ছবি: সংগৃহীত
দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ঘটনাকে ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের ১০১ জন সাংবাদিক। তারা মনে করছেন, রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমকে আইনগত প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী এবং এটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।
আজ শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে নিজেদের ‘প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসব সাংবাদিক বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তারা গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা অনুভব করছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়—“আমরা, দেশের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী সাংবাদিক সমাজ, গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে—প্রথমে অন্তর্বর্তীকালীন অবৈধ ইউনুস সরকার অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে বিএনপি সরকার আইন প্রণয়নের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে।”
বিবৃতিতে গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং জনগণের স্বাধীনভাবে মতামত গঠনের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এতে বলা হয়—“গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং জনগণের স্বাধীনভাবে মতামত গঠনের অধিকার। কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম প্রশাসনিক বা আইনগত প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী এবং তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করতে পারে।”
সাংবাদিকেরা মনে করেন, রাজনৈতিক মতবিরোধের সমাধান রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই হওয়া উচিত। বিবৃতিতে বলা হয়—“আমরা মনে করি, রাজনৈতিক মতবিরোধের সমাধান হতে হবে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে—আইন বা শক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে নয়। একটি দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না; বরং এতে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়ে।”
এতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিও বিষয়টি পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিবৃতিদাতারা বলেন, “আমরা সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই—গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করুন। দেশের জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুন।”
তারা বলেন, “একই সঙ্গে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংস্থা এবং সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণে গঠনমূলক ভূমিকা রাখে।”
বিবৃতির শেষাংশে বলা হয়—“গণতন্ত্রের পথ কখনো সংকীর্ণ হতে পারে না—এটি হতে হবে সকলের জন্য উন্মুক্ত, সহনশীল এবং ন্যায়ভিত্তিক।” এই বিবৃতির বার্তা প্রেরক হিসেবে নাম রয়েছে নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের সদস্য সচিব শেখ জামালের।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী হিসেবে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিক, সম্পাদক, সংগঠক এবং প্রবাসী সাংবাদিকসহ মোট ১০১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে রয়েছেন মোল্লা জালাল, সৈয়দ বদরুল আহসান, ফরিদা ইয়াসমিন, সৈয়দ বোরহান কবীর, শাবান মাহমুদ, সোহেল হায়দার চৌধুরী, রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, মাসুদা ভাট্টি, ফাল্গুনী দত্ত, রমজান আলী, তৌফিক মারুফ, শামীমা আক্তার দোলা, মাহবুব হাসান, শহিদুল হক জীবন, বাণী ইয়াসমিন হাসি, এফ এম শাহীন, হায়দার হোসেন, হাকিকুল ইসলাম খোকন, ইমরান হাসান টুটুল, প্রদীপ কুমার চৌধুরী, শতদল তালুকদার, আজহার মাহমুদ, হাসনাত শাহীন, ইশ্রাফিল হাওলাদার, রুবেল হাসান, নাছির উদ্দিন চৌধুরী, ইমরানুল আজিম চৌধুরী, গাজী শাহ রিয়াজ, উৎপল দাস, আসাদুজ্জামান আসাদ, গাজী তুষার আহমেদ, সফিউর রহমান, ফারজানা শোভা, এসকে রেজা পারভেজ, নাজমুল হাসান রাজ, মিজানুর রহমান অপু, শফিকুল ইসলাম, মুক্তা মনোয়ার, সাজু লস্কর, হাসনাত কামাল, আজিজুল আম্বিয়া, তওহিদ ফিতরার ও মতিয়ার চৌধুরীসহ আরও অনেকে।
সাংবাদিকদের এই সম্মিলিত বিবৃতি রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন