গত মার্চে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট ও স্কাই নিউজের সঙ্গে কাজ করা স্বাধীন সাংবাদিক তানবিরুল মিরাজ রিপনকে কক্সবাজারে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল সাংবাদিকদের অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন সিপিজে। সংগঠনটি বলেছিল, শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো সাংবাদিককে গোয়েন্দা সংস্থায় তলব করা বা তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক।
ঘটনাটি জাতীয় পর্যায়ে খুব বেশি আলোচিত হয়নি। সুখবর ডটকমসহ কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও বড় ধরনের জনআলোচনা দেখা যায়নি। একইভাবে চলতি জুনে যশোরের শার্শা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের উপজেলা প্রতিনিধি আসাদুজ্জামান আসাদ নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার হলেও সেটিও জাতীয় সাংবাদিক সমাজে উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেনি।
এর আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ময়মনসিংহে ১১টি স্থানীয় পত্রিকার ঘোষণাপত্র (ডিক্লারেশন) বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনা হয়নি। সবশেষ বগুড়ায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে ১৮ জুন রাতে ‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানুর ইসলামের গ্রেপ্তার নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মামলার বাদী বগুড়া প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ ও স্থানীয় একটি পত্রিকার সম্পাদক।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এক বিবৃতিতে বলেন, এ মামলার বিষয়ে তার কোনো অনুমোদন বা নির্দেশনা ছিল না এবং তিনি গ্রেপ্তার সাংবাদিকের দ্রুত মুক্তি প্রত্যাশা করেন। এসব ঘটনার প্রতিটির নিজস্ব আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়—কেন স্থানীয় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, তলব বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের ঘটনাগুলো জাতীয় পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়?
গণমাধ্যম স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনায় সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দেশ কি এমন একটি পরিবেশের দিকে যাচ্ছে, যেখানে সাংবাদিকরা ঝুঁকির আশঙ্কায় নিজেরাই সংবেদনশীল বিষয় এড়িয়ে চলতে শুরু করবেন? গণমাধ্যম গবেষণায় এ প্রবণতাকে বলা হয় ‘চিলিং ইফেক্ট’। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টিম উ একে এমন একটি পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে রাষ্ট্র বা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ভয়ে মানুষ তাদের আইনসিদ্ধ মতপ্রকাশের অধিকার ব্যবহার করা থেকেও বিরত থাকে।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো—কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে প্রতিবেদক বা সম্পাদক ভাবতে শুরু করেন, এর ফলে মামলা, গ্রেপ্তার, চাকরি হারানো বা অন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে কি না। ফলে অনেক সংবাদ প্রকাশের আগেই থেমে যায়।
আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো বলছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মামলা, দীর্ঘ তদন্ত, গ্রেপ্তার, তলব বা প্রশাসনিক হয়রানি অনেক সময় সরাসরি সেন্সরশিপের চেয়েও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের কৌশল হয়ে ওঠে। কারণ এতে শুধু অভিযুক্ত সাংবাদিকই নন, একই ধরনের বিষয়ে কাজ করা অন্য সাংবাদিকরাও সতর্ক হয়ে যান।
চিলিং ইফেক্ট অবশ্য দেশের জন্য নতুন কোনো ধারণা নয়। আওয়ামী লীগের প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলেও এ বাস্তবতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সমালোচকেরা অভিযোগ করেছেন, সে সময় একদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনি কাঠামো ব্যবহার করে ভয় তৈরি করা হয়েছে, অন্যদিকে সরকারি সুবিধা, পদ-পদবি, বিদেশ সফর, প্লট বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের একটি অংশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সরকারি সুবিধা গ্রহণ ও দুর্নীতির অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে।
ফলে ভয় ও লোভ—এই দুই উপাদান মিলিয়ে সাংবাদিকদের একটি অংশের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল বলে বহু গবেষক ও পর্যবেক্ষক মনে করেন। অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই সংবেদনশীল বিষয় এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। প্রশ্ন হলো, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার কি সেই পথেই হাঁটছে?
এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এখনই দেওয়া কঠিন। কারণ বর্তমান সরকারের মেয়াদ মাত্র চার মাস পূর্ণ হয়েছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে, সেগুলো আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ এবং আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। অন্যদিকে সাংবাদিকদের একাংশ বলছেন, কয়েকটি ঘটনায় পেশাগত কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত উপাদান রয়েছে এবং সেগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে।
সিপিজে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের একাধিক পর্যবেক্ষণে বলেছে, বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের কারাবন্দি করার প্রবণতা এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং এর সঙ্গে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার উত্থানের সম্পর্ক রয়েছে। সংগঠনটির মতে, অনেক দেশেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন বা অন্যান্য ফৌজদারি বিধান ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ সম্পর্কেও সিপিজে উদ্বেগ জানিয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও কয়েকজন সাংবাদিক কারাগারে রয়েছেন বলে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে। গবেষকদের মতে, চিলিং ইফেক্টের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি সহজে পরিমাপ করা যায় না। কোনো প্রতিবেদন লেখা হয়নি, কোনো অনুসন্ধান শুরুই হয়নি, অথবা কোনো তথ্য প্রকাশের আগেই থেমে গেছে—এসবের কোনো দৃশ্যমান পরিসংখ্যান থাকে না। কিন্তু এর প্রভাব গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ওপর গভীর।
স্থানীয় সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ তারাই ভূমি দখল, স্থানীয় দুর্নীতি, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো বিষয়গুলোর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকেন। ফলে যদি তারা ঝুঁকির আশঙ্কায় আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য হন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনস্বার্থে তথ্যপ্রবাহ।
কক্সবাজারে একজন স্বাধীন সাংবাদিককে গোয়েন্দা কার্যালয়ে তলব, যশোরে সাংবাদিক গ্রেপ্তার, ময়মনসিংহে পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিলের উদ্যোগ কিংবা বগুড়ায় সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে সম্পাদক গ্রেপ্তার—প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তবে সম্মিলিতভাবে এগুলো সাংবাদিকদের মধ্যে কী ধরনের বার্তা পাঠাচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার অভিযোগ করেছে। দলটির শীর্ষ নেতারাও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে তাদের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা উপস্থিত হয়েছে।
সেটি হলো—বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় যে স্বাধীনতার দাবি করা হয়েছিল, ক্ষমতার কেন্দ্রে এসে সেই একই নীতি কি বাস্তবে অনুসরণ করা হবে?
এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু রাজধানীর পরিচিত মুখদের প্রশ্ন নয়। কক্সবাজার, যশোর, ময়মনসিংহ বা বগুড়ার ঘটনাগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষয়ে গেলে তার প্রথম লক্ষণ সাধারণত রাজধানীতে নয়, প্রান্তে দেখা যায়। আর সেই প্রান্তিক সতর্ক সংকেতগুলো উপেক্ষিত হলে একসময় তার প্রভাব গোটা গণমাধ্যম ব্যবস্থার ওপরই পড়ে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সাংবাদিকতা দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রভিত্তিক। ঢাকার কোনো সম্পাদক, টেলিভিশন উপস্থাপক বা জাতীয় দৈনিকে কর্মরত সাংবাদিক আক্রান্ত হলে তা জাতীয় সংবাদ হয়ে ওঠে। কিন্তু জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকেরা প্রায়ই প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, আইনি সহায়তা ও পেশাগত সংহতির বাইরে থেকে যান। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাগুলো স্থানীয় পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে কেন্দ্র ও প্রান্তের মধ্যে ভিন্ন মানদণ্ড থাকা উচিত নয়। কারণ স্থানীয় সাংবাদিকরাই প্রায়শই দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান থেকে কাজ করেন। ফলে ঝুঁকিও তাদের তুলনামূলক বেশি।
আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলোও একই ইঙ্গিত দেয়। সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থার মতে, কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার সরকারগুলো প্রায়ই প্রথমে স্থানীয় ও প্রান্তিক সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কারণ জাতীয় পর্যায়ের বড় গণমাধ্যম আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে, কিন্তু জেলা পর্যায়ের একটি পত্রিকা বা অনলাইন পোর্টালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সাধারণত প্রতিক্রিয়া কম হয়।
দেশেও এ আশঙ্কা নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গণমাধ্যম খাতে ব্যাপক পুনর্বিন্যাসের অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সম্পাদকীয় ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বা অভিযুক্ত অনেক সাংবাদিক চাকরি হারান বলে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর একাংশ দাবি করে। অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকদের প্রভাব বৃদ্ধির অভিযোগও ওঠে। যদিও সংশ্লিষ্ট অনেক গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ এসব সিদ্ধান্তকে প্রশাসনিক ও পেশাগত বিবেচনার ফল বলে ব্যাখ্যা করেছে।
এ সময় বহু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়, কয়েকজন কারাগারেও যান। তবে জাতীয় আলোচনায় মূলত পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকদের ঘটনাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে; জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে আড়ালে থেকে গেছে।
গণমাধ্যম গবেষকদের মতে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সমান মানদণ্ড। একজন জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিকের জন্য যে নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করা হবে, একজন উপজেলা প্রতিনিধির ক্ষেত্রেও সেটি সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
স্থানীয় সাংবাদিকদের ঝুঁকি আরও বেশি হওয়ার একটি কারণ তাদের আর্থিক ও পেশাগত দুর্বলতা। অনেক জেলা-উপজেলা প্রতিনিধি খুব কম সম্মানী পান, আবার অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত বেতনও পান না। আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সীমিত। ফলে মামলা বা গ্রেপ্তারের মুখে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
খবরটি শেয়ার করুন