ছবি: সংগৃহীত
ভারত খুব ঘন ঘন এমন সিদ্ধান্ত নেয় না। বিদেশে নিযুক্ত কোনো হাইকমিশনার, রাষ্ট্রদূতকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পূর্ণমন্ত্রীর সমমর্যাদা দেওয়া দেশটির কূটনৈতিক প্রথায় বিরল ঘটনা। তাই বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে এই মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু প্রটোকলের বিষয় নয়, বরং এর মধ্যে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তাও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ গত ২৪ জুন জারি করা এক অফিস স্মারকে জানায়, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে ব্যক্তিগত বিবেচনায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পূর্ণমন্ত্রীর সমমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তবে এ মর্যাদা কেবল রাষ্ট্রীয় ও আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে ‘টেবিল অব প্রিসিডেন্স’ অনুযায়ী প্রটোকল সুবিধার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এর ফলে ভারতের স্থায়ী টেবিল অব প্রিসিডেন্সে কোনো পরিবর্তন হবে না।
ভারতের ‘টেবিল অব প্রিসিডেন্স’ হলো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কে কোথায় বসবেন, কার অগ্রাধিকার কত হবে এবং কোন পর্যায়ের প্রটোকল পাবেন—তার সরকারি তালিকা। এই তালিকায় কাউকে সাময়িকভাবে মন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া মানে তিনি সরকারি অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সমপর্যায়ের প্রটোকল পাবেন। তবে এতে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা বা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পায় না।
এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরদিন, গতকাল বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দীনেশ ত্রিবেদী বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই দিনে ভারতীয় ভিসা কার্যক্রমও পরিদর্শন করেন তিনি।
ভারতীয় মূলধারার সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ইকোনমিক টাইমস এবং বার্তা সংস্থা পিটিআই এ সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির ‘বিশেষ গুরুত্বের’ প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক গুরুত্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়। পরে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লেও পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি। এমন বাস্তবতায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবার প্রচলিত কূটনৈতিক রীতি ভেঙে একজন পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় পাঠায়। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু এ নিয়োগই নয়, তার সঙ্গে মন্ত্রীর সমমর্যাদা যুক্ত করাও একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা।
দীনেশ ত্রিবেদীর রাজনৈতিক জীবনও কম বর্ণাঢ্য নয়। কংগ্রেস দিয়ে রাজনীতি শুরু করলেও পরে জনতা দল, তৃণমূল কংগ্রেস হয়ে বর্তমানে তিনি বিজেপির নেতা। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে মনমোহন সিং সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এবং পরে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। দিল্লির নীতিনির্ধারণী মহলেও তিনি পরিচিত মুখ।
ভারতের কূটনৈতিক ইতিহাসে অবশ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে। সাবেক কূটনীতিক নন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এল. এম. সিংভি যুক্তরাজ্যে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দর কুমার গুজরাল সোভিয়েত ইউনিয়নে দায়িত্ব পালনকালে ক্যাবিনেট মর্যাদা পেয়েছিলেন। ফলে ত্রিবেদীর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ নজিরবিহীন নয়, তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কূটনীতিতে প্রতীকী বার্তার গুরুত্ব অনেক। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো রাষ্ট্র যখন তার গুরুত্বপূর্ণ কোনো দেশে রাজনৈতিক ওজনসম্পন্ন ব্যক্তিকে পাঠায়, তখন সেটি মূলত জানিয়ে দেয়—সেই সম্পর্ককে তারা শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে।
ভারতীয় দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন শুধু আমলাতান্ত্রিক যোগাযোগ দিয়ে পরিচালনা করার পর্যায়ে নেই। সম্পর্কের জটিলতা সামাল দিতে রাজনৈতিক প্রভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধির প্রয়োজন রয়েছে। সেই কারণেই দীনেশ ত্রিবেদীর মতো ব্যক্তিকে পাঠানো হয়েছে।
এশিয়া টাইমস-এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে অভিজ্ঞ রাজনীতিককে পাঠানোর অর্থ হলো ভারত রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি দূর করতে চাইছে। কারণ রাজনৈতিক সংকটের সমাধানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অনেক সময় প্রচলিত কূটনৈতিক কাঠামোর চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেছেন, এটি মূলত রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত। তবে এটিকে অতিরঞ্জিত করারও সুযোগ নেই। কারণ মন্ত্রীর সমমর্যাদা মানে তিনি অতিরিক্ত নির্বাহী ক্ষমতা পাচ্ছেন—এমন নয়। বরং দিল্লির সঙ্গে তার যোগাযোগের পথ তুলনামূলক সহজ হবে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত রাজনৈতিক পর্যায়ে বিষয় উত্থাপনের সুযোগ থাকবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বড় চ্যালেঞ্জগুলো রাজনৈতিক। সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা কিংবা আঞ্চলিক সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক আস্থার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাজনৈতিক ওজনসম্পন্ন দূতের মাধ্যমে নয়াদিল্লি সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে বলেই মনে হয়।
অবশ্য এ মর্যাদা বাংলাদেশের জন্য কোনো সরাসরি আইনি বা অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করবে না। ভারতের অফিস স্মারকেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এটি শুধু প্রটোকলসংক্রান্ত। অর্থাৎ ত্রিবেদী বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন কোনো চুক্তি করতে পারবেন, এমন নয়। তার ক্ষমতা ভারতের সংবিধান বা পররাষ্ট্রনীতির নির্ধারিত সীমার মধ্যেই থাকবে।
তবে বাস্তব কূটনীতিতে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার গুরুত্ব কম নয়। একজন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর সরাসরি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তুলনামূলক বেশি থাকবে। এতে কোনো অচলাবস্থা তৈরি হলে তা দ্রুত রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনায় আনার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহল মনে করছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও একই মূল্যায়ন করেছে। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড লিখেছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত স্পষ্টভাবে বোঝাতে চাইছে যে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনে দিল্লি রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দীনেশ ত্রিবেদীর ব্যক্তিগত পরিচয়। তিনি বাংলা বলতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন এবং দুই বাংলার সংস্কৃতি সম্পর্কে তার ভালো ধারণা রয়েছে। সীমান্ত-সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় মোদি সরকার।
তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের প্রকৃত পরীক্ষা হবে বাস্তব ইস্যুগুলোতে। তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, বাণিজ্য বৈষম্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, সংযোগ প্রকল্প, ভিসা সহজীকরণ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোতে অগ্রগতি না হলে কেবল প্রতীকী সিদ্ধান্তে সম্পর্কের বড় পরিবর্তন আসবে না।
সব মিলিয়ে দীনেশ ত্রিবেদীকে মন্ত্রীর সমমর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য প্রতীকী ও রাজনৈতিক। এটি ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা—ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে তারা আবারও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের পর্যায়ে দেখতে চায়। একই সঙ্গে এমন একজন প্রতিনিধিকে সামনে আনা হয়েছে, যিনি শুধু কূটনীতিক নন, বরং দিল্লির রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত। এখন এই রাজনৈতিক বার্তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে থাকবে।
খবরটি শেয়ার করুন