শুক্রবার, ২৮শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** অনলাইনে মত প্রকাশে ভয়, নিজেদের ‘গুটিয়ে নিচ্ছেন’ সাংবাদিকদের কেউ কেউ: জরিপ *** বন্যায় মৃত নারীর কান থেকে গয়না চুরি, ভিডিও ভাইরালের পর গ্রেপ্তার ২ *** নেপাল-তিব্বতে বন্যায় মৃত্যু বেড়ে ৫৫২ *** নেপালে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৮৯ *** ‘স্যার, কসম করেন’, ধরা পড়ার আগে পুলিশের সঙ্গে মোবারকের কথোপকথন *** বাংলাদেশ যেন মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ না দেয়, সেই বার্তা দিতেই কী ঢাকায় এসেছিলেন পরাগ জৈন *** ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান বিএনপি নেতার, ভিডিও ছড়াতেই শোকজ *** অধিবেশনের প্রথম দিনেই বিরোধী দলের ওয়াকআউট *** বাসসের এমডি ও প্রধান সম্পাদক হলেন কাদের গনি চৌধুরী *** ‘বোঝাপড়ার বিরোধী দল’ নিয়ে প্রশ্ন, সংসদে বারবার হট্টগোল—ছয়মাসেই কেন ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত স্পিকার

‘স্যার, কসম করেন’, ধরা পড়ার আগে পুলিশের সঙ্গে মোবারকের কথোপকথন

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ০৪:৫৫ অপরাহ্ন, ২৮শে আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

ঘরের ফলস ছাদের ভেতর অস্ত্র নিয়ে লুকিয়ে ছিলেন মোবারক হোসেন ওরফে ‘গলা কাটা মোবারক’। বাইরে অবস্থান নিয়েছিল পুলিশ। দরজা দিয়ে পুলিশ সদস্যরা ঘরে ঢোকার চেষ্টা করতেই ছাদ থেকে গুলি ছুড়তে শুরু করেন তিনি। পরপর ছয়টি গুলি ছোড়ার পর পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে পুলিশ তাকে আত্মসমর্পণ করে প্রাণে বাঁচার সুযোগ দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের আগে নিজের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান মোবারক। এমনকি পুলিশের সদস্যদের কাছে কসমও চান—তাকে যেন কিছু করা না হয়।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকায় গত বুধবার ভোররাতে মোবারককে গ্রেপ্তারের সময় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযানের সময় পুলিশের সঙ্গে তার কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে পুলিশের সঙ্গে মোবারকের কথাবার্তার পুরো অংশেই বোঝা যায়, আত্মসমর্পণের আগে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মোবারককে ধরতে পুলিশ কয়েক দফা অভিযান চালিয়েছিল। এর আগে ফটিকছড়ির বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ কাঞ্চননগরের পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তার কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পাহাড়ে নিজেকে নিরাপদ মনে না করে মোবারক লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকায় তার পূর্বপরিচিত একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর মঙ্গলবার রাত থেকে বাড়িটি ঘিরে ফেলে পুলিশ।

পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মোবারক ঘরের ফলস ছাদে উঠে অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেন। পুলিশ সদস্যরা ঘরে ঢোকার চেষ্টা করলে তিনি গুলি ছোড়েন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবারক পরপর ছয়টি গুলি করেন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। অভিযানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে অস্ত্রের গুলি আটকে গেলে পুলিশ তাকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ পায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে গুলি বিনিময়ের মধ্যেই পুলিশ তাকে বারবার আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পুলিশের এক সদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘জীবন বাঁচাতে চাইলে অস্ত্র ফেলে দে। আমাদের হাতে ধরা দে। আমরা জীবন বাঁচাব। আমরা খবর পাইছি, তোরে বাইরে কেউ মারার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা তোরে বাঁচানোর জন্য আসছি।’ এর জবাবে মোবারক বলেন, ‘অস্ত্র দিলে সমস্যা হবে।’

পুলিশ সদস্যটি তখন বলেন, ‘মোবারক, তোর ভালোর জন্য আসছি। তুই সারেন্ডার কর। তোর বাঁচার সুযোগ নেই। তোকে আমরা বাঁচানোর জন্য আসছি। তুই অস্ত্র ফেল, সময় নষ্ট করিস না। বের হওয়ার এখান থেকে আর কোনো সুযোগ নেই। পুলিশ বর্তমানে কাউকে মারে না।’ মোবারক তখনও বলেন, ‘অস্ত্র ফেলব না।’

ঘটনাস্থলে থাকা আরেক পুলিশ সদস্য তাঁকে বলেন, ‘অস্ত্র দিলে কেউ মারবে না তোকে। কেন মারব? আমি ওসি বলছি, অস্ত্রটা দিয়ে দে।’ এরপর মোবারক পুলিশকে সরে যেতে বলেন। পুলিশ সদস্যরা তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘না, যাব না। মোবারক, অস্ত্রটা দে। অস্ত্রটা ফেল। নিচে নাম, আগে নিচে নাম।’ একপর্যায়ে মোবারক বলেন, ‘আপনারা কসম করেন, আমাকে কিছু করবেন না।’

পুলিশ সদস্যরা তখন তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘কিছু করব না। খোদার কসম, কিছু করব না। এই মুরুব্বির কাছে অস্ত্র দে, চিন্তা থাকবে না। মুরুব্বির কাছে অস্ত্রটা দে।’ এরপর পুলিশের একজন সদস্য তাকে সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের কাছে কিন্তু চায়না রাইফেল, এসএমজি—সবকিছুই আছে। মোবারক, ইমন (ডেভিড ইমন) গ্রেপ্তার হয়েছে। ইমনের চেয়ে তুই বড় সন্ত্রাসী না।’ এরপরও মোবারক বলেন, ‘স্যার, আমি একটু পরে বলব স্যার। একটা অনুরোধ...আপনারা কসম করেন, আমাকে কিছু করবেন না।’

পুলিশ সদস্য আবার বলেন, ‘কসম করলাম তো। খোদার কসম, কিছু করব না। কিছু করব না। অস্ত্র ফেলে দে। খোদার কসম, কিছু করব না আমরা। তোর কিচ্ছু হবে না।’ এরপর মোবারকের কণ্ঠে শোনা যায়, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ, ভালো হইছে।’

তখন পুলিশের ওই সদস্য ঘরে থাকা এক বৃদ্ধকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মুরুব্বি, অস্ত্রটা নিয়ে আসেন। মুরুব্বি, অস্ত্র নিয়ে নেন।’ এরপরই শেষ হয় উত্তেজনাপূর্ণ ওই পরিস্থিতি। পুলিশ ফলস ছাদ থেকে মোবারককে নামিয়ে গ্রেপ্তার করে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ জানিয়েছেন, অভিযানের সময় মোবারক পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। তার ছোড়া গুলিতে তিনি নিজেসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তাকে ফলস ছাদ থেকে নামিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, মোবারকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগরে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে। তিনি কারাগারে থাকা সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিত। আবার পুলিশ তাকে বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হিসেবেও উল্লেখ করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে ‘শুটার’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।

অভিযানে মোবারকের সঙ্গে তার তিন সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান ওরফে রায়হান, মো. ফরিদ ও মো. নাছিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে তিনটি পিস্তল, ২৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলি এবং চারটি শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ উদ্ধারের কথাও বলা হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ জুলাই ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোবারকের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এরপর ফটিকছড়ির পাহাড়ি এলাকায় কয়েক দফা অভিযান চালানো হয়। সর্বশেষ সোমবার কাঞ্চননগরের পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোবারকের কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাহাড়ে নিরাপদ বোধ না করেই এরপর তিনি শাহনগরের ওই বাড়িতে আশ্রয় নেন।

মোবারককে গ্রেপ্তারের পর ফটিকছড়ি ও রাউজান এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। চাঁদা না পেয়ে গত ১৪ মে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে মোবারক ও তার সহযোগীরা গুলি চালিয়েছিলেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে। ওই ঘটনার পর আতঙ্কে ওই ব্যবসায়ী এলাকাছাড়া ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার মোবারক ও তার তিন সহযোগীকে আদালতে হাজির করা হয়। অস্ত্র এবং পুলিশের ওপর হামলার পৃথক দুই মামলায় মোবারকের মোট আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

এদিকে পুলিশের সঙ্গে মোবারকের কথোপকথনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য দেখা যাচ্ছে। অনেকে বলছেন, পুলিশের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের মতো ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যেও একজন অস্ত্রধারী ব্যক্তিকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দিয়ে নিরাপদে গ্রেপ্তার করার দৃশ্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। কেউ কেউ আবার ভিডিওতে মোবারকের বারবার ‘কসম’ চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব মন্তব্যের বেশির ভাগের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনার পুরো ভিডিওতে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে মোবারকের সেই অনুরোধ—‘স্যার, কসম করেন, আমাকে কিছু করবেন না।’ আর পুলিশের জবাবও ছিল স্পষ্ট—‘খোদার কসম, কিছু করব না।’ এরপরই আসে তার স্বস্তির প্রতিক্রিয়া—‘থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ, ভালো হইছে।’ শেষ পর্যন্ত অস্ত্র হাতে লুকিয়ে থাকা মোবারক পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং গ্রেপ্তার হন।

গ্রেপ্তার

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250