ছবি: সংগৃহীত
দেশে হামের সংক্রমণ ও উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু একটি রোগের বিস্তার নয়, বরং জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখা দিচ্ছে। কয়েক বছর আগেও প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে আসা এই রোগের এমন পুনরুত্থান স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক ও অভিভাবক—সবার জন্যই গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কাভারেজে ফাঁক, সরবরাহব্যবস্থার সংকট, প্রচার-প্রচারণার ঘাটতি এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রস্তুত অবস্থাই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
হামের বিস্তার ঠেকাতে সরকার ৫ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করেছে, যা চলবে ২০ মে পর্যন্ত। এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৯১৪ জন শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তারা ইতিমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ শতাংশ অর্জন করেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সেই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
টিকাদান পরিস্থিতি দ্রুত যাচাই পদ্ধতি বা আরসিএমের তথ্য বিশ্লেষণ করে ইউনিসেফ জানিয়েছে, এখনো শহরাঞ্চলে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রামীণ এলাকায় প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, বিশেষত নিম্নআয়ের পরিবার, বস্তিবাসী ও ফুটপাতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর শিশুদের বড় একটি অংশ এখনো টিকা পায়নি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত না করতে পারলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হবে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা অপরিহার্য। কারণ, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ; অল্পসংখ্যক শিশুও টিকার বাইরে থাকলে তা দ্রুত নতুন সংক্রমণের উৎস হয়ে উঠতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ সম্প্রতি বলেছেন, টিকা কার্যক্রমে প্রচার-প্রচারণার ঘাটতি এখনো স্পষ্ট। তার মতে, শুধু টিকা সরবরাহ করলেই হবে না, মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকা নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়েছে। এতে কিছু অভিভাবকের মধ্যে ভয় ও সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ৯ মাসের পরিবর্তে ৬ মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক মায়ের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, বৈজ্ঞানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হলেও সেটি মানুষের কাছে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। ফলে বিভ্রান্তি দূর না হয়ে বরং অনাস্থা বেড়েছে।
স্বাস্থ্য যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা যথেষ্ট নয়; দরকার কার্যকর সামাজিক সম্পৃক্ততা। শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং এনজিওগুলোকে যুক্ত করে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে টিকার বাইরে থাকা শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে, হামের চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামনে চলে এসেছে। রাজধানীর বাইরে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে আইসিইউ, অক্সিজেন সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে অনেক পরিবার আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে ঢাকামুখী হচ্ছে। এতে সময় নষ্ট হচ্ছে, বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি। শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম সাধারণত প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও অপুষ্টি, নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতা যুক্ত হলে তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া এবং বিশেষায়িত সেবার অভাব পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
সরকার ইতিমধ্যে টিকার সংকট এবং শিশুমৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে। কেন এত শিশুর মৃত্যু হলো, কোথায় ঘাটতি ছিল, কোনো ধরনের প্রশাসনিক গাফিলতি ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দায় নির্ধারণ করলেই চলবে না; ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি যাতে না তৈরি হয়, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিও জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে টিকা সরবরাহব্যবস্থায় যে বিঘ্ন তৈরি হয়েছিল, তা দেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে দুর্বল করে দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে সরকার দ্রুত টিকা সংগ্রহ করে জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু করতে পেরেছে—এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু পরিকল্পনা, মাঠপর্যায়ের সমন্বয় এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণের মধ্যে যে অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে, সেটিও উদ্বেগের বিষয়। মৃত্যুর সংখ্যা বা টিকাদান কাভারেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনস্বাস্থ্য সংকটে তথ্যের স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক তথ্য গোপন বা বিলম্বে প্রকাশ করলে পরিস্থিতি মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো, টিকাদান কর্মসূচি এখনো অনেক ক্ষেত্রে শহরকেন্দ্রিক ও স্থির কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ভাসমান জনগোষ্ঠী, শ্রমজীবী পরিবার বা দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে ভ্রাম্যমাণ টিম, বাড়ি বাড়ি প্রচারণা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে। না হলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশুরাই সেবার বাইরে থেকে যাবে।
হামের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশকে নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে যে জনস্বাস্থ্য খাতের সাফল্য খুব সহজেই ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারে। একটি টিকা-নির্ভর রোগের পুনরুত্থান দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু অর্জনের হিসাব নয়, সেই অর্জন ধরে রাখার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দেশের প্রতিটি শিশুকে দ্রুত টিকার আওতায় আনা, চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো এবং মানুষের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন করা।
কারণ, একটি শিশুর মৃত্যুও কেবল একটি পরিবারের শোক নয়; সেটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতারও পরীক্ষা।
খবরটি শেয়ার করুন