শায়লা শবনম
দেশের রাজনীতি বরাবরই সংঘাত, উত্তেজনা ও তীব্র মতপার্থক্যের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভাষার যে অবক্ষয় সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমান হয়েছে, তা অতীতের বহু রাজনৈতিক সংকটকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জনসভা, মিছিল কিংবা টেলিভিশনের আলোচনায় অশালীন, অশ্রাব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, তা এখন শুধু রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই নয়, সামগ্রিক সামাজিক মূল্যবোধকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
রাজনীতি মূলত মতাদর্শের লড়াই হওয়ার কথা। সেখানে যুক্তি, নীতি ও কর্মসূচির প্রতিযোগিতা থাকবে— এটাই গণতান্ত্রিক চর্চার সৌন্দর্য। কিন্তু এখন সেই জায়গা ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, গালিগালাজ, হুমকি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক অপসংস্কৃতি। রাজনৈতিক বক্তব্যের ভাষা যত অশালীন হচ্ছে, ততই জনপরিসরের ভাষাও রূঢ় ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কঠোর স্লোগান নতুন নয়। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরবর্তী বিভিন্ন আন্দোলনেও তীব্র প্রতিবাদী ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই ভাষা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে হলেও ব্যক্তিগত বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অশ্লীলতায় পরিণত হয়নি।
বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক, সামাজিকসহ সর্বক্ষেত্রে যৌনতানির্ভর অশ্লীল ভাষার প্রয়োগ এত বেশি উগ্রে গেছে যে, তা অতীতের সব ধরনের সীমারেখা অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এমন সব শব্দ ও স্লোগান ব্যবহৃত হচ্ছে, যা একসময় কেবল সমাজের অশালীন পরিসরেই সীমাবদ্ধ ছিল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ভাষা এখন শুধু রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব—অনেকের বক্তব্যেও একই ধরনের ভাষা দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তিতে কেউ যখন এই ভাষাকে ন্যায্যতা দেন, আবার প্রতিপক্ষ একই ভাষা ব্যবহার করলে তার তীব্র নিন্দা করেন, তখন দ্বৈত মানদণ্ডের একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়। এর ফলে ভাষাগত সহিংসতা আরও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
জুলাই-পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক বিতর্কে একাধিক ঘটনা ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সমাবেশে অশালীন স্লোগান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করার উদ্দেশ্যে কুরুচিপূর্ণ ভাষার ব্যবহার নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কিছু ঘটনার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা প্রকাশের নামে শালীনতার সীমা অতিক্রমের অভিযোগও উঠেছে। এসব ঘটনা সমাজে বিভাজন আরও গভীর করেছে।
অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক মূল্যায়নও এখন গভীরভাবে বিভক্ত। এক পক্ষ এটিকে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছে, অন্য পক্ষের অভিযোগ— এই সময়ের পর থেকেই রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা, ভাষার সংযম এবং ঐতিহাসিক বয়ানের প্রতি সম্মান কমে গেছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হয়েছে।
অনেকের আশঙ্কা, ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে; কিন্তু যদি সেই বিতর্ক পারস্পরিক সম্মান ও তথ্যভিত্তিক আলোচনার বদলে অপমান, বিদ্বেষ ও গালিগালাজে রূপ নেয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নতুন প্রজন্ম। কারণ রাজনীতির ভাষাই ধীরে ধীরে সমাজের ভাষায় পরিণত হয়। শিশুরা যখন রাজনৈতিক স্লোগান থেকে অশ্রাব্য শব্দ শিখতে শুরু করে, তখন সেটি কেবল রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকটও।
রাজনৈতিক ভাষার এই অবক্ষয়ের আরেকটি বড় কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমিক সংস্কৃতি। উত্তেজনাপূর্ণ, কুরুচিপূর্ণ কিংবা চরমপন্থী বক্তব্য দ্রুত ভাইরাল হয়। ফলে অনেকেই যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের চেয়ে আলোচনায় আসার জন্য উসকানিমূলক ভাষা বেছে নেন। এতে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা নয়, বরং রাজনৈতিক উত্তেজনাই পণ্য হয়ে দাঁড়ায়।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের। রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায় যদি অশালীন ভাষার ব্যবহার নিরুৎসাহিত না করে, বরং নীরব সমর্থন দেয় কিংবা দলীয় সুবিধার জন্য তা উপেক্ষা করে, তাহলে নিচের স্তরের কর্মীরাও সেটিকে বৈধ মনে করবে। একইভাবে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, লেখক ও মতামত প্রদানকারীদের কাছ থেকেও সমাজ আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করে। কারণ তাঁদের বক্তব্য সমাজে প্রভাব ফেলে।
একটি সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপার্থক্য থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে, তীব্র সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু অশ্লীলতা কখনো রাজনৈতিক শক্তির পরিচয় হতে পারে না। গালি যুক্তির বিকল্প নয়; বরং যুক্তির দুর্বলতারই প্রকাশ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তথ্য, যুক্তি ও জনগণের আস্থা—অশালীন ভাষা নয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু সংকট এসেছে, আবার সেসব অতিক্রমও করা হয়েছে। বর্তমান ভাষাগত সংকট থেকেও উত্তরণের পথ রয়েছে। প্রয়োজন রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভিন্নমতের প্রতি ন্যূনতম সম্মান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ভাষা যদি মানবিকতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।
রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে কেবল ক্ষমতার পালাবদলে নয়; বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মানদণ্ডে। তাই সময়ের দাবি—অশ্লীলতার প্রতিযোগিতা নয়, যুক্তির প্রতিযোগিতা; বিদ্বেষের রাজনীতি নয়, শালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন