শনিবার, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** সাংবাদিক তানবিরুল মিরাজকে হয়রানি বন্ধের আহ্বান সিপিজের *** শক্তিশালী সরকারকে হটানো গেছে, এই সরকারকেও হটানো সম্ভব: শহিদুল আলম *** শহিদুল আলমের গতিবিধি নিয়ে প্রশাসনের সন্দেহ *** গাড়ির জ্বালানি ৩০ শতাংশ কম নেবেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা *** নরওয়ের উন্নয়ন সংস্থার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে *** ভারত কি পারবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন খ্রিষ্টান রাষ্ট্র গঠন ঠেকাতে? *** তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলে কি বড় সংকট দেখা দেবে? *** অফিস সময় ৯টা-৪টা, মার্কেট বন্ধ সন্ধ্যা ৬টায় *** সাংবাদিকদের হাতকড়া: ক্ষমতার প্রয়োগ না অপপ্রয়োগ? *** নারী এমপিদের নিয়ে আমির হামজার কুৎসিত বক্তব্যের বিচার চাইলেন রুমিন ফারহানা

সুখবর এক্সপ্লেইনার

উৎপাদন থাকলেও কেন পেট্রোল-অকটেন সংকট?

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৮:৫৯ পূর্বাহ্ন, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

দেশে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে এই দুই জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। শহর থেকে গ্রাম—প্রায় সর্বত্রই পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, কোথাও কোথাও সরবরাহ শেষ হয়ে যাওয়ায় পাম্প বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটছে।

অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে পেট্রোল ও অকটেনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয়ভাবেই উৎপাদিত হয়। তাহলে সংকটের মূল কারণ কোথায়—সরবরাহে ঘাটতি, নাকি চাহিদার অস্বাভাবিক উল্লম্ফন?

দেশে জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ডিজেলের। পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক হওয়ায় এর ওপর নির্ভরতা বেশি। অন্যদিকে পেট্রোল ও অকটেন মূলত ব্যক্তিগত যানবাহন, মোটরসাইকেল ও হালকা পরিবহনে ব্যবহৃত হয়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। অনেক পাম্পে ডিজেল পর্যাপ্ত থাকলেও পেট্রোল ও অকটেনে টান পড়েছে। অর্থাৎ সংকটটি সরবরাহের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান হয়েছে নির্দিষ্ট এই দুই জ্বালানিতে।

দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র—বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদিত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন করা হয়। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার ব্যারেল পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন হচ্ছে দেশীয় উৎস থেকেই।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে কনডেনসেট থেকে দুই লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি পেট্রোল উৎপাদিত হয়েছে, যা মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক। একই সময়ে অকটেন উৎপাদন হয়েছে মোট চাহিদার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

সরকারি প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল) এবং চারটি বেসরকারি রিফাইনারি মিলেই এই উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। হবিগঞ্জের প্ল্যান্টেই প্রতিদিন হাজার হাজার ব্যারেল কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন ও ডিজেল উৎপাদন করা হয়।

এ অবস্থায় তাত্ত্বিকভাবে বলা যায়, সম্পূর্ণ আমদানি বন্ধ হলেও দেশে পেট্রোল-অকটেন একেবারে শূন্য হয়ে যাওয়ার কথা নয়। যদিও উৎপাদন রয়েছে, তবে তা চাহিদার পুরোটা পূরণ করে না। দেশীয় উৎপাদনে পেট্রোলের প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ এবং অকটেনের একটি অংশ পূরণ হলেও বাকি অংশ আসে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) এবং আমদানি করা কনডেনসেট থেকে।

এছাড়া কনডেনসেট উৎপাদন নিজেও কমে গেছে। বিশেষ করে বিবিয়ানা, রশিদপুর ও হবিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় কাঁচামালের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে প্ল্যান্টগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।

সিলেটের দুটি প্ল্যান্টের দৈনিক সাড়ে সাত হাজার ব্যারেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে তারা পাচ্ছে মাত্র সাড়ে চার হাজার ব্যারেলের মতো কনডেনসেট।

তবে বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘প্যানিক বাইং’ বা আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত কেনাকাটা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি—বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সংঘাত—বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে মনস্তাত্ত্বিকভাবে।

পেট্রোলপাম্প মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, যেখানে আগে একজন গ্রাহক ২-৩ লিটার তেল কিনতেন, এখন সেখানে ৫-১০ লিটার নিচ্ছেন। অনেকেই গাড়ির ট্যাংক পুরো ভর্তি করে রাখছেন। ফলে স্বাভাবিক চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

একজন পাম্প মালিক সুখবর ডটকমকে জানান, আগে প্রতিদিন যেখানে ৫-৬ হাজার লিটার বিক্রি হতো, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০-৩০ হাজার লিটারে। এই অস্বাভাবিক চাহিদাই মূলত কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।

সংকটকে আরও তীব্র করছে অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ক্রেতাদের একটি অংশ প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে সংরক্ষণ করছেন।

সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যা না থাকলেও এই ধরনের আচরণ বাজারে ভারসাম্য নষ্ট করছে। ফলে পাম্পে সরবরাহ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে।

সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। অতিরিক্ত দামে হলেও বিদেশ থেকে তেল আমদানি বাড়ানো হয়েছে, মে মাস পর্যন্ত মজুদ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে, কিছু এলাকায় ফুয়েল কার্ড চালু করা হয়েছে এবং ঢাকায় মোটরসাইকেলের জন্য কিউআর কোড ব্যবস্থার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পাম্পে তদারকি জোরদার করতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ করা হয়েছে, এছাড়া জোড়-বিজোড় নম্বর অনুযায়ী তেল সরবরাহের মতো নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাও কিছু অঞ্চলে চালু করা হয়েছে।

বর্তমানে সরকার প্রতিদিন প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম না বাড়ানোয় এই চাপ আরও বেড়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট মূলত সরবরাহ ঘাটতির কারণে নয়, বরং অস্বাভাবিক চাহিদার ফল। তারা বলছেন, পেট্রোলের ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন দিয়ে অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও অকটেনের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা থাকবেই। তবে শিগগিরই অতিরিক্ত আমদানি এলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক হলেও এটি বড় একটি কাঠামোগত দুর্বলতা সামনে এনে দিয়েছে। দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা সীমিত, কনডেনসেট উৎপাদন কমছে এবং আমদানি নির্ভরতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে ডিজেল ও এলএনজির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে, যদি বৈশ্বিক বাজার অস্থিতিশীল থাকে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশে পেট্রোল ও অকটেন সংকট মূলত সরবরাহের চেয়ে বেশি ‘চাহিদা-নির্ভর’ সংকট। উৎপাদন ও মজুদ থাকা সত্ত্বেও আতঙ্ক, অতিরিক্ত কেনাকাটা এবং মজুতদারির কারণে বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আমদানি বাড়ানো নয়, বরং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা, চাহিদা নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর নজরদারি—এই তিনটির সমন্বয়ই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

জে.এস/

পেট্রোল-অকটেন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250