ছবি: সংগৃহীত
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম দেশ-বিদেশের বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলছেন, কোরআনের বাণী আল্লাহ প্রদত্ত, কিন্তু এর অনেক তাফসিরে অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষতান্ত্রিকতা দেখা গেছে। কোরআনের ব্যাখ্যা দীর্ঘদিন পুরুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যা নারীদের জন্য নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। অষ্টম থেকে দশম শতকের মধ্যে তাফসির রচনা ক্রমেই পুরুষ নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, সেখানে পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যায় নারীর কণ্ঠস্বর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়—যা মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ের থেকে কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধর্মীয় বিষয় আলোচিত হলেও গবেষণাসমৃদ্ধ ও বিশ্বমানের ইসলামি বয়ানের অনুপস্থিতিতে ভুল তথ্য ও ভ্রান্ত ব্যাখ্যার ঝুঁকি প্রতীয়মান।
তিনি বলেন, আজ ইসলামকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে অপব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ও বিকৃত ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে—যা ইসলামের আসল মূল্যবোধের পরিচায়ক নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বক্তা ও তাদের মনগড়া ব্যাখ্যাভিত্তিক বক্তব্য এবং ধর্মকে হাতিয়ার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় নিমগ্ন রাজনৈতিক কর্মী—এ সবই এখন নতুন বাস্তবতা। অথচ চিন্তাবিদেরা ইজতিহাদের পক্ষে যুক্তি দেন এবং বলেন, ইসলাম নারীর অধিকারের পক্ষে।
ইন্দোনেশিয়ার বিশিষ্ট দুই গবেষক সিতি মুসদাহ মুলিয়া ও নুর রোফিয়াহ স্থানীয় সংস্কৃতি ও ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে এক বিশেষ ধরনের ইসলামি নারীবাদ গড়ে তুলেছেন। বিষয়টিকে সমর্থন করে মাহফুজ আনাম বলেন, আমাদের বেগম রোকেয়া ছিলেন গভীরভাবে ধার্মিক ও ইসলামের মূল্যবোধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। তিনি কখনো তার প্রিয় ধর্মের বিরুদ্ধে সামান্যতম কিছু লেখেননি। রোকেয়া 'ন্যায়'কে ইসলামের সকল মূল্যবোধের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইসলাম যুক্তিবাদ ও নারীর ক্ষমতায়ন সমর্থন করে।
তিনি বলেন, বেগম রোকেয়ার ১৯৩২ সালে মৃত্যুর পর এত বছরেও কোনো ইসলামি গবেষক বা বিদ্বান তার বিরুদ্ধে অসম্মানজনক শব্দ ব্যবহার করেননি। বরং, একজন মুসলিম নারী হিসেবে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং একই ধর্মের অনুসারী নারীদের উন্নত জীবন গড়াকে তিনি নিজের দায়িত্ব বলেই মনে করতেন।রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে 'মুরতাদ' ও 'কাফির' বলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষক তরুণ প্রজন্মকে কী শিক্ষা দিচ্ছেন, সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
'বাংলাদেশ নিডস মোর ডাইনামিক ইসলামিক ডিসকোর্স' শিরোনামে লেখা এক উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন। তার লেখাটি ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে গতকাল শুক্রবার (১২ই ডিসেম্বর) প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটির অনুবাদ ডেইলি স্টারের বাংলা অনলাইন সংস্করণে গতকাল রাত ১১টার দিকে প্রকাশিত হয়েছে 'বাংলাদেশে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গবেষণাকেন্দ্রিক ইসলামি আলোচনা প্রয়োজন' শিরোনামে।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের এবারের জন্মবার্ষিকীতে তাকে 'মুরতাদ' ও 'কাফির' বলে উল্লেখ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের দেওয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে মাহফুজ আনাম বলেন, অনন্য সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্বের সমালোচনা বা তাকে আক্রমণ করতে হলে সেটা কি তথ্য, যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিই করা উচিত না? ইসলাম ধর্মে যেসব শব্দের গভীর তাৎপর্য আছে, সেগুলো কি ইচ্ছেমতো কারও দিকে এভাবে ছুঁড়ে দেওয়া যায়? এভাবে ভর্ৎসনা করা যায়?
তিনি বলেন, প্রশ্ন জাগে, কেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তাকে 'কাফির' ও 'মুরতাদ' বললেন? এমন শিক্ষকদের আমরা কখনোই আমাদের ধর্মবোধ গঠনের দায়িত্ব দিতে পারি না। আমি সচেতনভাবেই ওই শিক্ষকের বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম-পরিচয় উল্লেখ করছি না। কারণ, এই আলোচনাটি একেবারেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক করতে চাইনি।
মাহফুজ আনাম বলেন, পদার্থবিজ্ঞানের ওই শিক্ষক আরেকটি ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, 'একজন মুসলমান কখনো এমন অবস্থান গ্রহণ করতে পারে না যার কারণে তার ঈমান সন্দেহে পতিত হয়, তার উপর কুফরে লিপ্ত হওয়ার অপবাদ তৈরি হয়। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, নারীবাদ ও লালনবাদ এগুলোর কথা বলছি।' অর্থাৎ, এ দেশের করদাতাদের টাকায় বেতন পাওয়া এই শিক্ষক মনে করেন, 'গণতন্ত্র' হলো 'কুফরি'র অংশ এবং বেগম রোকেয়া 'মুরতাদ' ও 'কাফির'! তরুণ প্রজন্মকে তিনি কী শিক্ষা দিচ্ছেন, সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা, যেটা কিনা জ্ঞানের নিকশিত আধারগুলোর অন্যতম, সেই পদার্থবিজ্ঞানের একজন শিক্ষক সম্প্রতি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মবার্ষিকীতে তাকে 'মুরতাদ' ও 'কাফির' বলে উল্লেখ করেছেন বলে জানা গেছে। বাঙালি মুসলিম নারী শিক্ষার এই অগ্রদূত, বেগম রোকেয়া (১৮৮০–১৯৩২) নামেই সমধিক পরিচিত।
তিনি বলেন, তিনি (বেগম রোকেয়া) দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষত বাংলার মুসলিম নারীর জীবনে আমূল পরিবর্তন এনেছেন। নারীদের শিক্ষিত, জ্ঞানবান ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পারঙ্গম করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। যখন নিরক্ষরতা, শোষণ ও দারিদ্র্য নারীর জীবন গ্রাস করে রেখেছিল, সেই সময়ে তার কাজ বাঙালি মুসলিম নারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত পরিসর বৈপ্লবিকভাবে বদলে দেয়।
তিনি বলেন, অষ্টম থেকে দশম শতকের মধ্যে তাফসির রচনা ক্রমেই পুরুষ নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। সেখানে পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যায় নারীর কণ্ঠস্বর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়—যা মহানবী (সা.)-এর সময়ের থেকে কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন। বহু পরে উনিশ শতকে জামালুদ্দিন আফগানি, মুহাম্মদ আবদুহ ও কাসিম আমিন যুক্তি দেন, ইসলাম নারীর অধিকারকে সমর্থন করে—যা পরবর্তী প্রজন্মের নারী-অধিকারকেন্দ্রিক ইসলামি গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করে।
তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়ার বিশিষ্ট দুই গবেষক সিতি মুসদাহ মুলিয়া ও নুর রোফিয়াহ লিঙ্গসমতায় ইসলামের ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনাকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছেন। তারা তৃণমূল পর্যায়ে মুসলিম নারীদের লিঙ্গসংবেদনশীল ইসলামি ধারণায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছেন। স্থানীয় সংস্কৃতি ও ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে তারা এক বিশেষ ধরনের ইসলামি নারীবাদ গড়ে তুলেছেন। ইন্দোনেশিয়ার নারীবাদী আন্দোলনের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—১. লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠায় ধর্ম ব্যাখ্যার সংস্কার। ২. ইসলামের নৈতিক ভিত্তিতে নারীবাদকে দাঁড় করিয়ে জনপরিসরের আলোচনা ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব সৃষ্টি।
তিনি বলেন, প্রকৃত ইসলামি গবেষণা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জরুরি। অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি আমাদের বিপদে ফেলছে। কারণ, আমরা আমাদের ধর্মকে ভালোবাসি এবং সেটাই অনুসরণ করতে চাই। তাই এর যেকোনো ধরনের অপব্যবহার ও বিকৃতি বিপজ্জনক। গবেষণাভিত্তিক, যুক্তিনির্ভর, বিশ্বমানের ইসলামি বিদ্যার চর্চা আমাদের জন্য অতীব জরুরি।
খবরটি শেয়ার করুন