ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু, সাবেক বার্তা প্রধান শাকিল আহমেদ এবং সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপাকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে রাখা হয়েছে। তাদের মুক্তির দাবি জানিয়েছে নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন মামলা প্রত্যাহারেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক বিবৃতিতে নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের আহ্বায়ক আকতার হোসেন ও সদস্য সচিব শেখ জামাল এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সংগঠনটির সদস্য মো. রমজান আলী স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, পেশাদার সাংবাদিকদের বিনা বিচারে আটকে রাখা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা।
বিবৃতিতে নেতারা বলেন, দুই বছরের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকদের আটকে রেখে এমন সব ঘটনার মামলায়ও যুক্ত করে হয়রানি করা হচ্ছে, যেসব ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর শ্যামল দত্ত ও মোজাম্মেল বাবুকে আটক করা হয়। একই বছরের ২১ আগস্ট শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপাকে আটক করা হয়। তাদের গ্রেপ্তারের পর বিভিন্ন হত্যা মামলায় আসামি করা হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এসব সাংবাদিকের আটক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। সংগঠনটি বলেছিল, সাবেক সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বা তাদের সংবাদ পরিবেশনের কারণে সাংবাদিকদের দায়ী করা উচিত নয়। একই বিবৃতিতে মোজাম্মেল বাবু এবং আরও কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর নামও হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
এরপর সাংবাদিকদের সুরক্ষা কমিটিও বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার কথা বলে। ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, সাংবাদিকদের সুরক্ষা কমিটি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্তকে মুক্তির জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। সংগঠনটির ভাষ্য ছিল, তাদের বিরুদ্ধে আনা হত্যা অভিযোগের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে এবং এসব মামলা তাদের সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ধারণার কারণে প্রতিশোধমূলকভাবে করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে।
চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল সাংবাদিকদের সুরক্ষা কমিটি আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে চিঠি দিয়ে চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার এবং তাদের মুক্তির আহ্বান জানায়। ওই চিঠিতে বলা হয়, তখন পর্যন্ত তাদের আটক থাকার সময় ১৮ মাসের বেশি হলেও হত্যা মামলাগুলোতে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি এবং কোনো অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়নি। সংগঠনটি আরও জানায়, শ্যামল দত্তের হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা ও তীব্র নিদ্রাকালীন শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মোজাম্মেল বাবু ২০২৩ সালের শেষ দিকে মূত্রগ্রন্থির ক্যানসারের জন্য বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করালেও তার নিয়মিত পরবর্তী চিকিৎসা হয়নি বলে সংগঠনটি উল্লেখ করে। ফারজানা রূপাকে ২০২৪ সালের নভেম্বরে দুই সপ্তাহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের জন্য নির্ধারিত একটি বিশেষ কারাকক্ষে রাখার কথাও চিঠিতে বলা হয়।
চলতি বছরের ১৫ জুলাই সাংবাদিকদের সুরক্ষা কমিটিসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও গণমাধ্যম সংগঠন ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান অভিযোগ প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একই সময়ে বলেছে, সাংবাদিকতার কাজ, সংবাদ পরিবেশন ও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিচার করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আগস্টেও শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপাকে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ দেখা দেয়। ১৮ আগস্ট সাংবাদিকদের সুরক্ষা কমিটি জানায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নতুন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করা হয়েছে। সংগঠনটি অভিযোগ প্রত্যাহার এবং সংবাদ পরিবেশনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার আহ্বান জানায়।
২৪ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপাকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনাল ২৫ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেন। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ওই তিন সাংবাদিকের বক্তব্য আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পরবর্তী দমন-পীড়নকে উসকে দিতে ভূমিকা রেখেছিল।
তবে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশন ২৬ আগস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। সংগঠনটি জানায়, ২৪ আগস্ট তাদের জামিন দেওয়া হয়নি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ২৪ আগস্টের প্রতিবেদনে জানায়, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তিন সাংবাদিককে বিচার শুরু হওয়া পর্যন্ত কারাগারে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে ভূমিকার অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই আটককে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক বলে সমালোচনা করেছে।
এদিকে শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো নিয়েও আদালতে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। ১১ মে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, হাইকোর্ট শাকিল আহমেদকে পাঁচটি এবং ফারজানা রূপাকে ছয়টি মামলায় অন্তর্বর্তী জামিন দেন। তবে আরও একটি মামলায় জামিন না পাওয়ায় তখন তাদের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। পরে ৭ জুন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত তাদের ১০টি মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের আদেশ স্থগিত করেন।
নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের বিবৃতিতে বলা হয়, সাংবাদিক শেখ জামাল, মঞ্জুরুল আলম পান্না, আনিস আলমগীর, শেখ ইমন আহমেদসহ সারা দেশে অর্ধশতাধিক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেকে এখনো কারাগারে আছেন বলে সংগঠনটি দাবি করেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন সংবাদপোর্টালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকসহ সারা দেশে ৪৪৬ জন সাংবাদিকের নামে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। এসব মামলা এখনো বহাল আছে।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করার সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও শারীরিক হেনস্থার তথ্যও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, সাংবাদিক সুমন্ত চক্রবর্তী, মেহেদী মামুন, আব্দুর রহমান, প্রবীর দাস, শ্যামল নন্দী ও মেহেরুল সুজনসহ ১১৮ জন সাংবাদিক শারীরিক হেনস্থা ও হামলার শিকার হয়েছেন।
এ ছাড়া সাংবাদিক মেহেদী হাসান, শাকিল হোসেন, তাহির জামান, এটিএম তুরাব, প্রদীপ কুমার ভৌমিক, সোহেল আখঞ্জিসহ ১৩ সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের নেতারা বিবৃতিতে বলেন, সাংবাদিকরা দেশের অপরাধ তুলে ধরার পাশাপাশি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। তারা দেশের সব সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আটক সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি জানান।
খবরটি শেয়ার করুন