ফাইল ছবি
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আবারও একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা, উচ্চপর্যায়ের সফর এবং পারস্পরিক ইতিবাচক বার্তাবিনিময়—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরকে এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আগামী ৭ ও ৮ এপ্রিল দিল্লি সফর করছেন। মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে (ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলন) যোগ দেওয়ার আগে ভারতের রাজধানীতে যাবেন তিনি। ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করার পর এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী দিল্লি সফরে যাবেন।
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন নয়াদিল্লি সফরের বিষয়টি সুখবর ডটকমকে নিশ্চিত করেছে। আগামী ৭ ও ৮ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফর শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর কৌশলগত ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। মরিশাসের পোর্ট লুইস-এ অনুষ্ঠিতব্য ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগদানের আগে এই সফরকে সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কারণ, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কাটিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। দিল্লি সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে খলিলুর রহমানের বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হারদ্বীপ সিং পুরির সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
সম্ভাব্য বৈঠকগুলোও ইঙ্গিত দেয় যে আলোচনার পরিধি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও বিস্তৃত হবে। এই সফরের পেছনে রয়েছে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়ে দুই দেশের জনগণের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
শুধু তাই নয়, শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে পাঠানো হয়, যা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে গিয়ে একটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে—ভারত বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর আগে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছিল। সেই সময় কূটনৈতিক যোগাযোগে স্থবিরতা দেখা যায়, এমনকি দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য দীর্ঘ নয় মাস অপেক্ষা করতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০ মার্চ জয়শঙ্করের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ এবং পরবর্তী সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর নির্ধারণ—দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে বলে বিশেষদের অভিমত।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় দেশই বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ক্রমেই বাড়ছে। বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি সহযোগিতা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং নদীর পানি বণ্টনের মতো ইস্যুগুলোতে দুই দেশের সহযোগিতা অপরিহার্য। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালের গতকাল শুক্রবার দেওয়া বক্তব্যেও এই মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, নয়াদিল্লি শুধু সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় না, বরং তা আরও মজবুত করে সামনে এগিয়ে নিতে চায়। এই বক্তব্য কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত অবস্থান, যা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখার প্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী এবং অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। পাশাপাশি, বিদ্যুৎ আমদানি, জ্বালানি সরবরাহ এবং অবকাঠামো উন্নয়নেও ভারতের ভূমিকা রয়েছে। ফলে সম্পর্কের অবনতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তবে এই নতুন পর্যায়ের সম্পর্ক কেবল ইতিবাচক সম্ভাবনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও জড়িত। সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য এবং রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতির মতো বিষয়গুলো এখনও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। তাই আসন্ন সফরে এসব ইস্যু আলোচনায় আসতে পারে এবং এগুলোর সমাধানের জন্য বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন।
একই সঙ্গে রণধীর জয়সোয়ালের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপারেশন সার্চলাইটের গণহত্যার বিচার প্রশ্নে ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এটি শুধু ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়, বরং দুই দেশের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের একটি মিলিত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।
কূটনীতিকদের মতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের আসন্ন দিল্লি সফর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠতে পারে। এটি যদি কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনায় রূপ নেয় এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হয়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক একটি নতুন, আরও শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন