বুধবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১লা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** মন্দিরের মেহেদি পরলে এক বছরের মধ্যে বিয়ে! *** সারের পর্যাপ্ত মজুতের তথ্যে সংসদীয় কমিটিতে দ্বিমত, মাঠপর্যায়ে সংকটের অভিযোগ এমপিদের *** চ্যানেল ওয়ানের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলের নেপথ্যে কী *** শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ভারত চক্রান্তের জাল বুনছে: রিজভী *** জামিন না পেয়ে আদালতকক্ষে বিচারককে গালি, পুলিশকে মারধরের অভিযোগ *** ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে সৌদির এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি হুতিদের *** মুডিস রেটিংয়ের ফলে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে: মাহদী আমিন *** বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে কবরস্থানের জায়গা দখলের অভিযোগ, লাশ দাফন নিয়ে সংকট *** ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট আগামী বছর চালুর আশা বিমানমন্ত্রীর *** ড. জাফর ইকবাল, মাকসুদ কামালসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে আইসিটিতে অভিযোগপত্র

চ্যানেল ওয়ানের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলের নেপথ্যে কী

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৮:০৮ অপরাহ্ন, ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে চ্যানেল ওয়ানের জ্যেষ্ঠ সম্প্রচার প্রতিবেদক হাবিব রহমানের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলের ঘটনায় শুধু এক সাংবাদিকের সরকারি কর্মকাণ্ড কাভারের সুযোগ হারানোর প্রশ্নই সামনে আসেনি; একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সরকারের সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও।

১ সেপ্টেম্বর তথ্য অধিদপ্তর হাবিব রহমানের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করলেও সংশ্লিষ্ট চিঠিতে এর সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার কথা বলা হলেও কোন অভিযোগ, কোন বিধিভঙ্গ বা কোন আচরণের কারণে এই সিদ্ধান্ত—তা জানানো হয়নি। গত ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হওয়ার পর এই সরকারের আমলে এটিই প্রথম কোনো সংবাদমাধ্যমের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের ঘটনা।

এই অবস্থায় ঘটনাটির নেপথ্যে আসলে কী রয়েছে, সেই প্রশ্নই এখন জোরালো হচ্ছে সাংবাদিক সমাজে। সুখবর ডটকমের অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত এমন কোনো সরকারি নথি পাওয়া যায়নি, যেখানে হাবিব রহমানের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের নির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও প্রেস তথ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলেও এ বিষয়ে তাদের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

চ্যানেল ওয়ান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের আগের কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ পাশাপাশি রাখলে প্রশ্নের পরিধি আরও বড় হয়। বিশেষ করে ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে হাবিব রহমানের করা কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন এবং তার পরপরই প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের একজন কর্মকর্তার তাকে ফোন করার ঘটনা এখন আলোচনায় এসেছে।

হাবিব রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, সংবাদ সম্মেলনের এক-দুই দিন পর ওই কর্মকর্তা তাকে ফোন করেন। তার প্রশ্নগুলো প্রশাসনকে কথিত বিব্রত করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। এমনকি কেন তাকে প্রশ্ন করার জন্য মাইক্রোফোন দেওয়া হয়েছিল, সেটিও জানতে চাওয়া হয়।

হাবিব রহমানের বক্তব্য, তিনি ওই কর্মকর্তাকে পরিষ্কারভাবে জানিয়েছিলেন—প্রশ্ন করার জায়গায় তিনি প্রশ্ন করেছেন। প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা না দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। একজন সাংবাদিকের কাজ প্রশ্ন তোলা; কোনো প্রশ্ন সরকারের জন্য অস্বস্তিকর মনে হলে তার উত্তর দেওয়া বা ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

জানা গেছে, ১৭ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনে হাবিব রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি না থাকা নিয়ে প্রশ্ন করেন। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পদায়নের ক্ষেত্রে সরকারঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা হচ্ছে কি না, জানতে চান। একই সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুরের একটি বনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ওই প্রকল্পের সামঞ্জস্য কীভাবে হচ্ছে, সেটিও জানতে চান।

হাবিব রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, সংবাদ সম্মেলনের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের এক কর্মকর্তা তার প্রশ্নগুলোকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হয়নি বলে জানান এবং প্রশাসনকে বিব্রত করার অভিযোগ তোলেন। এর প্রায় দুই সপ্তাহ পরই ১ সেপ্টেম্বর তার প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলের সিদ্ধান্ত আসে।

অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের মতে, এই সময়ের ব্যবধান ঘটনাটিকে ঘিরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কারণ, একজন সাংবাদিক সরকারের সংবাদ সম্মেলনে সমালোচনামূলক প্রশ্ন করার পর তার বিরুদ্ধে কোনো প্রকাশ্য অভিযোগ ছাড়াই অল্প সময়ের মধ্যে সরকারি অ্যাক্রেডিটেশন হারালেন—এমন ঘটনাকে সাংবাদিক সমাজ স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। প্রশ্ন হলো, কার্ড বাতিলে যদি অন্য কোনো কারণ থেকে থাকে, সেটি লিখিতভাবে জানানো হচ্ছে না কেন?

চ্যানেল ওয়ানের প্রধান সম্পাদক নাজমুল আশরাফ বলছেন, হাবিব রহমানই তাদের একমাত্র সাংবাদিক, যিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রম নিয়মিত কাভার করেন। তার অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংবাদ সংগ্রহে প্রতিষ্ঠানটি সমস্যায় পড়েছে।

নাজমুল আশরাফের বক্তব্য, কোনো সাংবাদিক অ্যাক্রেডিটেশনের শর্ত লঙ্ঘন করলে সাধারণত তাকে সতর্ক করা, সাময়িকভাবে কার্ড স্থগিত করা অথবা কারণ জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু হাবিব রহমানের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, সেটি তাদের জানানো হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কাছে সিদ্ধান্তের ভিত্তি এখনো অস্পষ্ট।

চ্যানেল ওয়ানের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের আগে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও আলোচনায় আসে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নিয়ে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

গত ১৭ জুলাই সন্ধ্যা ৭টার বুলেটিনে চ্যানেল ওয়ান ‘নীতি-নৈতিকতা ভেঙে সরকারের সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর ব্যবসা; তিনটি মন্ত্রণালয়ে ঠিকাদারি’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচার করে। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর মীর শাহে আলম ও তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রায় ৪০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে নিজের মন্ত্রণালয়ের কাজও রয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট আইনবিদ ও অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্যও প্রচার করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে সরকারি পদে থাকা এক ব্যক্তির সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত এবং সরকারি পদ ব্যবহারের প্রশ্ন তোলা হয়। ১৮ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির প্রচারিত আরেকটি প্রতিবেদনে মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়।

এরপর চ্যানেল ওয়ান মীর শাহে আলমের স্বজনপ্রীতি এবং সরকারি কাজে তার পরিবারের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আরও প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর মধ্যে একটি প্রতিবেদনে স্থগিত একটি প্রকল্পের পরিচালককে পুনর্বহাল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ওই কর্মকর্তাকে পুনর্বহালের ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করা হয়েছে কি না, সেটিই ছিল প্রতিবেদনের অন্যতম বিষয়।

চ্যানেল ওয়ানের অভিযোগ, মীর শাহে আলমকে নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক তৎপরতা শুরু হয়। ভুয়া কপিরাইট দাবি দিয়ে ভিডিও ও ছবি সরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে অসংখ্য অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো এবং ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশের চেষ্টার ঘটনাও ঘটে। প্রতিষ্ঠানটি এসব ঘটনাকে ধারাবাহিক চাপ হিসেবে দেখছে।

ফলে চ্যানেল ওয়ানের কারো কারো মধ্যে এমন সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, মীর শাহে আলমকে নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং পরে প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হাবিব রহমানের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের মধ্যে কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সন্দেহ করা হচ্ছে, অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের নেপথ্যে সরকারের মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী কোনো সদস্যের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে সুখবর ডটকম এসব বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সন্দেহ পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার মতো কোনো ব্যাখ্যাও এখন পর্যন্ত সরকারি পর্যায় থেকে দেওয়া হয়নি। কারণ, অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের চিঠিতে নির্দিষ্ট কারণ না থাকায় সিদ্ধান্তটির সঙ্গে আগের ঘটনাগুলোর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা যাচাই করার সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি লিখিতভাবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি প্রকাশ করে, তাহলে এই সন্দেহের সত্যতা যাচাইয়ের পথও সহজ হবে।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, হাবিব রহমানের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের বিষয়টি তিনি ব্যক্তিগতভাবে খতিয়ে দেখবেন।

সরকারকে প্রশ্ন করার কারণে কার্ড বাতিল হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধু প্রশ্ন করার কারণে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না। তার বক্তব্য, সাংবাদিকেরা প্রতিদিন সরকারকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন এবং সরকারের সমালোচনাও করছেন।

তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, হাবিব রহমানের কার্ড কেন বাতিল করা হয়েছে, সেটি তিনি খতিয়ে দেখবেন। অর্থাৎ ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিষয়টির নির্দিষ্ট কারণ তার কাছেও স্পষ্ট ছিল না—এমন একটি ধারণা তার বক্তব্য থেকে পাওয়া যায়।

জাহেদ উর রহমান আরও বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রেও সরকার সহনশীলতা দেখাচ্ছে। ছয় মাসের একটি হিসাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৪৬৪টি বড় ধরনের অপতথ্যের মধ্যে ১৫৭টির লক্ষ্যবস্তু ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এই পরিসংখ্যানের বিস্তারিত উৎস ও পদ্ধতি তিনি ওই বক্তব্যে প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করেননি।

চ্যানেল ওয়ানের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও গণমাধ্যম বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, কোনো কারণ না জানিয়ে অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের জন্য উদ্বেগজনক।

তার বক্তব্য, কোনো প্রতিবেদনের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের মতপার্থক্য থাকলে প্রচলিত আইন ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার প্রতিকার করা উচিত। প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সাংবাদিকের সরকারি কর্মকাণ্ড কাভারের সুযোগ সীমিত করা হলে সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এ ঘটনায় নেত্র নিউজের সম্পাদক ও প্রবাসী সাংবাদিক তাসনিম খলিলও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে আগের সরকারের সময়ের ঘটনাগুলোর সঙ্গে বর্তমান ঘটনার তুলনা করেছেন। একই সঙ্গে তারেক রহমানের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান ঘটনার সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

চ্যানেল ওয়ানের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকারের আমলেই প্রতিষ্ঠানটি পুনর্যাত্রা করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চ্যানেল ওয়ানের সম্প্রচার বন্ধ ছিল। নতুন করে সম্প্রচারে ফেরার পর প্রতিষ্ঠানটি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করে।

এর মধ্যে মীর শাহে আলমকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। চ্যানেল ওয়ানের দাবি, এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ধারাবাহিক আক্রমণ শুরু হয়। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের এক সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের ঘটনা ঘটে। এ কারণে চ্যানেল ওয়ানের ভেতরে সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, দুই ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে।

কারো কারো মতে, অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের চিঠিতে যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ উল্লেখ না থাকে, তাহলে সিদ্ধান্তটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষ করে সাংবাদিকের সরকারি কার্যক্রম কাভারের জন্য ওই কার্ডের প্রয়োজন থাকলে সিদ্ধান্তটির প্রভাব শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের কাজও এতে প্রভাবিত হতে পারে। সরকারি সংবাদ সম্মেলন, বৈঠক ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রবেশের সুযোগ সীমিত হলে সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বাস্তব সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তথ্যমতে, দেশে প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তিন দফায় মোট ১৬৭ সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করেছিল। ২৯ অক্টোবর ২০ জন, ৩ নভেম্বর ২৯ জন এবং ৭ নভেম্বর আরও ১১৮ জনের কার্ড বাতিল করা হয়।

তখন বাতিলের নোটিশে ২০২২ সালের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালার কয়েকটি ধারার উল্লেখ করা হলেও সাংবাদিকভেদে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা কারণ প্রকাশ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সম্পাদকদের সংগঠনসহ দেশি-বিদেশি সাংবাদিক অধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অ্যাক্রেডিটেশন না থাকলেও সাংবাদিকেরা সংবাদ প্রকাশ করতে পারেন। তবে সরকারি মন্ত্রণালয় বা দপ্তরে প্রবেশের ক্ষেত্রে তাদের বড় ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়। ফলে সরকারি সংবাদ সম্মেলন, বৈঠক ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড কাভারে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।

পরবর্তী সময়ে নতুন অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালায় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের সুযোগ এবং সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্ব থাকা একটি কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

সাংবাদিক সমাজের একটি অংশের প্রত্যাশা ছিল, বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক সরকারের সময়ে আগের সরকারের আমলে বাতিল হওয়া ১৬৭ সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন নিয়ে পুনর্বিবেচনা হবে। সেই প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের সময় আবার একজন সক্রিয় সাংবাদিকের কার্ড বাতিলের ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

জানা গেছে, ক্ষমতায় আসার আগে বিএনপি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে একাধিক অঙ্গীকার করেছিল। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে এবং সংবাদমাধ্যমকে সরকারের সমালোচনা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সুযোগ দেওয়া হবে। তার বক্তব্যে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলা হয়, যেখানে প্রধানমন্ত্রীসহ কেউ জবাবদিহির বাইরে থাকবেন না।

এর এক বছর পর, ২৪ নভেম্বর ২০২৫, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেন, তাদের ৩১ দফায় স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার রয়েছে। তিনি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন এবং স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

এই অঙ্গীকারের আলোকে বর্তমান ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—হাবিব রহমানের অ্যাক্রেডিটেশন ঠিক কোন কারণে বাতিল করা হয়েছে এবং সেই কারণটি কেন লিখিতভাবে জানানো হয়নি। যদি তার বিরুদ্ধে অ্যাক্রেডিটেশনের শর্ত ভঙ্গ, অসদাচরণ, পেশাগত অনিয়ম বা অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে সেটি প্রকাশ করা হলে সিদ্ধান্তের ভিত্তি স্পষ্ট হবে। আর যদি এমন কোনো অভিযোগ না থাকে, তাহলে কার্ড বাতিলের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে, কার সুপারিশে নেওয়া হয়েছে এবং কোন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তা অনুমোদিত হয়েছে—সেসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।

বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার কথা যখন সরকারি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তখন সেই নির্দেশনার উৎস ও ভিত্তি নিয়েও স্বচ্ছতা জরুরি হয়ে পড়েছে। সিদ্ধান্তটি কোনো কর্মকর্তার প্রশাসনিক সুপারিশে হয়েছে, নাকি সরকারের কোনো রাজনৈতিক বা মন্ত্রিসভা-সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের হস্তক্ষেপ ছিল—এমন প্রশ্ন এখন আলোচনায়।

অনেকের মতে, ঘটনাটি এখন শুধু হাবিব রহমান বা চ্যানেল ওয়ানের বিষয় নয়। সরকারি কর্মকাণ্ড কাভার করা সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা, সংবাদ সম্মেলনে কঠিন প্রশ্ন করার পরিবেশ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহির প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সাংবাদিক সমাজের উদ্বেগের জায়গাটিও এখানেই। একটি অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলের সিদ্ধান্ত যদি স্পষ্ট অভিযোগ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ছাড়া নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সিদ্ধান্তের নজির তৈরি হবে কি না—সেটিও আলোচনায় আসবে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন। ফলে এখন নজর থাকবে তার তদন্ত বা পর্যালোচনার ফলের দিকে। যদি হাবিব রহমানের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ থেকে থাকে, সেটি প্রকাশ করা হলে বিতর্কের একটি বড় অংশের অবসান হতে পারে। অভিযোগের ভিত্তি, প্রমাণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রকাশ করা হলে বিষয়টি নিয়ে তৈরি হওয়া নানা সন্দেহেরও যাচাই সম্ভব হবে।

আর যদি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকে, তাহলে কার্ড বাতিলের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে, কারা এতে যুক্ত ছিলেন এবং কেন একজন সক্রিয় সাংবাদিককে সরকারি কর্মকাণ্ড কাভারের সুযোগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো—সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে।

হাবিব রহমানের নিজের প্রশ্নটিও তাই এখনো অনিষ্পন্ন। কেন তাকে সরকারি সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ থেকে বাদ দেওয়া হলো—এই প্রশ্নের উত্তর তিনি চান। তার বক্তব্য, তিনি সাংবাদিক হিসেবে প্রশ্ন করেছেন। তার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধ বা বিধিভঙ্গের অভিযোগ থাকলে সেটি তাকে জানানো উচিত।

অভিজ্ঞ সাংবাদিকেরা বলছেন, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করাও জবাবদিহির অংশ। শেষ পর্যন্ত তাই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকছে একটি সরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—হাবিব রহমানের অ্যাক্রেডিটেশন কেন বাতিল করা হলো? এই প্রশ্নের স্বচ্ছ, লিখিত ও যাচাইযোগ্য উত্তর না আসা পর্যন্ত চ্যানেল ওয়ানের সন্দেহ, সাংবাদিক সমাজের উদ্বেগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে।

সাংবাদিক চ্যানেল ওয়ান অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250