ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনার সামনে নতুন করে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইয়েমেনের যুদ্ধ। একদিকে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, অন্যদিকে আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে জটিল নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে রিয়াদ। যে সংঘাতকে সীমান্তের বাইরে রেখে পর্যটন, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন যুবরাজ, সেই সংঘাতই এখন তার পরিকল্পনার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌদি আরবের একাধিক কৌশলগত ভুল হিসাব দেশটিকে নতুন করে ইয়েমেনের সংঘাতে টেনে এনেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক অংশীদারত্বে ভাঙন, ইয়েমেনের হুতিবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা—এই তিনটি বিষয় সংকটকে আরও গভীর করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ। আঞ্চলিক এই সংঘাতের মধ্যে ইরানের ঘনিষ্ঠ হুতিরা সৌদি ভূখণ্ডে হামলা জোরদার করায় ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আর দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকটে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো, বিমান চলাচল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপরও।
সৌদি আরবের এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। গত বছরের শেষ দিকে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর জন্য পাঠানো সামরিক যানবাহনের একটি চালানে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব কমাতে পাশাপাশি কাজ করা দেশ দুটির মধ্যে এরপর কৌশলগত দূরত্ব বাড়ে। সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করে নিলে ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় হুতিবিরোধী যোদ্ধাদের নেতৃত্ব ও সমন্বয় নিয়ে নতুন সমস্যা দেখা দেয়।
সিএনএনের প্রতিবেদনে দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, আমিরাতের সেনারা চলে যাওয়ার পর দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আমিরাতের বাহিনীর কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল কার্যকর; সৌদি আরব সেই সক্ষমতার বিকল্প তৈরি করতে পারেনি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আমিরাতের নেতৃত্বে কাজ করা হাজারো যোদ্ধা নতুন পরিস্থিতিতে দিশাহারা হয়ে পড়েন।
এখানে সৌদি আরবের কৌশলগত সমস্যাটি শুধু একজন মিত্রকে হারানো নয়; বরং সেই মিত্রের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় সামরিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীলতা কতটা গভীর ছিল, তা সামনে চলে আসে। কোনো বাহিনীকে সমর্থন দেওয়া আর সেই বাহিনীকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করার মতো রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। আমিরাতের প্রস্থানের পর সেই ব্যবধানই সৌদি কৌশলের দুর্বলতা হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে।
তবে ইয়েমেনের সংকটের পেছনে শুধু সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্ব দায়ী নয়। দেশটির গৃহযুদ্ধ বহু বছর ধরে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ইরান-সমর্থিত হুতিরা রাজধানী সানাসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের সমস্যা। ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে স্থিতিশীল প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করাও সৌদি-সমর্থিত পক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাহিনী প্রত্যাহারের প্রায় আট সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এতে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়ে। সৌদি আরবকে একই সময়ে দক্ষিণ সীমান্তে হুতিদের তৎপরতা এবং পূর্ব দিক থেকে ইরানকেন্দ্রিক নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের চার বছরের যুদ্ধবিরতি আগে থেকেই নড়বড়ে ছিল। গত জুলাইয়ে ইরান হুতিদের একটি প্রতিনিধিদলকে তেহরানে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাণিজ্যিক বিমান পাঠায়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় যোগ দিতে প্রতিনিধিদলটির যাওয়ার কথা ছিল। সৌদি আরবের ইয়েমেন-সংক্রান্ত বিমান অবরোধ অমান্য করে বিমানটি পাঠানো হয়েছিল বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিমানটির অবতরণ ঠেকাতে সৌদি বাহিনী সানার বিমানবন্দরে হামলা চালায়। এর পর হুতিরা যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দেয় এবং সৌদি জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে।
এরপর ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও লোহিত সাগরসংলগ্ন কৌশলগত এলাকাগুলোতে হুতিদের অগ্রযাত্রা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিশেষ করে বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও উদ্বেগ তৈরি করে। লোহিত সাগর ও এ প্রণালি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। সেখানে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে শুধু সৌদি আরব নয়, আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানায়, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশের উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখলে অভিযান চালায়। ইয়েমেন সরকারের দাবি অনুযায়ী, তারা হুতিদের কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পুনরুদ্ধার করে। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হুতিরা সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাবিগে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি শোধনাগার, আবহা বিমানবন্দর এবং সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলার দাবি করে।
এ ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয়, ইয়েমেনের ভূখণ্ডে সামরিক অগ্রগতি অর্জন করলেও সৌদি আরবের জন্য নিজ ভূখণ্ডকে নিরাপদ রাখা সহজ হচ্ছে না। হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করছে। আর সৌদি বাহিনীর বিমান হামলা সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি সিএনএনকে বলেন, সৌদি আরব একাধিক ভুল ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তার মতে, হুতিদের নতুন আক্রমণের জন্য রিয়াদ প্রস্তুত ছিল না এবং স্থানীয় মিত্র ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত সমন্বয়ও ছিল না। হুতিদের হাতে উন্নত অস্ত্র থাকার কারণে সৌদি শহরগুলো এখন আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সৌদি আরবের আরেকটি বড় ভুল হিসাব ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সংকটের সময় সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে পারছে না রিয়াদ। সিএনএনের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার ফোনে কথা বলে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর অনুরোধ জানান। কিন্তু ট্রাম্প তাতে সম্মত হননি। এর পরিবর্তে ওয়াশিংটন ওমানে হুতিদের সঙ্গে আলোচনা করে নিজেদের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
এখানে সৌদি আরবের নিরাপত্তা কৌশলের একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য, সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে সৌদি আরব তার নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বদলে গেলে সেই নির্ভরতা কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি সিএনএনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্বকে কেন্দ্র করেই সৌদি সামরিক বাহিনীর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে। নিজেদের শক্তিতে এককভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করা তাদের সামরিক কাঠামোর প্রচলিত পরিকল্পনার অংশ ছিল না। তার মতে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রকে সহায়তা করার জন্য একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করত। এখন সেই প্রক্রিয়ার বদলে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
সৌদি আরব অবশ্য কেবল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে নেই। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে যুবরাজের বৈঠক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় বাড়ানোর উদ্যোগ তারই ইঙ্গিত। ফ্রান্সের সামরিক সহায়তা এবং যুক্তরাজ্যের জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনাও রিয়াদের বিকল্প সহযোগিতা খোঁজার অংশ। পাশাপাশি সৌদি আরবে মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করছেন বলে সিএনএন জানিয়েছে।
গত ৫ অক্টোবর সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরু করে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইয়েমেনের ভোর’। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রার কথা বলা হয়েছে। তবে স্থলভাগে কিছু এলাকা পুনর্দখল করা আর হুতিদের দীর্ঘমেয়াদে পরাজিত করা এক বিষয় নয়। হুতিদের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, সামরিক অভিযানের ফলাফল দ্রুত সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। যুবরাজের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার লক্ষ্য তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন, বিনোদন, খেলাধুলা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিকে বহুমুখী করা। কিন্তু আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে বিমান চলাচল বিঘ্নিত হলে, জ্বালানি অবকাঠামো আক্রান্ত হলে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। সিএনএনের বিশ্লেষণে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সম্মেলন এবং দেশটির বিনোদন আয়োজনের ওপর সংঘাতের চাপের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের সামনে শুধু সামরিক সমস্যা নয়, ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। হুতিবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্য, স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং কমান্ডব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা না গেলে সামরিক সাফল্য স্থায়ী হবে না। ইউরোপীয় ইনস্টিটিউট অব পিসের ইয়েমেন-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসি সিএনএনকে বলেন, জোটের বিভিন্ন অংশের কমান্ডব্যবস্থা একীভূত করতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান করতে হবে। হুতিদের কাছ থেকে পুনর্দখল করা এলাকায় সৌদি-সমর্থিত সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সামরিক বিজয়ের মূল্যও সীমিত থাকবে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরবের বর্তমান সংকটকে কেবল হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, স্থানীয় মিত্রদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত ভূমিকা—সবকিছু মিলেই রিয়াদকে নতুন করে ইয়েমেনের সংঘাতে ঠেলে দিয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে সৌদি আরবের নিজস্ব কৌশলগত সীমাবদ্ধতা: দেশটি একদিকে আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়িয়ে অর্থনৈতিক রূপান্তর এগিয়ে নিতে চায়।
সমস্যা হলো, এই দুটি লক্ষ্য সব সময় একই পথে চলে না। হুতিদের সামরিকভাবে দুর্বল করতে সৌদি আরব অভিযান বাড়ালে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আবার কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করলে হুতিদের হাতে থাকা ভূখণ্ড ও সামরিক সক্ষমতা মেনে নেওয়ার প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত অব্যাহত থাকলে হুতিদের ওপর তেহরানের প্রভাব এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগও সহজে কমবে না।
সুতরাং, সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে দেশটির সীমান্ত, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বারবার একই সংঘাতের কাছে জিম্মি না হয়ে পড়ে। সামরিক শক্তি দিয়ে সাময়িক অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হলেও, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাধান ছাড়া স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা সীমিতই থাকবে।
খবরটি শেয়ার করুন