শুক্রবার, ২৮শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বাংলাদেশ যেন মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ না দেয়, সেই বার্তা দিতেই কী ঢাকায় এসেছিলেন পরাগ জৈন *** ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান বিএনপি নেতার, ভিডিও ছড়াতেই শোকজ *** অধিবেশনের প্রথম দিনেই বিরোধী দলের ওয়াকআউট *** বাসসের এমডি ও প্রধান সম্পাদক হলেন কাদের গনি চৌধুরী *** ‘বোঝাপড়ার বিরোধী দল’ নিয়ে প্রশ্ন, সংসদে বারবার হট্টগোল—ছয়মাসেই কেন ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত স্পিকার *** ‘শাহবাগে বক্তৃতা আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা এক নয়,’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সংসদে হট্টগোল *** ৬৪ জেলায় ৬৪ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলে মন্দ হতো না: রুমিন ফারহানা *** ৬৪ জেলায় ৩০ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-হুইপের নতুন দায়িত্ব, কে পেলেন কোন জেলা *** যোগ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আসল অবস্থান কী, বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, ভারত কেন উদ্বিগ্ন *** নেপালে বন্যায় মৃত বেড়ে ৩৩২, এখনো নিখোঁজ অন্তত ১৫০০

বাংলাদেশ যেন মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ না দেয়, সেই বার্তা দিতেই কী ঢাকায় এসেছিলেন পরাগ জৈন

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১২:৪৫ পূর্বাহ্ন, ২৮শে আগস্ট ২০২৬

#

ফাইল ছবি

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে ভারত সরাসরি আপত্তি না জানালেও বিষয়টি যে দিল্লির নজরে রয়েছে, তা সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় স্পষ্ট। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে বাংলাদেশ আগ্রহ দেখানোর কথা জানানোর পর ভারতের উদ্বেগের মাত্রাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যেই ৯ আগস্ট ঢাকায় আসেন ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং’ বা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন।

তার সফরকে বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা সহযোগিতার নিয়মিত যোগাযোগের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে ঢাকা। তবে সফরের সময়কাল ও সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ২৫ আগস্ট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে এবং বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়া বা মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা চুক্তি হলে বাংলাদেশের সেখানে অংশগ্রহণ অস্বাভাবিক নয়। তার এই বক্তব্যের পরই বিষয়টি ভারতের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দিতে আগ্রহী—এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, দিল্লি পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্য সরাসরি বিরোধিতার ভাষা নয়। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের পরবর্তী মন্তব্যে বোঝা যায়, চুক্তিটিকে দিল্লি তার নিরাপত্তা হিসাবের বাইরে রাখছে না। ২২ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে মক্কা চুক্তি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে জয়শঙ্কর বলেন, তিন স্বাক্ষরকারী দেশই বাস্তব সামরিক পরিস্থিতির মুখোমুখি; এসব পরিস্থিতিতে চুক্তিটি এখন পর্যন্ত কী করেছে, সেটিও বিবেচনার বিষয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের প্রতি যেসব দেশ ভালো মনোভাব পোষণ করে না, তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা ভারতের নিরাপত্তা হিসাবের মধ্যে অবশ্যই আসে।

এখানেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়টি ভারতের কাছে আলাদা গুরুত্ব পেতে পারে। কারণ মক্কা চুক্তির তিন সদস্যের মধ্যে পাকিস্তান ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। তুরস্কও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। সৌদি আরব আবার ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশের সঙ্গেই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে বাংলাদেশ এই কাঠামোয় যুক্ত হলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে। ভারতের জন্য এর অর্থ হবে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন একটি স্তর যুক্ত হওয়া।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ মক্কা চুক্তি নিয়ে বিশ্লেষণে বলেছে, এর তাৎপর্যের একটি দিক হলো সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্কের নিরাপত্তা সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তি, তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ফলে তিন দেশের সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থান এক জায়গায় আসায় ভারতের জন্য বিষয়টি পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর বিশ্লেষণেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, মক্কা চুক্তি কেবল আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামো, নাকি এর মাধ্যমে পাকিস্তানের সামরিক অবস্থানও শক্তিশালী হচ্ছে। পত্রিকাটি লিখেছে, চুক্তিটি ইরানকে মোকাবিলার জন্য বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হতে পারে, আবার পাকিস্তানের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা তৈরির সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তবে একই সঙ্গে ভারতীয় বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, চুক্তিটিকে সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে জোট হিসেবে দেখার যথেষ্ট প্রমাণ এখনো নেই।

‘ডয়চে ভেলে’র বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও অস্থিরতার মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ। অর্থাৎ মক্কা চুক্তির লক্ষ্য কেবল ভারতকে ঘিরে নয়; পশ্চিম এশিয়ার বদলে যাওয়া নিরাপত্তা কাঠামোও এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।

তবে ভারতের উদ্বেগের আরেকটি কারণ পাকিস্তান-তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তুরস্কের উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প, পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক শক্তি এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব—এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করলে নতুন ধরনের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।

মক্কা চুক্তির প্রকাশ্য ঘোষণায় অবশ্য কোনো দেশকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র জোরদার এবং সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তুরস্কও স্পষ্ট করেছে, চুক্তিতে ইরান বা অন্য কোনো দেশকে অভিন্ন হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

ফলে মক্কা চুক্তিকে এখনই ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, চুক্তিটির সদস্যদের হুমকির ধারণা এক নয় এবং ভারতের এ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করাই গুরুত্বপূর্ণ।

তবু বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের ক্ষেত্রে ভারতের হিসাব আলাদা হতে পারে। কারণ বাংলাদেশ ভারতের প্রতিবেশী এবং দুই দেশের নিরাপত্তা, সীমান্ত, নদীর পানি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো বহু সরাসরি স্বার্থ জড়িত। এর সঙ্গে যদি পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যুক্ত হয়, তাহলে দিল্লিকে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নতুন বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ জানিয়েছে, বাংলাদেশের মক্কা চুক্তি বা এ ধরনের কোনো কাঠামোয় যোগ দেওয়ার আগ্রহ এবং শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবির কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের পরিকল্পনাও জটিল হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পরাগ জৈনের ঢাকা সফর। ৯ আগস্ট বিকেলে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন অশ্বিন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি ও শৈবল রায় চৌধুরী। ‘দ্য ডেইলি স্টার’ ও ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের আমন্ত্রণে প্রতিনিধিদলটি ঢাকায় আসে। পরাগ জৈন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।

প্রতিনিধিদলটি রোববার ঢাকায় এসে সোমবারই দিল্লির উদ্দেশে ফিরে যায়। ‘স্টার’-এর প্রতিবেদনে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, এটি ছিল নিয়মিত ধরনের সফর। দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে এ ধরনের সফরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও সফরটিকে স্বাভাবিক ও নিয়মিত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, পরাগ জৈন চীন সফর শেষে ঢাকায় এসেছেন এবং তার ফর নিয়ে জল্পনার কারণ নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।

তবে সফরের সময়টিই কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়। এর মাত্র চার দিন পর ঢাকায় আসেন ‘র’-প্রধান। একই সময়ে ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানিয়েছে, পরাগ জৈনের সফর এবং ত্রিবেদীর বৈঠক একই সময়ে হওয়াকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বৈঠকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও উত্থাপিত হয়।

তাই পরাগ জৈনের সফরের উদ্দেশ্য শুধু মক্কা চুক্তি ঠেকানো ছিল—এমন দাবি করার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। বরং বাংলাদেশি ও ভারতীয় সূত্রগুলো সফরটিকে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার নিয়মিত যোগাযোগের অংশ বলেছে। কিন্তু সফরের সময়কাল, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহ এবং একই সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নানা অমীমাংসিত ইস্যু—সব মিলিয়ে এর কৌশলগত বার্তা নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।

ভারতের অবস্থানও এখন পর্যন্ত সরাসরি ‘না’ বলার নয়। ‘র’-প্রধানের সফরের পরও দিল্লি প্রকাশ্যে বাংলাদেশকে মক্কা চুক্তিতে না যাওয়ার আহ্বান জানায়নি। বরং রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ভারত পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, ভারতের প্রতি অনুকূল নয় এমন দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ভারতের নিরাপত্তা হিসাবের অংশ।

অর্থাৎ দিল্লির দুশ্চিন্তা মূলত চুক্তিটির নাম বা ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে এর সম্ভাব্য কৌশলগত প্রভাব নিয়ে। পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক তৈরি হলে ভারতের পূর্ব সীমান্তের কাছাকাছি একটি নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা যোগাযোগ বাড়লে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রচলিত কৌশলগত হিসাব কিছুটা বদলাতে হবে—এমন আশঙ্কাই ভারতীয় বিশ্লেষণে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আবার অন্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সুযোগ বাড়তে পারে, পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগও নতুন মাত্রা পেতে পারে। কিন্তু এর বিপরীতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে তাই বলা হয়েছে, মক্কা চুক্তির সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা অগ্রাধিকার বাংলাদেশের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়; ফলে এতে যোগ দিলে বাংলাদেশ এমন কিছু সংঘাতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে, যার সঙ্গে তার সরাসরি স্বার্থ নেই।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। বরং সরকারের বক্তব্য হলো, সদস্য দেশগুলোর আমন্ত্রণ এবং দেশের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে সামনে মূল প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যাবে কি না, তা নয়; বরং এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ঢাকা তার পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির ভারসাম্য কোন দিকে নিতে চায়, সেটিও স্পষ্ট হবে।

আর সেই সিদ্ধান্তের দিকে দিল্লির নজর যে গভীর, তার সবচেয়ে সাম্প্রতিক প্রকাশ রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্যেই। আর ৯ আগস্টের পরাগ জৈনের আকস্মিক ঢাকা সফর সেই নজরদারির প্রেক্ষাপটকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। সফরটি নিয়মিত নিরাপত্তা যোগাযোগের অংশ হতে পারে; কিন্তু মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান যখন দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন এর সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের কোনো যোগ নেই—এমন নিশ্চয়তাও এখনই দেওয়া কঠিন।

পরাগ জৈন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250