ছবি: সংগৃহীত
আজ ঢালিউডের অকালপ্রয়াত চিত্রনায়ক সালমান শাহর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ক্ষণজন্মা এই নায়ক। সালমান শাহর অকালপ্রয়াণে থমকে গিয়েছিল দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন। তার মৃত্যুর সময় শুটিং ও মুক্তির প্রক্রিয়ায় থাকা একাধিক সিনেমা নিয়ে তৈরি হয়েছিল জটিলতা। কোনো সিনেমার ডাবিং বাকি ছিল, কোনোটির শুটিং ছিল অসম্পূর্ণ। নানা জটিলতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সালমানের মৃত্যুর পর আলোর মুখ দেখে ৯টি সিনেমা।
১৯৯৬ সালে সালমানের মৃত্যুর পর ওই বছর প্রেক্ষাগৃহে আসে তার অভিনীত চারটি সিনেমা ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’ ও ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’। এই চার সিনেমা মুক্তি দিতে নির্মাতাদের তেমন বেগ পেতে হয়নি। কারণ, মৃত্যুর আগে এই চার সিনেমার শুটিং ও ডাবিং শেষ করেছিলেন সালমান। তবে এরপর মুক্তি পাওয়া চার সিনেমা মুক্তি দিতে নানা কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়েছিল নির্মাতাদের।
অসমাপ্ত সিনেমাগুলোতে সালমান শাহর ধারণকৃত দৃশ্যের পাশাপাশি তার চেহারার আদলে ডামি ব্যবহার করে বা দূর থেকে শট নিয়ে শেষ করা হয় শুটিং। ডাবিং করাতে হয়েছে ভিন্নজনকে দিয়ে। কয়েকটি সিনেমায় পরিবর্তন করা হয়েছে গল্প ও চিত্রনাট্য।
১৯৯৭ সালের ১৮ এপ্রিল মুক্তি পায় ‘প্রেম পিয়াসী’। এই সিনেমার গান, ক্লাইম্যাক্সসহ বেশ কয়েকটি দৃশ্যের শুটিং শেষ করতে পারেননি সালমান। ফলে নায়িকা শাবনূরকে ফোকাস করে গানের শুটিং করা হয়। দূর থেকে নেওয়া দৃশ্যে ব্যবহার করা হয় সালমানের ডামি। এ ছাড়া সালমান না থাকায় শেষ দৃশ্যে পরিবর্তন এনে নায়ক-নায়িকার আত্মহনন দেখান নির্মাতা।
ওই বছর জুলাইয়ে মুক্তি পাওয়া ‘স্বপ্নের নায়ক’ সিনেমার অর্ধেকের কম শুটিং করেছিলেন সালমান। তাই সিনেমার গল্প বদলে মাঝামাঝি দিকে সড়ক দুর্ঘটনায় সালমানের মৃত্যু দেখানো হয়। পরে আমিন খানকে যুক্ত করে সিনেমার গল্প এগিয়ে নেওয়া হয়।
সবচেয়ে করুণ অবস্থা ছিল জুলাইয়ে মুক্তি পাওয়া আরেক সিনেমা ‘শুধু তুমি’র। এই সিনেমার ৩০ ভাগের কম অংশের শুটিং করেছিলেন সালমান। তাই ডামি ব্যবহার করে গল্প পরিবর্তন করে শেষ করা হয় দৃশ্যধারণ। কিন্তু সালমানের ডামির ব্যবহার ছিল দৃষ্টিকটু।
আগস্টে মুক্তি পাওয়া ‘আনন্দ অশ্রু’ সিনেমার বেশির ভাগ শুটিং করা ছিল সালমানের মৃত্যুর আগে। তবে এন্ড ক্লাইম্যাক্স, গানের দৃশ্য ও ডাবিং করে যেতে পারেননি সালমান।
সালমান অভিনীত মুক্তি পাওয়া সর্বশেষ সিনেমা ‘বুকের ভিতর আগুন’। বেশির ভাগ শুটিং বাকি থাকায় এই সিনেমার কাহিনিতেও আনা হয় পরিবর্তন। গল্পে প্লাস্টিক সার্জারির ফলে বদলে যায় সালমানের চেহারা। সেই ভূমিকায় বড় পর্দায় অভিষেক হয় ফেরদৌস আহমেদের। সিনেমাটি ফেরদৌসের জন্য এসেছিল আশীর্বাদ হয়ে। বুকের ভেতর আগুনের রাফকাট দেখেই নির্মাতা বাসু চ্যাটার্জি তাকে ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র জন্য চূড়ান্ত করেন।
এ ছাড়া সালমানের কিছু অংশের শুটিং করা দৃশ্য বাদ দিয়ে রিয়াজকে নিয়ে নতুন করে বানানো হয় ‘মন মানে না’ সিনেমাটি। একই অবস্থা হয় ‘কে অপরাধী’ ও ‘তুমি শুধু তুমি’ সিনেমার। ওমর সানী অভিনয় করেন কে অপরাধী আর অমিত হাসান তুমি শুধু তুমি সিনেমায়।
সালমান স্মরণে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী
সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। ৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর বিএফডিসির ভিআইপি প্রজেকশন হলে প্রতিদিন বিকেল ৪টায় দেখানো হবে সালমান শাহ অভিনীত সিনেমা। আজ প্রথম দিন প্রদর্শিত হবে ‘স্বপ্নের ঠিকানা’। আগামীকাল থাকছে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ এবং শেষ দিন ‘তোমাকে চাই’ সিনেমা।
অন্যদিকে সালমান স্মরণে গতকাল শনিবার থেকে দীপ্ত টিভিতে শুরু হয়েছে সাত দিনব্যাপী সালমান অভিনীত সিনেমার প্রদর্শনী। স্পেশাল ম্যাটিনি শো নামের এই আয়োজনে প্রতিদিন বেলা ২টা ৩০ মিনিটে দেখানো হবে সাতটি সিনেমা। আজ প্রচার করা হবে স্বপ্নের ঠিকানা।
মৃত্যু নিয়ে মামলার সর্বশেষ অবস্থা
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসভবন থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর সময় তিনি দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন।
সালমানের মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিযোগ আনা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে এর কোনো সুরাহা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে তদন্তে এটিকে আত্মহত্যা বলে দাবি করা হলেও সালমানের মা নীলা চৌধুরী তা প্রত্যাখ্যান করে নারাজি দেন। দীর্ঘ প্রায় ২৯ বছর পর আদালত এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা নয়, বরং হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর রমনা থানায় সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর বাদী হয়ে সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, অভিনেতা আশরাফুল হক ডনসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
সম্প্রতি এই মামলায় অভিযুক্ত আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে। তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আগামী ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আদালত নতুন দিন ধার্য করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় সময় চেয়ে আবেদন করলে আদালত এই নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। বর্তমানে গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্ত ডনসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
প্রয়াত এই নায়কের মৃত্যুরহস্য এবং মামলার বিচার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জনমনে প্রশ্ন ও ক্ষোভ রয়েছে। নতুন করে তদন্ত শুরু হওয়া এই মামলার অগ্রগতির দিকে এখন সালমানভক্তদের বিশেষ নজর রয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন