সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন *** শিল্পকলা একাডেমির সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, পল্লবীতে বাসে আগুন *** ন্যাম ভবন থেকে সাতক্ষীরার এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার *** সমালোচনার মুখে হাফেজদের উপহার দেওয়া সেই বই ফেরত নিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী *** অপ্রতিমের মা ড. নাহিদার চব্বিশের সেই ফেসবুক পোস্ট কেন আলোচনায়, কী লিখেছিলেন তিনি *** পাকিস্তান কি সৌদি আরবকে রক্ষা করতে যুদ্ধে জড়াবে

সাপের কামড় খেয়ে নিজেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ‘বিষঝাড়া ওঝা’

শুভ্র বড়ুয়া

🕒 প্রকাশ: ০১:৫০ পূর্বাহ্ন, ১৯শে জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় গোখরা সাপ ধরতে গিয়ে সাপের কামড়ে আহত হয়েছেন নিজেকে ‘সাপুড়ে’ ও ‘বিষঝাড়া ওঝা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া ইমরান হোসেন (৩৮)। বর্তমানে তিনি কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সময়মতো হাসপাতালে এনে অ্যান্টিভেনম দেওয়ায় তিনি এখন আশঙ্কামুক্ত।

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে তার ভিজিটিং কার্ডে সাপের বিষ ঝাড়াসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসার দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (১৭ জুলাই) রাত ১০টার দিকে ভেড়ামারা উপজেলার গোলাপনগর ইউনিয়নের বাগগাড়ি পাড়া এলাকায় আমিরুল ইসলামের বাড়িতে সাপ উদ্ধারের জন্য যান ইমরান হোসেন। বাড়ির উঠানে একটি গর্তে গোখরা সাপ রয়েছে—এমন খবর পেয়ে তিনি সেখানে পৌঁছান।

ইমরানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে গর্ত থেকে তিনটি সাপের বাচ্চা উদ্ধার করেন তিনি। পরে একটি বড় গোখরা সাপ টেনে বের করে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাপটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রায় দেড় মিনিটের মধ্যেই অসাবধানতাবশত সেটি তার হাঁটুর ওপরে ছোবল দেয়। সাপের কামড়ের পর স্থানীয় দুই যুবক দ্রুত তাকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইমরান হোসেন বলেন, আগের দিন একই বাড়ির একমাত্র ছেলে সম্রাট সাপের কামড়ে মারা যান। সেই ঘটনার পর বাড়ির লোকজন আতঙ্কে ছিলেন। শুক্রবার আবার সাপ দেখা গেলে তাকে খবর দেওয়া হয়। তিনি সাপ ধরতে গিয়ে নিজেই দুর্ঘটনার শিকার হন।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ইকবাল হাসান বলেন, হাসপাতালে আনার পর ইমরানকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা হয়। এরপর তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং তিনি আশঙ্কামুক্ত। তাকে ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে।

চিকিৎসক ইকবাল হাসান বলেন, বর্ষাকালে সাপে কাটার ঘটনা বাড়ে। এ ধরনের ঘটনায় সময় নষ্ট না করে যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে। ওঝা, ঝাড়ফুঁক বা বিলম্বিত চিকিৎসার কারণে অনেক সময় রোগীর অবস্থা জটিল হয়ে পড়ে।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইমরান হোসেনের একটি ভিজিটিং কার্ড ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তিনি নিজেকে সাপুড়িয়া হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাপ ধরা, সাপের বিষ ঝাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন জটিল ও গোপন রোগের চিকিৎসার দাবিও করেছেন। এই কার্ডটি ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, যিনি নিজেই সাপের বিষ ঝাড়ার দাবি করেন, তিনি কেন সাপের কামড়ের পর সরাসরি হাসপাতালে গিয়ে অ্যান্টিভেনম নিলেন? আবার অনেকে বলছেন, এই ঘটনাই প্রমাণ করে সাপের কামড়ের একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য দেখা গেছে। ফেসবুক ব্যবহারকারী রাকিবুল ইসলাম লিখেছেন, “ঘটনাটি মানুষকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। সাপের কামড়ের পর ওঝার কাছে নয়, হাসপাতালে যেতে হবে।”

আরেক ব্যবহারকারী সাবিহা রহমান মন্তব্য করেন, “যদি বিষ ঝাড়ার মাধ্যমেই চিকিৎসা সম্ভব হতো, তাহলে তিনিও হাসপাতালে যেতেন না। তার সুস্থতা কামনা করি, তবে মানুষ যেন বিভ্রান্ত না হয়।”

মাহবুব আলম নামে একজন লিখেছেন, “সাপ ধরা একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। প্রশিক্ষণ ছাড়া এটি করা উচিত নয়। একই সঙ্গে মানুষকে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর আস্থা রাখতে হবে।”

তবে সবাই সমালোচনামুখর ছিলেন না। নাসির উদ্দিন নামে একজন মন্তব্য করেন, “ইমরান দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকা থেকে সাপ উদ্ধার করেন। দুর্ঘটনা যে কারও সঙ্গেই ঘটতে পারে। তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।”

আবার তানজিনা আক্তার নামে একজন লেখেন, “একদিকে বিষ ঝাড়ার দাবি, অন্যদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা—দুই অবস্থান একসঙ্গে গ্রহণ করলে মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে। এ ধরনের দাবি প্রচারে আরও সতর্কতা প্রয়োজন।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন। তাদের একটি বড় অংশ প্রথমে ঝাড়ফুঁক, ওঝা বা লোকজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করায় হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হয়। এতে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখা, অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া কমানো এবং দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

ভেড়ামারার এই ঘটনাটিও সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। নিজেকে বিষঝাড়া ওঝা হিসেবে পরিচয় দেওয়া একজন সাপুড়েও শেষ পর্যন্ত আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করেছেন। চিকিৎসকদের মতে, সঠিক সময়ে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ এবং পর্যবেক্ষণের কারণেই তার জীবন ঝুঁকিমুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি সাধারণ মানুষের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে—সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে কুসংস্কার নয়, দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়াই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়।

বিষঝাড়া ওঝা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250