ফাইল ছবি
বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে এই সম্পর্ক বহুমাত্রিক ও গভীর।
সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যে বার্তা উঠে এসেছে, তা আবারও ইঙ্গিত দিচ্ছে—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এবং ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের মধ্যে সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এমন অভিমত কূটনৈতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের।
তারা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিবাচক চিত্র আরেকবার ফুটে উঠল গতকাল বৃহস্পতিবার, দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের বাসভবনের আঙিনায়।
বাংলাদেশের ৫৬তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত মিলনমেলায় সে দেশে নিয়োজিত হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ ও ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং—দুজনই দুই দেশের অনন্য ও বহুমাত্রিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
কূটনৈতিক উষ্ণতা: প্রতীকী নয়, বাস্তব সংকেত
বিশ্লেষকদের অভিমত, দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে দুই দেশের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে যে ইতিবাচক সুর ধ্বনিত হয়েছে, তা নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়—বরং বাস্তব রাজনৈতিক সংকেত। হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন, তেমনি ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে ভারত আগ্রহী।
তাদের মতে, এই বক্তব্যগুলোকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভাষা ও প্রতীক—উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়, তখন প্রতিবেশী দেশের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। ভারতের পক্ষ থেকে “উষ্ণ অভ্যর্থনা” এবং “অপেক্ষা” শব্দগুলোর ব্যবহার স্পষ্টতই একটি ইতিবাচক অবস্থান নির্দেশ করে।
ঐতিহাসিক ভিত্তি: সম্পর্কের মূল শক্তি
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি এর ঐতিহাসিক ভিত্তি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের রাজনৈতিক, সামরিক ও মানবিক সহায়তা এই সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। রিয়াজ হামিদুল্লাহ তার বক্তব্যে ১,৬৬৮ জন ভারতীয় সেনার আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে এই ঐতিহাসিক বন্ধনের গভীরতা তুলে ধরেছেন।
এই ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতি নয়—বরং বর্তমান কূটনীতির একটি কার্যকর ভিত্তি। দুই দেশের সম্পর্ক যখনই কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখনই ১৯৭১-এর স্মৃতি একটি নৈতিক ও আবেগগত সংযোগ হিসেবে কাজ করে।
সাংস্কৃতিক সংযোগ: নরম শক্তির প্রভাব
অভিজ্ঞরা বলছেন, দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, পণ্ডিত রবিশঙ্কর—এইসব ব্যক্তিত্ব কেবল সাংস্কৃতিক আইকন নন, বরং দুই দেশের জনগণের মধ্যে একটি অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সাংস্কৃতিক বন্ধন কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও মসৃণ করতে সহায়তা করতে পারে। কারণ, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকে, সেখানে সংস্কৃতি প্রায়ই সেতুবন্ধনের কাজ করে।
নতুন সরকার, নতুন সমীকরণ
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রতি ভারতের ইতিবাচক মনোভাব বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের গতিপথও বদলে যায়। তবে এবার ভারতের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যাচ্ছে, তারা ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগ্রহী।
হামিদুল্লাহ তার বক্তব্যে “সবার আগে বাংলাদেশ” নীতির কথা উল্লেখ করেছেন, যা জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। তবে একই সঙ্গে তিনি পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথাও বলেছেন। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান, যা ভারতের মতো বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ: আস্থার বার্তা
দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগগুলো সম্পর্কের ইতিবাচক ধারাকে আরও শক্তিশালী করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের উপস্থিতি, দিল্লি হাইকমিশনে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের আগমন ও খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোকবার্তা লেখা, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ও পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির উপস্থিতি—এসবই আস্থার বার্তা বহন করে।
এতে প্রমাণিত হয়, ভারত সরকার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকতে চায়।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা: নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা। বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যা ভবিষ্যতে ২৮-৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি। ইতোমধ্যে রেল, সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে সহজ করছে।
বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে। এতে একদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ উন্নত হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক ট্রানজিট হাবে পরিণত হতে পারবে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
বর্তমান বিশ্বে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারেক রহমানের পক্ষ থেকে নরেন্দ্র মোদিকে লেখা চিঠিতে পারস্পরিক সম্মান, সাম্য ও সুফলের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে, তা এই বাস্তবতার প্রতিফলন।
দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও জলবণ্টন—এই বিষয়গুলোতে সহযোগিতা অপরিহার্য।
ধীরগতির কূটনীতি: টেকসই অগ্রযাত্রা
বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আশিস নন্দীর মন্তব্য—“সম্পর্ক ধীরগতিতে এগোচ্ছে, এভাবেই এগোনো দরকার”—এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। দ্রুত অগ্রগতি অনেক সময় অস্থায়ী হয়, কিন্তু ধীর ও স্থিতিশীল অগ্রগতি দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলে।
তারেক রহমানের নতুন সরকারের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈদেশিক নীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। ভারতও এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে নতুন সরকারকে সময় দিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।
জনসম্পৃক্ততা ও কূটনীতির মানবিক দিক
দিল্লির অনুষ্ঠানে কাচ্চি বিরিয়ানি, সংগীত পরিবেশন, এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে একটি মানবিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। এই ধরনের আয়োজন কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বও বাড়ায়।
কণ্ঠশিল্পী আয়েশা মৌসুমি ও জাহিদ নীরবের সংগীত পরিবেশন, কিংবা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাটারিং—এসবই দেখায়, রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়া
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সরকার এবং নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের সরকারের মধ্যে সম্পর্ক একটি ইতিবাচক ও সম্ভাবনাময় পর্যায়ে রয়েছে। ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও কূটনীতি—সব দিক থেকেই এই সম্পর্কের ভিত্তি শক্তিশালী।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্য বৈষম্য, পানি বণ্টন ইত্যাদি ইস্যুতে এখনও কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহযোগিতার মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।
দিল্লির ওই অনুষ্ঠানে যে বার্তা উঠে এসেছে, তা স্পষ্ট—বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে চায়। আর যদি এই ইতিবাচক মনোভাব বজায় থাকে, তবে আগামী দিনে এই সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন