শুক্রবার, ২৮শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** অনলাইনে মত প্রকাশে ভয়, নিজেদের ‘গুটিয়ে নিচ্ছেন’ সাংবাদিকদের কেউ কেউ: জরিপ *** বন্যায় মৃত নারীর কান থেকে গয়না চুরি, ভিডিও ভাইরালের পর গ্রেপ্তার ২ *** নেপাল-তিব্বতে বন্যায় মৃত্যু বেড়ে ৫৫২ *** নেপালে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৮৯ *** ‘স্যার, কসম করেন’, ধরা পড়ার আগে পুলিশের সঙ্গে মোবারকের কথোপকথন *** বাংলাদেশ যেন মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ না দেয়, সেই বার্তা দিতেই কী ঢাকায় এসেছিলেন পরাগ জৈন *** ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান বিএনপি নেতার, ভিডিও ছড়াতেই শোকজ *** অধিবেশনের প্রথম দিনেই বিরোধী দলের ওয়াকআউট *** বাসসের এমডি ও প্রধান সম্পাদক হলেন কাদের গনি চৌধুরী *** ‘বোঝাপড়ার বিরোধী দল’ নিয়ে প্রশ্ন, সংসদে বারবার হট্টগোল—ছয়মাসেই কেন ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত স্পিকার

বন্যায় মৃত নারীর কান থেকে গয়না চুরি, ভিডিও ভাইরালের পর গ্রেপ্তার ২

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ০৫:২৩ অপরাহ্ন, ২৮শে আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে শত শত মানুষের মৃত্যুর মধ্যেই সামনে এসেছে অমানবিক এক ঘটনা। বন্যার পানিতে ভেসে আসা এক নারীর লাশ থেকে সোনার কানের দুল খুলে নেওয়ার অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে নেপাল পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৪১ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে ঘটনাটি ধরা পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপর ভিডিও দেখে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে পুলিশ।

গ্রেপ্তার দুজন হলেন ২৫ বছর বয়সী মদন গুরুং ও ৩৮ বছর বয়সী উমেশ চৌধুরী। নেপালি সংবাদমাধ্যম খবরহাব-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার ভরতপুর মহানগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ডের পোখারা বাস পার্ক এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। নেপাল পুলিশের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়াও জানিয়েছে, নারায়ণী নদীতে বন্যার পানিতে ভেসে আসা ওই নারীর লাশ উদ্ধারের সময় ঘটনাটি ঘটে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি নদীর পানিতে ভেসে আসা এক নারীর লাশ তীরে তোলার চেষ্টা করছেন। কাঠের তক্তা এবং লাশের চুল ধরে তারা মরদেহটি পানির কিনারায় টেনে আনেন। লাশটি তীরে তোলার পর সেখানে থাকা দুজন ব্যক্তি নারীর দুই কান থেকে কানের দুল খুলে নেন বলে ভিডিওতে দেখা যায়। আশপাশে থাকা কয়েকজন পুরো ঘটনাটি মুঠোফোনে ধারণ করছিলেন।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে বিষয়টি নেপাল পুলিশের নজরে আসে। পুলিশ ভিডিও বিশ্লেষণ করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, চিতওয়ান জেলা পুলিশ তদন্ত করে নিশ্চিত হয় যে ভিডিওতে দেখা লাশটি ভয়াবহ বন্যার পানিতে নারায়ণী নদীতে ভেসে আসা এক নারীর।

নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা নিহত ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোনো ধরনের সম্পদ লুট করা কিংবা তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, দুর্যোগের এই চরম সময়ে মানুষের দুর্ভোগকে কাজে লাগিয়ে যারা অপরাধ করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন নেপাল সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করছে। গত বুধবার নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। প্রথম দিকে এটিকে ভূমিকম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনা মনে করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, মূল কারণ ছিল হিমবাহ ধসে বরফ, পাথর ও কাদার বিশাল প্রবাহ নেমে আসা। এই প্রবাহ পাহাড়ি নদীগুলোতে মুহূর্তের মধ্যে পানির উচ্চতা বাড়িয়ে দেয় এবং নদীর আশপাশের বসতি, সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

ইউরোনিউজ জানিয়েছে, ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৪৭০ ছাড়িয়েছে। শুক্রবার রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালে ৪৮৯ জন এবং তিব্বতে আরও পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রায় এক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। এর মধ্যে পাঁচ শতাধিক বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। তবে নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে হিসাব পরিবর্তিত হচ্ছে, কারণ দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল এখনো পৌঁছাতে পারেনি এবং অনেক পরিবারের সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদেরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকেই তিব্বতের পবিত্র কৈলাস মানসসরোবর এলাকায় তীর্থযাত্রা কিংবা নেপালের পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণে গিয়েছিলেন।

নেপাল ও তিব্বতের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকাজ চালাতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করা হচ্ছে। হেলিকপ্টারে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তবে কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপে সড়কপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

গার্ডিয়ান জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে নেপালের কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে ভূমিকম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেখানে প্রকৃত কোনো ভূমিকম্প হয়নি। হিমবাহ ও শিলার আকস্মিক ধস থেকে সৃষ্ট প্রবল ধসপ্রবাহই ভয়াবহ বন্যার মূল কারণ। গবেষকদের মতে, হিমালয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এরই মধ্যে নতুন করে আরেক দফা বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিধসে তৈরি একটি হ্রদের পানি আজ শুক্রবার উপচে পড়তে শুরু করেছে। এতে নেপাল-চীন সীমান্তের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার অভিযানও স্থগিত করা হয়। হ্রদটিতে জমে থাকা পানির পরিমাণ ২৫ লাখ ঘনমিটারের বেশি বলে জানানো হয়েছে। সেই পানি ভোতেকোশি নদীতে প্রবাহিত হওয়ায় নিচের দিকে থাকা এলাকাগুলোতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

তিব্বতের জিরং এলাকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তবর্তী জিরং বন্দরে কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোত আঘাত হানে। এতে প্রশাসনিক ভবন, সড়ক ও পার্কিং এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বহু জায়গায় কয়েক ফুট পুরু কাদার স্তর জমে আছে। চীনা কর্তৃপক্ষও শত শত নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে।

বিপুল প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে মৃত এক নারীর দেহ থেকে গয়না খুলে নেওয়ার ঘটনাটি তাই নেপালের মানুষের কাছে আরও বেশি বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে। দুর্যোগে যখন মানুষ স্বজনের সন্ধানে দিশেহারা, উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপে প্রাণের সন্ধান করছেন এবং হাজারো পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তখন একটি মৃতদেহের সঙ্গেও এমন আচরণ সামাজিকভাবে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

নেপাল পুলিশ বলেছে, দুর্যোগের সময় মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে লুটপাট বা অন্য কোনো অপরাধ করার চেষ্টা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মদন গুরুং ও উমেশ চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ আনা হবে এবং চুরি করা গয়নাগুলো উদ্ধার করা গেছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ বিস্তারিত জানায়নি।

এদিকে নেপাল ও তিব্বতে উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকলেও নতুন বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, পাহাড়ি নদী ও ভূমিধসে তৈরি বাধের কারণে নতুন করে পানি জমে যাওয়ায় যেকোনো সময় আরও বড় ঢল নামতে পারে। ফলে উদ্ধারকারীদের একদিকে ধ্বংসস্তূপে নিখোঁজ মানুষদের খুঁজতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের নিরাপত্তার কথাও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

চুরি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250