ছবি: সংগৃহীত
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক ‘পীরের’ আস্তানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং ‘পীরকে’ পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনার পর পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গতকাল শনিবার দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় ‘শামীম বাবার দরবার শরিফ’ নামে পরিচিত স্থাপনাটিতে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর থেকে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যও ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেছেন।
নিহত আব্দুর রহমান শামীম (৬৫) ওই ‘দরবার শরিফ’-এর প্রধান ছিলেন। হামলায় আরও তিন অনুসারী—মহন আলী, জামিরুন নেছা ও জুবায়ের আহত হয়েছেন। তারা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন জানান, শামীমের মুখমণ্ডলে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও আঘাত করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আজ রোববার সকাল পর্যন্ত থানায় কেউ অভিযোগ দেয়নি, কাউকে আটকও করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিহতের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়নি বলে জানিয়েছে পরিবার। ময়নাতদন্ত শেষে আস্তানা সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।
দাফনের পর পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান।
এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, ‘মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এখনো পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি, তবে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।’
স্থানীয়দের দাবি, ইসলাম ও কোরআন অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতা এ হামলা চালায়। প্রশাসনের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে ভাইরাল হওয়ার পর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশও গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
দেখা গেছে, দোতলা একটি ভবন ও পাশের গম্বুজবিশিষ্ট স্থাপনায় ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে এবং আসবাবপত্রে আগুন দেওয়া হয়েছে। চারপাশে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ঘটনাস্থলে কোনো অনুসারী বা পরিবারের সদস্যকে দেখা যায়নি।
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, শামীম ২০১৮ সালের দিকে পৈতৃক ভিটায় এ আস্তানা গড়ে তোলেন এবং নিজেকে ‘সংস্কারপন্থী ইমাম’ পরিচয় দিতেন। তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে ঢাকায় চাকরি করেন। পরে চাকরি ছেড়ে আধ্যাত্মিক চর্চায় যুক্ত হন। ২০২১ সালে এক শিশুর লাশ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি আলোচনায় আসেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে আটকও করা হয়েছিল।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, ‘পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ তাকে উদ্ধার করলেও জনতার তুলনায় সদস্যসংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।’
জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত। বিজিবির টহলসহ সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাড়িতেও পুলিশি পাহারা থাকবে। এ ছাড়া দৌলতপুরের হোসেনাবাদের বাসিন্দা লালনশিল্পী শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতেও পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে। শফি মণ্ডল বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন।
গতকাল সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে স্থানীয় বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চুর মোল্লা স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে।’
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন