ফাইল ছবি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপার মুক্তি দাবি করেছে ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (সিপিজে)।
২০১৩ সালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে ‘হত্যাযজ্ঞ’ চালানোর অভিযোগে করা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানোর পরদিন সিপিজে এ দাবি জানায়।
শাপলা চত্বরের ঘটনায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এ ব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে আগামী ৭ জুন তারিখ রেখেছেন আদালত। মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিকেও।
সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর কুনাল মজুমদার বলেন, “কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক ঘটনার সংবাদ কভারের ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনোভাবেই মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়। সাংবাদিকদের শাস্তি দিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের কাঠামোর ব্যবহার বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার বা সুরক্ষা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার শামিল। এটি একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কনভেনশনেরও লঙ্ঘন।”
তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিকদের নিশানা বানাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করা উচিত। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুকে মুক্তি দেওয়া।”
সিপিজের বিবৃতিতে বলা হয়, প্রসিকিউটরদের অভিযোগ অনুযায়ী শাপলা চত্বরের ঘটনার পর একাত্তর টিভির প্রতিবেদনে ফারজানা রূপা ‘বিতর্কিত ব্যক্তিদের’ বক্তব্য ব্যবহার করেন এবং ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য’ ছড়ান, যা সেই সাঁড়াশি অভিযানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো থেকে মানুষের ‘নজর সরিয়ে’ দেয়।
আর মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ওই প্রতিবেদনের সম্প্রচার কার্যক্রম তদারকি করেন। প্রধান প্রসিকিউটর একে শাপলা চত্বরে নিহতের ‘প্রকৃত সংখ্যা গোপন করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সিপিজে বলেছে, “শাপলা চত্বরের অভিযানের সময় বা আগে-পরে একাত্তর টিভির সম্প্রচারগুলো সিপিজে স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তবে ২০১৩ সালে ব্যাপকভাবে প্রচার হওয়া ফারজানা রূপার উপস্থাপনার একটি ইউটিউব তথ্যচিত্রে সিপিজে পর্যালোচনা করেছে।”
“সেই তথ্যচিত্রে অভিযান পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল, হতাহতের সংখ্যা নিয়ে করা দাবিও চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। এর মধ্যে এমন ব্যক্তিদেরও খুঁজে বের করা হয়, যাদের নাম নিহতের তালিকায় থাকলেও পরবর্তীতে তাদের জীবিত পাওয়া যায়।”
অন্যদিকে সাংবাদিকদের বিষয়ে প্রসিকিউশনের ভাষ্য, সাংবাদিক ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবু শুরু থেকেই হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশকে ‘উসকানিমূলক’ আখ্যা দিয়ে একাত্তর টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রচার করেন এবং গণমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে শাপলা চত্বর অভিযান ঘিরে ‘ভিন্ন বয়ান’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “অপরাধ করার ক্ষেত্রে কে সাংবাদিক, কে আইনজীবী, কে ডাক্তার, কে কোন পেশার, সেটা দেখার কোনো সুযোগ নাই। আমরা অপরাধের বিচার করি। সুনির্দিষ্ট অপরাধ করলে যে কোনো পেশার মানুষকেই বিচারের আওতায় আনা হবে।”
তিনি বলেন, শুধু ভুল সংবাদ পরিবেশনের জন্য নয়, বরং শাপলা চত্বরের ঘটনার পেছনের ‘মেকানিজম’ বা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সাংবাদিক বাবু ও রূপাকে গ্রেপ্তারের পর ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের মামলায়ও গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গত ১১ মে হাইকোর্ট রূপাকে ছয়টি মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাসহ অন্যান্য অভিযোগ বিচারাধীন থাকায় তিনি এখনো কারাগারে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সিপিজে দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিয়ে ধারাবাহিক উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। সংস্থাটি এর আগে সরকারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলেছিল, কয়েকজন সাংবাদিক দীর্ঘ সময় ধরে কারাবন্দি থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা অভিযোগপত্র উপস্থাপন করা হয়নি। সংস্থাটি এসব মামলার সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের সম্পর্ক থাকার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরে।
গণমাধ্যম ও আইন বিশ্লেষকদের মতে, এখানে দুটি পৃথক প্রশ্ন সামনে এসেছে—একটি সংবাদ পরিবেশনের স্বাধীনতা, অন্যটি কোনো অপরাধমূলক পরিকল্পনায় সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত বা সংবাদ প্রচারের ভিত্তিতে সাংবাদিককে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের আওতায় আনা হলে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে যদি তদন্তে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় যে কোনো ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে অপরাধ সংঘটনে পরিকল্পিত ভূমিকা রেখেছেন, তাহলে আইনগত বিচারের সুযোগও রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সংবেদনশীল মামলায় তদন্তের মান, প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং বিচারিক স্বচ্ছতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এই মামলার ফল শুধু অভিযুক্তদের নয়, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিবেশ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রশ্নেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
শাপলা চত্বরের ২০১৩ সালের ঘটনা দেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের অন্যতম বিষয়। হতাহতের সংখ্যা, অভিযানের প্রকৃতি এবং সে সময় গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান রয়েছে। সেই পুরোনো বিতর্ক এখন নতুন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলোচনায় উঠে এসেছে।
খবরটি শেয়ার করুন