ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া
ঝর্ণা মনি
২০০৯ সাল। মে মাসের শেষ সপ্তাহের এক সন্ধ্যা। অফিস (দৈনিক জনকণ্ঠ) থেকে একটু আগে আগে বের হয়ে মৌচাকে ভোরের কাগজে গেলাম এক আপুর জবের জন্য। বেশ কিছুক্ষণ গল্পটল্প করে ওই আপুর সিভি জমা দিয়ে পাবলিক লাইব্রেরির জন্য রিকশা নিলাম। মৎস্যভবনের সামনে আসতেই ফোন, আমি, ভোরের কাগজের অ্যাডমিন থেকে সুজন নন্দী, আপনি আগামীকাল সন্ধ্যার পর একটু আসতে পারবেন?
আমি—পারব। কিন্তু আমার আপু?
সুজনদা—তাকেও আসতে বলা হবে।
আমি—ধন্যবাদ।
পরদিন ভোরের কাগজে গেলে আমার সিনিয়র বললেন, তুমি তো আগে একবার ভোরের কাগজে কাজ করতে চেয়েছিলে, এখন সুযোগ আছে চাইলে পলিটিক্যাল বিটে তুমি জয়েন করতে পারো। দাদার (সম্পাদক শ্যামল দত্ত) কাছে যাওয়ার পর, হাসিমুখে বললেন, তোমাকে তো চিনি, সংসদ বিটে দেখেছি। কাল থেকে অফিস শুরু করো।
আর আপু (আমি যার জন্য মূলত ভোরের কাগজে গিয়েছিলাম), তিনি সংস্কৃতিবিষয়ক রিপোর্ট করতে চাইলে তাকেও হ্যাঁ বলা হলো। কিন্তু তার কোনো এক পারিবারিক ঝামেলার কারণে আর জয়েন করতে পারেননি এবং পরে বিটিভি ভবনের সামনে রাস্তা ক্রস করতে গিয়ে অকালে মারা যান।
জনকণ্ঠ ছেড়ে ভোরের কাগজে আমি যোগ দিই ২ জুন। ভোরের কাগজ যেন রূপকথার সেই রাজপ্রাসাদ। কালের পরিক্রমায় জৌলুস হারিয়ে গেছে, কিন্তু আভিজাত্য রয়ে গেছে। ভোরের কাগজ হাউজ মানেই সত্যিকারের ভালোবাসার ঘর। সারাদিন পরিশ্রান্ত মানুষ যেমন ঘরে ফেরে শান্তির জন্য, তেমনি ভোরের কাগজও। হইচই, হাহাহিহি, চা, কফি—সবসময় চলছেই।
জমজমাট আড্ডার মধ্যেই চলে চ্যালেঞ্জিং সাংবাদিকতার কাজ। শুধু ভোরের কাগজের রিপোর্টাররাই শ্রেষ্ঠ রিপোর্টার অ্যাওয়ার্ড পান না, প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভোরের কাগজ নিজেও সম্মানিত হয়েছে। আর সবকিছু এক সুতোয় গেঁথে, সবাইকে বুকে আগলে রেখে পথ দেখিয়ে এগিয়ে চলেছেন যিনি, তিনি সম্পাদক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শ্যামল দত্ত, আমাদের দাদা।
মাঠের রিপোর্টার থেকে সম্পাদক—পথটা অনেক বেশি দুঃসাহসের। অনেক দীর্ঘ যাত্রাপথ পাড়ি দিয়েছেন অসীম তেজে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, প্রকৌশলী থেকে যোগাযোগবিদ্যায় পারদর্শী, বিদেশে পড়াশোনা করে দেশে ফিরে এসে দায়িত্ব নেওয়া, টকশোর বাঘা বাঘা বক্তাদের পেছনে ফেলে বাগ্মী বক্তা হিসেবে নিজেকে পরিচিত করা—শ্যামল দত্তের পক্ষেই সম্ভব।
নেতৃত্বেও চমক সৃষ্টি করেছেন দাদা। ২০১৬ সালে যখন প্রথম জাতীয় প্রেসক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য পদে নির্বাচনে অংশ নেন, তখন অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। বড় পদ রেখে শ্যামল দত্তের মতো একজন সম্পাদক সদস্য পদে কেন? দাদা সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। এরপর কোষাধ্যক্ষ, সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু হায়! জনপ্রিয়তাও অনেকের কাছেই চক্ষুশূল!
প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব, টকশো, জাতীয়-আন্তর্জাতিক সেমিনার, বিদেশ ভ্রমণ—সবকিছুর পরও ভোরের কাগজ আর সম্পাদক শ্যামল দত্ত—নাম মিশে গেছে অঙ্গাঙ্গিভাবে। দাদা আমাদের অবারিত স্বাধীনতা দিয়েছেন লেখার, বলার, সাংবাদিক সংগঠনগুলোতে নির্বাচন করার। শুধু কাজ নয়, কিংবা চাপ মাথায় নিয়ে কাজ করা নয়, আমরা অফিসকে সত্যিকারের ঘর বানিয়ে ছিলাম।
রাখিবন্ধন, ভাইফোঁটা যেমন করতাম, তেমনি নারী দিবস, পয়লা বৈশাখ, বসন্ত উৎসব পালন করতাম। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস উদযাপন করতাম। সবচেয়ে বেশি জমজমাট ছিল এক মাস রোজা। বিকেল থেকেই শুরু হতো ইফতারের আয়োজন। এত জমজমাট ইফতারের আয়োজন আমি অন্য হাউজে পাইনি।
দাদার একটি বিশেষ গুণ—ছোট থেকে বড়, সবার সঙ্গে চমৎকারভাবে মিশে যাওয়া, গল্প করা, মানুষের মুড পরিবর্তন করা, পড়াশোনায় উৎসাহিত করা।
অনেক অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। দাদাকে নিয়েও তাই। ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের কারণে দাদা অফিসকে নির্দেশ দিলেন, ঝর্ণাকে বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়া হোক। ২০১৫ সালে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে নিউজ করার আগেই আমাকে নিয়ে দাদার কাছে হুমকি দেওয়া হয়। দাদা ওই সময় আমেরিকায় ছিলেন। ফোন করে আমাকে অফিসে ফিরে যেতে বলেন। আর অফিসকে সেই আগের মতোই বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
ফ্রিডম পার্টির এক নেতার পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নেতা বনে যাওয়া এবং চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি নিয়ে ২০২০ সালে নিউজ করেছিলাম। দাদা যশোরে, প্রতিনিধি সম্মেলনে। অফিসে এসেই ফোন, তাড়াতাড়ি আসো। ভয়ে মোটামুটি হাত-পা কাঁপছে। দাদা হাসতে হাসতে বললেন, ভাই রে, করছো কী? এখন তো আমারে অস্থির করে দিচ্ছে। এরা ভয়ংকর খারাপ। তোমার বাসাও চেনে। আপাতত সপ্তাহখানেক অন্য কোথাও থাকো। আর নরমাল নিউজ করো। অ্যাডমিনকে বললেন, ঝর্ণার ফোন নম্বর, বাসার ঠিকানা কাউকে দেবেন না। ড্রাইভারদের বলে দেবেন, ও ঘরে ঢোকার পর যেন আসে।
এটি শুধু ব্যক্তি ঝর্ণা মনি নয়, অভিভাবক হিসেবে সবার জন্যই এমন করেছেন দাদা। ভোরের কাগজ নারীবান্ধব হাউজ। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিট কভার করেছেন নারীরা। এমনকি ভোরের কাগজই সম্ভবত প্রথম জাতীয় দৈনিক, যার বার্তা সম্পাদক ছিলেন নারী, প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন নারী। এগুলো সব সম্ভব হয়েছে নারীবান্ধব, মুক্তমনা সম্পাদক শ্যামল দত্তের সাহসে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে দেশের অন্য সবকিছুর মতোই ভোরের কাগজও ছিল ঠিকঠাক, সাজানো, গুছানো, সুন্দর, পরিপাটি একটি বাগান। ৫ আগস্ট থেকেই বাগানে ফুলের সৌরভ ছাপিয়ে বেড়ে গেল ভেতরে-বাইরের তক্ষকের গর্জন। অন্ধকার সময়ে বিনা কারণে একজন প্রথিতযশা সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হলো। তার পত্রিকা দখলে মরিয়া হলো একটি চক্র।
ইউনূস আমল শেষ। কিন্তু দাদার মুক্তি হয় না! দাদার অপরাধ কী? কেউ জানে না। দেশে-বিদেশে মুক্তির জন্য দাবি উঠেছে, দীর্ঘদিনের এই দাবির বিপরীতে সরকার চুপ। স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো অসুস্থতা নিয়ে একজন সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাবের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শ্যামল দত্তকে বিনা বিচারে কারাগারে দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়েছে—সাংবাদিক সমাজের কোথাও জোরালো আওয়াজ নেই!
অথচ ‘মুক্তপ্রাণের প্রতিধ্বনি’ স্লোগানের ভোরের কাগজ যখনই সাংবাদিকদের ওপর আঘাত এসেছে, যতবার, লড়াইয়ে গর্জে উঠেছে। আমি সম্পাদক শ্যামল দত্ত দাদার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, ছড়াসাহিত্যিক।
খবরটি শেয়ার করুন