাআজির ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর রাজকীয় আদেশে তা কার্যকর করা হয়। তবে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, ঘটনার স্থান হিসেবে চিহ্নিত মসজিদের পরিচয়, গ্রেপ্তারের সময়, বিচারপ্রক্রিয়ার পূর্ণ বিবরণ এবং অভিযুক্তদের আইনজীবী পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবৃতিতে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

এই জায়গাতেই তারেক রহমান সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সৌদি আরবের নিজস্ব আইন ও বিচারব্যবস্থা রয়েছে—কিন্তু কোনো দেশের আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেই বিদেশি নাগরিকের বিচারপ্রক্রিয়া, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং কনস্যুলার সহায়তার প্রশ্নগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না। বাংলাদেশের সরকার সৌদি আরবের বিচারিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত কি না, তার চেয়েও জরুরি হলো—দুই নাগরিকের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, তারা কীভাবে বিচার পেয়েছেন, তাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন কি না, আপিলের সুযোগ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না এবং বাংলাদেশকে কেন আগে জানানো হয়নি, সেসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর বের করা।

সরকারের প্রতিবাদ তাই কেবল দুঃখপ্রকাশ বা ব্যাখ্যা চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দুটি জীবন আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য ঘটনাটি জানার পর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। ১৫ অক্টোবর জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট জানায়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের অবহিত করা হয়নি। কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও ব্যাখ্যা চেয়ে কূটনৈতিক নোট পাঠায়। পরবর্তী সময়ে ঢাকাও সৌদি সরকারের কাছে বিস্তারিত তথ্য চায়। ১৮ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপক্ষীয় বিষয়ক সচিব মো. নজরুল ইসলাম ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়াহর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয় এবং আগে পাঠানো কূটনৈতিক নোটের একটি অনুলিপি রাষ্ট্রদূতের হাতে দেওয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বৈঠকটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রদূত তলব বলা ঠিক হবে না বলে উল্লেখ করেছেন।

১৯ অক্টোবর বাসস জানায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া সৌদি আদালতের রায়ের অনুলিপি চেয়েছে। ওই দিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, রায়ের কপি পাওয়ার পর সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অসমর্থিত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি বন্দীদের একটি তালিকা পাঠিয়েছিল। সেই তালিকায় দুই ব্যক্তির নাম ছিল কি না, তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল এবং মৃত্যুদণ্ডের তথ্য কেন জানানো হয়নি, তা যাচাই করা হচ্ছিল। সেপ্টেম্বরে জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বন্দীদের বিষয়ে তথ্য চেয়েছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রায় আড়াই হাজার বন্দির একটি তালিকা দিয়েছিল, কিন্তু ওই দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ডের কথা সেখানে উল্লেখ ছিল না বলে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এখানে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বন্দীদের তালিকায় কারও নাম থাকা আর তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মামলা চলছে—এ দুটি এক বিষয় নয়। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশিদের শনাক্ত করার জন্য দূতাবাস ও কনস্যুলেটের বিশেষ ব্যবস্থা ছিল কি না, থাকলে তা কতটা কার্যকর ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তালিকায় নাম থাকার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মামলার অগ্রগতি কেন জানা গেল না, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হয়েছিল কি না এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে মৃত্যুদণ্ডসংক্রান্ত তথ্য আলাদাভাবে চাওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে আসা দরকার।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশটির প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি সেখানে কাজ করেন এবং তাদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বের কারণে নাগরিকের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্নে নীরব থাকার সুযোগ নেই। বরং এত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি যে দেশে কাজ করেন, সেখানে তাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের কূটনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নটি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিয়েনা সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশি নাগরিক আটক হলে তার কনস্যুলার যোগাযোগ ও সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিয়ে বিধান রয়েছে। আটক ব্যক্তি অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তার দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের অবহিত করার বিষয়টিও এই বিধানের অন্তর্ভুক্ত। বিদেশি নাগরিককে তার কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে জানানো এবং তার দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার প্রশ্ন তাই নিছক সৌজন্যের বিষয় নয়। তবে এই ঘটনায় সনদ লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা চূড়ান্তভাবে বলার আগে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিচারপ্রক্রিয়ার পূর্ণ নথি, আটকসংক্রান্ত তথ্য এবং দুই দেশের মধ্যে হওয়া যোগাযোগের বিবরণ যাচাই করা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটির সাধারণ মন্তব্য ৩৬-এ মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। ওই ব্যাখ্যায় বিদেশি নাগরিককে তার কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার সম্পর্কে সময়মতো না জানানো এবং তার ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার মতো গুরুতর প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কথাও উল্লেখ আছে। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের মামলা শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ করেছেন কি না, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; তাকে ন্যায্য বিচার দেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সৌদি আরববিষয়ক গবেষক জোয়ি শিয়ার বক্তব্যও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। সংস্থাটির ২৮ জুলাই-এর প্রতিবেদনে তিনি বিদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে আইনজীবী ও দোভাষীর অভাব এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকার বিষয়ে উদ্বেগ জানান। ওই প্রতিবেদন ইথিওপীয় নাগরিকদের মামলা নিয়ে প্রকাশিত; বাংলাদেশের এই দুই নাগরিকের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে এটি কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নয়। তবে বিদেশি শ্রমিকদের বিচারপ্রক্রিয়া যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আইনজীবী, দোভাষী, আত্মপক্ষ সমর্থন ও আপিলের সুযোগ খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা এতে স্পষ্ট হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের আরেকটি প্রতিবেদনে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে অন্তত ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে অহিংস অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের বিষয়টিও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এসব তথ্য বাংলাদেশের দুই নাগরিকের মামলার অপরাধ বা রায়কে নিজে থেকে অবৈধ প্রমাণ করে না। তবে সৌদি বিচারব্যবস্থায় বিদেশি নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক নজরদারি কেন প্রয়োজন, তার একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে।

তারেক রহমান সরকারের এখন প্রথম কাজ হওয়া উচিত সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ লিখিত ব্যাখ্যা ও আদালতের রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি আদায় করা। মামলার অভিযোগপত্র, সাক্ষ্যপ্রমাণ, রায়ের যুক্তি, আইনজীবী নিয়োগের তথ্য, দোভাষীর ব্যবস্থা, আপিলের নথি এবং মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য চাইতে হবে। দুই নাগরিকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বক্তব্য ও প্রয়োজন নথিবদ্ধ করতে হবে। মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া, দাফন এবং পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও দ্রুত নিশ্চিত করা দরকার।

দ্বিতীয়ত, সরকারকে সৌদি আরবে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে জরুরি পর্যালোচনা শুরু করতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের অভিযোগ বা রায় রয়েছে, তাদের আলাদা তালিকা তৈরি করে প্রতিটি মামলার অবস্থা জানতে হবে। দূতাবাস ও কনস্যুলেটের আইনগত সহায়তা জোরদার করতে হবে। বন্দিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, আদালতের শুনানির তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজন হলে স্থানীয় আইনজীবী নিয়োগে সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কেবল হাজার হাজার বন্দির একটি সাধারণ তালিকা সংগ্রহ করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না।

তৃতীয়ত, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যবস্থার ভেতরেও। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং জেদ্দার কনস্যুলেটের কাছে জানতে হবে—এই দুই নাগরিকের মামলার বিষয়ে কোন পর্যায়ে কী তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, কোনো সতর্কসংকেত ছিল কি না এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে হস্তক্ষেপের বাস্তব সুযোগ ছিল কি না। কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি বিশেষ কনস্যুলার সতর্কীকরণব্যবস্থা চালু করা দরকার।

চতুর্থত, জোরালো প্রতিবাদকে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে। সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক ও কূটনৈতিক নোট পাঠানো প্রাথমিক পদক্ষেপ; পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র দিতে হবে। উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বিষয়টি তুলতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নথি ও ব্যাখ্যা দেওয়ার অনুরোধ জানাতে হবে। সৌদি কর্তৃপক্ষ সন্তোষজনক তথ্য না দিলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘের প্রাসঙ্গিক ব্যবস্থার নজরে আনার সম্ভাবনাও যাচাই করা যেতে পারে। তবে কোনো আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিধানের আওতা, দুই দেশের দায়বদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে।

বাংলাদেশের উচিত সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিয়ে শুরু না করে, বরং ধাপে ধাপে চাপ বাড়ানো। প্রথমে পূর্ণাঙ্গ নথি ও ব্যাখ্যা, এরপর আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ, প্রয়োজনে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা এবং শেষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি তোলার প্রস্তুতি—এই ধারাবাহিকতা কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে, বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের জীবন, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকার নিয়ে কোনো আপস করা হবে না।

দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য ছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নথি ও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য। কিন্তু অভিযোগ গুরুতর হলেই বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার শেষ হয়ে যায় না। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে যাওয়ার পর ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি এখন মূল প্রশ্ন হলো, বিচার চলাকালে বাংলাদেশের নাগরিকেরা তাদের প্রাপ্য কনস্যুলার সহায়তা ও ন্যায়বিচারের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না।

তারেক রহমান সরকারের সামনে এখন কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার মধ্যে একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্ব তৈরি করার সুযোগ নেই। প্রকৃত বন্ধুত্বের পরীক্ষা হয় কঠিন সময়ে। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বলেই এই ঘটনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের দাবি আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন। দুই নাগরিকের মৃত্যুর পর কেবল সংযত ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিষয়টি বন্ধ করে দেওয়া হলে তা তাদের পরিবারের প্রতি যেমন অবিচার হবে, তেমনি বিদেশে কর্মরত লাখো বাংলাদেশির কাছেও ভুল বার্তা পৌঁছাবে।

বাংলাদেশের প্রতিবাদ তাই হতে হবে তথ্যনির্ভর, আইনি ভিত্তিসম্পন্ন এবং ফল আদায় না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত। দুই নাগরিকের মৃত্যুর পূর্ণ সত্য উদ্‌ঘাটন, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাই এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধের নিশ্চয়তা—এই তিনটি লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সরকারের দায়িত্ব শেষ হবে না।

বাংলাদেশি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250