ছবি: সংগৃহীত
চার বছরের বেশি সময় পর গম ও গমজাত পণ্য রপ্তানির ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে ভারত। দেশটির সরকার এখন গম, ডুরুম গম, আটা, ময়দা ও সুজি রপ্তানিকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করেছে। গতকাল সোমবার (২৪ আগস্ট) ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বৈদেশিক বাণিজ্য মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে এ-সংক্রান্ত দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর ফলে এত দিন নিষিদ্ধ শ্রেণিতে থাকা গম ও ডুরুম গম এবং গমের আটা, ময়দা ও সুজি এখন অবাধে রপ্তানি করা যাবে।
ভারতের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় গম আমদানিকারক দেশ এবং দেশের খাদ্যশস্যের চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ গম বিদেশ থেকে আনতে হয়। ভৌগোলিকভাবে কাছের দেশ ভারত হওয়ায় সেখান থেকে গম আমদানিতে সমুদ্রপথের তুলনায় স্থলসীমান্ত ব্যবহার করে পরিবহন খরচ ও সময়—দুটিই কম হতে পারে। তবে ভারতের গমের বর্তমান দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেই বাংলাদেশে গমের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা এখনই নেই।
ভারতের সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে গমের সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়া এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশে ভারতীয় গমের চাহিদা বেড়েছে। গত এক মাসে বাংলাদেশে স্থলসীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গমের রপ্তানির পরিমাণও বাড়ছিল বলে দেশটির ব্যবসায়ী ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। রপ্তানি পুরোপুরি উন্মুক্ত হওয়ায় এখন বড় কোম্পানির পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি আকারের ময়দা ও গম প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানও বিদেশে পণ্য পাঠানোর সুযোগ পাবে।
ইকোনমিক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগে ভারত সরকার গম রপ্তানিতে বন্দর ও পরিমাণভিত্তিক নানা শর্ত আরোপ করেছিল। এতে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। এখন সেই বাধা উঠে যাওয়ায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে ভারতীয় গম ও গমজাত পণ্যের সরবরাহ বাড়তে পারে। ভারতের রোলার ফ্লাওয়ার মিলার্স ফেডারেশনের সভাপতি নবনীত চিতলাঙ্গিয়া বলেছেন, দেশের খাদ্যনিরাপত্তার প্রয়োজনের চেয়ে গমের মজুত বেশি থাকায় রপ্তানি উন্মুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য লাভ হলো সরবরাহের বিকল্প উৎস বাড়া। বিশ্ববাজারে রাশিয়া ও ইউক্রেনের গম সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে অন্য উৎসের দিকে যেতে হয়। কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের শস্য অবকাঠামোয় হামলা এবং জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে গমের দামও বেড়েছে। হিন্দুস্তান টাইমস-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ের শুরু থেকে শিকাগোতে গমের ভবিষ্যৎ সরবরাহের দর ১৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফলে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের আমদানিকারকদের জন্য ভারতের গমের বাজারে ফিরে আসা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের সরকারি গমের মজুতের অবস্থাও এখন আগের তুলনায় অনেক ভালো। হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, ১ আগস্ট ভারতের সরকারি খাদ্য সংস্থার গুদামে গমের মজুত ছিল ৫ কোটি ৫ লাখ টন। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি এবং গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি বিপণন মৌসুমে সরকারি গম সংগ্রহও হয়েছে ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার টনের মতো, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৩ কোটি ৪৬ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কমেছে এবং সরকার রপ্তানি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ভারত ২৫ লাখ টন গম রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল। পরে আরও ২৫ লাখ টন অনুমোদন দেওয়ায় মোট কোটা দাঁড়ায় ৫০ লাখ টন। কিন্তু অনুমোদিত পরিমাণের বড় অংশই শেষ পর্যন্ত রপ্তানি হয়নি। হিন্দুস্তান টাইমস-এর হিসাবে, এখন পর্যন্ত গমজাত পণ্যের প্রকৃত রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টন। এর বাইরে বাংলাদেশে কিছু ছোট চালান গেছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে বড় কোটা থাকলেও দামের কারণে ভারতীয় গম আন্তর্জাতিক বাজারে খুব বেশি প্রতিযোগিতামূলক ছিল না।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই বড় প্রশ্ন—ভারতের গম আদৌ কতটা সাশ্রয়ী হবে। হিন্দুস্তান টাইমস-এর সঙ্গে কথা বলা একটি আন্তর্জাতিক পণ্যবাণিজ্য সংস্থার প্রধান জানিয়েছেন, কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের গমের দাম বর্তমানে প্রতি টনে প্রায় ২৭০ ডলার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিবহন খরচ যোগ হলে সেই দাম দাঁড়ায় প্রায় ৩১০ থেকে ৩১৫ ডলার। অন্যদিকে ভারতের গুজরাটের কান্দলা বন্দরে গমের দাম বর্তমানে প্রতি ১০০ কেজিতে প্রায় ২ হাজার ৭০০ রুপি। রপ্তানিকারকদের হিসাবে, লাভজনকভাবে রপ্তানি করতে হলে এই দাম প্রায় ২ হাজার ৬০০ রুপির কাছাকাছি হওয়া দরকার। অর্থাৎ ভারতের গমের দামে এখনো কিছুটা ঘাটতি রয়েছে।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হিসাবটা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে স্থলবন্দর দিয়ে গম আনা সম্ভব হওয়ায় সমুদ্রপথে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। গত এপ্রিলেও হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছিল, বৈশ্বিক সরবরাহে চাপের মধ্যে বাংলাদেশ ভারত থেকে গম কেনার বিষয়ে আগ্রহী এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীরা এ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন ভারতীয় গমের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশি ক্রেতারা কাছের বাজার থেকে গম কেনার বিষয়টি বিবেচনা করছিলেন।
অর্থাৎ ভারতের রপ্তানি উন্মুক্ত হওয়ার প্রথম সুবিধা হতে পারে সরবরাহের নিশ্চয়তা। বিশ্ববাজারে কোনো কারণে রাশিয়া, ইউক্রেন বা অন্য বড় রপ্তানিকারক দেশ থেকে গমের সরবরাহ কমে গেলে বাংলাদেশ দ্রুত ভারতের বাজারে যেতে পারবে। আগে কোটা ও সরকারি অনুমোদনের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সেই বাধা না থাকায় বাংলাদেশের আমদানিকারকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী ভারতীয় রপ্তানিকারকদের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক চুক্তি করতে পারবেন। এতে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হলে দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে গম সংগ্রহের সুযোগ বাড়বে।
দ্বিতীয় সুবিধা হতে পারে আমদানির প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি। ভারতীয় গম অবাধে রপ্তানি করতে পারলে বাংলাদেশের আমদানিকারকদের হাতে রাশিয়া, ইউক্রেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আরেকটি বড় উৎস থাকবে। একাধিক দেশের মধ্যে দর–দাম যাচাই করে কেনার সুযোগ থাকলে আমদানিকারকদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আটা, ময়দা, বিস্কুট, নুডলস, পাস্তা, বেকারি পণ্যসহ গমনির্ভর বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে।
তৃতীয়ত, স্থলবন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, বাংলাদেশে ভারতীয় গমের চাহিদা বাড়ছে এবং গত এক মাসে দুই দেশের স্থলসীমান্ত দিয়ে গমের বাণিজ্যও বাড়ছিল। দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও সহজ হলে এই প্রবাহ বাড়তে পারে। গতকালই বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তারা স্থলবন্দরগুলো পুরোপুরি সচল করা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বিভিন্ন বাধা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ফলে গমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্থলপথে বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ভারতের সিদ্ধান্তের আরেকটি দিকও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় গমের চাহিদা বাড়লে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে দামও বাড়তে পারে। ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, ভারতে পাইকারি বাজারে গমের দাম মে মাসে প্রতি কেজি প্রায় ২৫ রুপি থেকে বেড়ে বর্তমানে ২৮ দশমিক ৫০ রুপিতে উঠেছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অবশ্য এই দামকে মৌসুমি স্বাভাবিক বৃদ্ধি হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় গমের চাহিদা আরও বাড়বে বলে তারা আশা করছেন।
ভারতের দ্য প্রিন্টও জানিয়েছে, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের সরবরাহ বাড়তে পারে। দেশটির সর্বশেষ গম উৎপাদন রেকর্ড ১২ কোটি ৬ লাখ টনে পৌঁছেছে। একই সময়ে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে শস্য সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে ভারত যদি বড় পরিমাণে গম রপ্তানি করতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের চাপ কিছুটা কমতে পারে।
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার দিক থেকেও ভারতের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। সরকার যদি বিভিন্ন উৎস থেকে গম আমদানির সুযোগ খোলা রাখে, তাহলে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে দর বেড়ে গেলে কাছের দেশ ভারত থেকে আমদানির সুযোগ কাজে লাগানো যেতে পারে। আবার ভারতের দাম বেশি হলে বাংলাদেশ অন্য উৎস থেকে আমদানি করতে পারবে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে বিকল্পের পরিধি বাড়া।
এদিকে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকারি পর্যায়ের চুক্তির আওতায় আরও ২ লাখ ২০ হাজার টন গম আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। প্রতি টনের দাম ধরা হয়েছে ৩২২ ডলার। এই আমদানিতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৮৬৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যেও এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত—দুই উৎস থেকেই গম আমদানির সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে।
সব মিলিয়ে ভারতের গম রপ্তানি পুরোপুরি উন্মুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের মূল্যপতনের নিশ্চয়তা না দিলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। ভারতের গমের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের কাছাকাছি নেমে এলে এবং স্থলপথে পরিবহন সুবিধা কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশি আমদানিকারকেরা লাভবান হতে পারেন। এতে দেশের বাজারে গমের সরবরাহ বাড়তে পারে এবং আটা-ময়দার দামের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজার, ভারতের অভ্যন্তরীণ দাম, পরিবহন ব্যয় এবং রপ্তানিকারকদের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত—এই চারটি বিষয়ই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভোক্তারা এই সিদ্ধান্তের সুফল কতটা পাবেন। ভারতের বাজারে গমের দাম বেশি থাকলে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার সুফল মূলত বাণিজ্যের বিকল্প ও সরবরাহের নিশ্চয়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন