বুধবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১লা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** শাহরিয়ার কবিরকে হুইলচেয়ার ব্যবহারের অনুমতি ট্রাইব্যুনালের *** অধ্যাপক আবুল বারকাতের দুই ফ্ল্যাট জব্দ, গাড়ি-ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ *** আরব সাগরে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধজাহাজের সংঘর্ষ, দিল্লির প্রতিবাদ *** মন্দিরের মেহেদি পরলে এক বছরের মধ্যে বিয়ে! *** সারের পর্যাপ্ত মজুতের তথ্যে সংসদীয় কমিটিতে দ্বিমত, মাঠপর্যায়ে সংকটের অভিযোগ এমপিদের *** চ্যানেল ওয়ানের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলের নেপথ্যে কী *** শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ভারত চক্রান্তের জাল বুনছে: রিজভী *** জামিন না পেয়ে আদালতকক্ষে বিচারককে গালি, পুলিশকে মারধরের অভিযোগ *** ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে সৌদির এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি হুতিদের *** মুডিস রেটিংয়ের ফলে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে: মাহদী আমিন

সুখবর এক্সপ্লেইনার

মন্দিরের মেহেদি পরলে এক বছরের মধ্যে বিয়ে!

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৮:৫৭ অপরাহ্ন, ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

প্রতীকী ছবি

ভারতের রাজস্থান রাজ্যের জয়পুরের একটি গণেশ মন্দিরে বিশেষ মেহেদি নিতে এবার ভক্তদের যে ঢল নেমেছে, তা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, বিয়ে নিয়ে সামাজিক প্রত্যাশা এবং লোকবিশ্বাস কীভাবে একসঙ্গে বড় জনসমাগম তৈরি করতে পারে, সেই আলোচনাও সামনে এসেছে।

জয়পুরের বিখ্যাত মোতি ডুংরি গণেশ মন্দিরে ১৩ সেপ্টেম্বর সিঞ্জারা উৎসব উপলক্ষে ভক্তদের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কেজি মেহেদি বিতরণ করা হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ মেহেদি শেষ হয়ে যায়। ভক্তদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই মেহেদি বিতরণ শুরু করতে হয় মন্দির কর্তৃপক্ষকে।

মন্দিরের এই মেহেদি ঘিরে একটি দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাস রয়েছে। অবিবাহিত নারী-পুরুষের মধ্যে অনেকে মনে করেন, গণেশকে নিবেদন করা এই মেহেদি হাতে লাগালে বিয়ের ক্ষেত্রে বাধা দূর হয়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রচারে দাবি করা হয়েছে, মেহেদি হাতে লাগানোর পর এক বছরের মধ্যে বিয়ে হতে পারে। তবে এটি ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচার। এর পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের কথা এসব প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

ভারতের নবভারত টাইমস জানিয়েছে, মোতি ডুংরি মন্দিরে সিঞ্জারা উৎসবের মেহেদি দেওয়ার ঐতিহ্য প্রায় দুই শত বছরের পুরোনো বলে মন্দির-সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন। একসময় এখানে অল্প পরিমাণ মেহেদি নিবেদন করা হতো। ভক্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিমাণও বেড়েছে। এবার রাজস্থানের সোজাত এলাকা থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কেজি মেহেদি আনা হয়েছিল।

মেহেদি বিতরণকে কেন্দ্র করে ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল থেকেই মন্দিরের আশপাশে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। ভারতের দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও প্রচারের কারণে এবার ভিড় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অনেকে শনিবার রাতেই জয়পুরে পৌঁছান। কেউ কেউ মন্দিরের বাইরে রাত কাটান। তীব্র গরম ও আর্দ্রতার মধ্যেও অনেক মানুষ ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত সারিতে অপেক্ষা করেন।

দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আরও জানিয়েছে, উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৮ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের হিসাবে উঠে এসেছে। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের প্রতিবেদনে সমাগমের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ বলা হয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রতিবেদনে সংখ্যার কিছু পার্থক্য রয়েছে। এত বড় ভিড়ের কারণে মন্দিরের আশপাশের সড়কে যানজট তৈরি হয়। পুলিশ ও মন্দিরের স্বেচ্ছাসেবকদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়।

ভারতের জাগরণ ও মানিকন্ট্রোলসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মেহেদি বিতরণের সময় মানুষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও ঠেলাঠেলির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। মহারাষ্ট্র থেকে আসা এক নারী ভক্ত ভিড়ের মধ্যে অচেতন হয়ে পড়েন বলেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও মন্দিরের কর্মীরা মানুষকে সারিতে রাখার চেষ্টা করেন।

এবারের ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা। মন্দিরে সিঞ্জারা উৎসব নতুন কোনো আয়োজন নয়। বহু বছর ধরেই এখানে গণেশকে মেহেদি নিবেদনের রীতি রয়েছে। কিন্তু এবার বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে মেহেদির সঙ্গে বিয়ের বিশ্বাসটি নতুন করে আলোচনায় আসে। ফলে শুধু জয়পুর বা আশপাশের এলাকার মানুষ নয়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকেও মানুষ সেখানে ছুটে যান।

জাগরণ জানিয়েছে, দিল্লি, চণ্ডীগড়, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, পুনে, ইন্দোর, ভোপাল ও আগ্রাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ জয়পুরে পৌঁছেছিলেন। কারও কারও আগমন ছিল আগের রাতেই। অর্থাৎ একটি স্থানীয় ধর্মীয় রীতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে।

এই প্রবণতার সামাজিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে বিয়ে এখনো বহু পরিবারের কাছে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক প্রত্যাশার বিষয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে নিয়ে তরুণ-তরুণীদের ওপর পরিবার ও সমাজের চাপ তৈরি হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিয়ে না হওয়া অনেক মানুষের কাছে এমন একটি বিশ্বাস মানসিক আশার জায়গা তৈরি করতে পারে। মন্দিরের মেহেদি সেই আশার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বিয়েতে বাধার মুখে থাকা নারী-পুরুষ এই মেহেদি নেন। পরে তা হাতে ব্যবহার করেন। কারও কারও বিশ্বাস, মনোবাসনা পূরণ হলে পরের বছর তারা আবার মন্দিরে এসে গণেশের কাছে বিয়ের প্রথম নিমন্ত্রণপত্র নিবেদন করেন। নবভারত টাইমস এমন বিশ্বাসের কথাও উল্লেখ করেছে।

তবে ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের সম্পর্ক আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির বিয়ে হয়ে গেলে তিনি সেটিকে মেহেদির আশীর্বাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। কিন্তু একই বিশ্বাস থেকে মেহেদিই বিয়ের কারণ—এমন বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বিয়ে সাধারণত ব্যক্তিগত পছন্দ, পারিবারিক সিদ্ধান্ত, সামাজিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নানা বাস্তব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস এ ঘটনার সামাজিক দিকটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের প্রতিবেদনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হামিদ দাবোলকারের বক্তব্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, লোকবিশ্বাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তিনি ধর্মীয় বিশ্বাসের নামে প্রতারণামূলক দাবি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকির কথাও বলেছেন।

অন্যদিকে, মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে বিষয়টি বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের অংশ। তাদের বক্তব্যে এটিকে বিয়ে নিশ্চিত করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে নয়, বরং গণেশের উদ্দেশে নিবেদিত প্রসাদ হিসেবে দেখা হয়। ফলে একই ঘটনাকে কেউ ধর্মীয় আচার হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি আশাবাদী বিশ্বাস হিসেবে গ্রহণ করছেন।

এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কোনো স্থানীয় উৎসব আগে সীমিত এলাকার মানুষের মধ্যে পরিচিত থাকলেও এখন একটি ভিডিও বা ছোট বার্তার মাধ্যমে তা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে। এবারও সেটিই হয়েছে বলে ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মেহেদির পরিমাণ, ভক্তের সংখ্যা এবং দীর্ঘ সারির দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় উৎসবটি আরও আলোচনায় আসে।

এতে অবশ্য একটি বাস্তব প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। ধর্মীয় উৎসবে বিপুল মানুষের সমাগম হলে নিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা, যান চলাচল এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত থাকবে, তা গুরুত্বপূর্ণ। এবার দীর্ঘ যানজট, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, ধাক্কাধাক্কি এবং একজন নারী ভক্ত অচেতন হওয়ার খবর সেই প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে এনেছে।

মোতি ডুংরি গণেশ মন্দিরের সিঞ্জারা উৎসব তাই শুধু মেহেদি বিতরণের ঘটনা নয়। এটি ভারতের একটি পুরোনো ধর্মীয় ঐতিহ্য কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন শক্তির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তারও একটি উদাহরণ। বিয়ে নিয়ে মানুষের আশা, পারিবারিক প্রত্যাশা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অনলাইনে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা—সব মিলিয়ে এবার উৎসবটি বড় আকার ধারণ করেছে।

তবে ৩ হাজার ৫০০ কেজি মেহেদি তিন ঘণ্টায় শেষ হয়ে যাওয়া যতটা বিস্ময়কর, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো এর পেছনে থাকা মানুষের প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশার বাস্তব ফল কী হয়েছে, তা পরিসংখ্যান দিয়ে বলা সম্ভব নয়। কারণ মেহেদি ব্যবহারের পর কতজনের এক বছরের মধ্যে বিয়ে হয়েছে, এমন কোনো নির্ভরযোগ্য অনুসন্ধান বা নথির কথা এসব প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে এক বছরের মধ্যে বিয়ে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি আপাতত ধর্মীয় ও লোকবিশ্বাস হিসেবেই দেখা উচিত।

মেহেদি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250