ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি বা ফ্রান্সের পতাকা টানানোর সংস্কৃতি দেশে বহু বছরের। তবে চলতি জুনে রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলায় কালো ও সাদা রঙের কালেমা-খচিত পতাকা টানানো, হাতে নিয়ে মিছিল ও মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার ঘটনা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত কয়েকটি জঙ্গিগোষ্ঠীর ব্যবহৃত পতাকার সঙ্গে এসব পতাকার নকশাগত মিল থাকায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন হেফাজতে ইসলামের সাবেক শিক্ষা-সংস্কৃতি সম্পাদক, হরকাতুল জিহাদের (হুজি) নেতা হিসেবে অভিযুক্ত ও বিতর্কিত মুফতি হারুন ইজহার। চলতি বছরের ১৩ জুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও থেকে বিষয়টি নতুন গতি পায়। 'আল কুরআনের দারস' নামে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ওই ভিডিওতে হারুন ইজহার মুসলমানদের বিদেশি দেশের পতাকার পরিবর্তে কালেমা-খচিত পতাকা ওড়ানোর আহ্বান জানান।
তার বক্তব্য ছিল, বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে যখন বিভিন্ন দেশের পতাকা টানানো হচ্ছে, তখন মুসলমানদেরও নিজের পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে কালেমার পতাকা ওড়ানো উচিত। এরপর কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের পতাকার ব্যবহার দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, হারুন ইজহারের বক্তব্য প্রকাশের পরই দেশজুড়ে একই ধরনের পতাকা ব্যবহারের প্রবণতা দৃশ্যমান হয়। ফলে তার বক্তব্য এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কিনা, সেটি যাচাই করা হবে। তদন্তের স্বার্থে তার কাছে জানতে চাওয়া হতে পারে—এই আহ্বান কোনো সংগঠিত কর্মসূচির অংশ কিনা, নাকি এটি ব্যক্তিগত ধর্মীয় মতামত।
একই সঙ্গে আলোচনায় আসছে হারুন ইজহারের হুজির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া এবং বিভিন্ন সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিতর্কিত হওয়ার প্রসঙ্গ।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, পতাকাগুলোর সাদা পটভূমিতে কালো আরবি ক্যালিগ্রাফি এবং কালো পটভূমিতে সাদা লেখার দুটি ধরন যথাক্রমে আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসন ও আল-কায়েদাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের ব্যবহৃত প্রতীকের সঙ্গে মিলে যায়। একটি পতাকায় সাদা পটভূমিতে কালো আরবি হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, অন্যটিতে কালো পটভূমিতে সাদা হরফে একই বাক্য লেখা রয়েছে। কালো পটভূমির ওপর সাদা হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা পতাকা আল-কায়েদার বিভিন্ন শাখাও ব্যবহার করে।
তালেবানের পতাকায় আরবিতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ যে ক্যালিগ্রাফিতে লেখা, একই ক্যালিগ্রাফি ও নকশায় তৈরি পতাকা ওড়াতে দেশে দেখা যাচ্ছে। দেশে এ ধরনের দুটি পতাকা ব্যবহার করে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর। সূত্র বলছে, কালেমা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের ঘোষণা। এটি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। ধর্মীয় অনুভূতির বিষয় হিসেবে নয়, সম্ভাব্য নিরাপত্তা ও উগ্রবাদ-সংক্রান্ত দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। এ প্রচারণার উৎস, সংগঠক, অর্থায়ন এবং সমন্বয়কারীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তে প্রয়োজন হলে যাদের বক্তব্য বা ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। সেই তালিকায় মুফতি হারুন ইজহারের নামও রয়েছে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, কালেমা-খচিত পতাকা ওড়ানোর বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন গণমাধ্যমে বলেন, বিষয়টি পুলিশের নজরে রয়েছে এবং তারা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছে।
জানা গেছে, এক ভিডিও বক্তব্যে হারুন ইজহার ‘কালেমার পতাকা’ ওড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগায়ে দেবেন। এখন যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে, তাহলে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল—এগুলোর সব পতাকা নামাতে হবে। এগুলো যেখানে থাকবে, কালেমার পতাকাও থাকবে আমাদের।’
‘আল কুরআনের দারস’ নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ১৩ জুন প্রকাশিত ভিডিওতে হারুন ইজহার বিদেশি পতাকার পরিবর্তে কালেমা-খচিত পতাকা ব্যবহারের ওই আহ্বান জানান। এরপর রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সাদা-কালো পতাকা লাগানো, মিছিল, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা এবং প্রকাশ্যে প্রদর্শনের ঘটনা বাড়তে থাকে।
হারুন ইজহার দীর্ঘদিন ধরে দেওবন্দি ধারার ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় ইস্যুতে তার বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। অনুসারীদের মধ্যে তার একটি উল্লেখযোগ্য শ্রোতাগোষ্ঠী রয়েছে। ২০০৯ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ চট্টগ্রামের লালখান বাজারের জামেয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসা থেকে তাকেসহ দুই বিদেশিকে জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার করে।
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনায় আসেন ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের সাবেক চেয়ারম্যান মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে হারুন ইজহার। যে মাদ্রাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, চট্টগ্রামের পাহাড়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত ওই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা তার বাবা। ২০০৯ সালের ৬ নভেম্বর প্রথম আলোতে ‘চট্টগ্রাম থেকে সন্দেহভাজন তিন জঙ্গি আটক, মার্কিন দূতাবাসে হামলার পরিকল্পনা লস্করের’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, হারুন ইজহার হুজির সঙ্গে যুক্ত। তিনি বিদেশি জঙ্গিদের দেশে আশ্রয় দেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশে হুজির তৎপরতা শুরুর পর চট্টগ্রামের লালখান বাজারের ওই মাদ্রাসা ছিল সদস্য সংগ্রহের অন্যতম কেন্দ্র। সেখানে জঙ্গিদের শারীরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ ছিল। এ বিষয়ে প্রথম আলোতে ২০০৪ সালের আগস্টে আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
গোয়েন্দা সূত্র তখন প্রথম আলোকে জানায়, ডেনমার্কের একটি পত্রিকার কার্যালয়ে হামলার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ২০০৯ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে ডেভিড কোলম্যান হেডলি (৪৯) ও তাহাবুর হোসাইন রানা (৪৮) নামের দুই জঙ্গি গ্রেপ্তার হন। তাদের সঙ্গে লস্কর-ই-তাইয়েবার নেতা পাকিস্তানের নাগরিক আবদুর রহমান ওরফে সাইদের যোগাযোগের প্রমাণ পায় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। আর পাকিস্তানের সাইদের সঙ্গে বাংলাদেশে টি নাসির, আসাফ ও মুফতি হারুনের টেলিফোনে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র পত্রিকাটিকে আরও জানায়, বিদেশি গোয়েন্দা সূত্র থেকে এসব তথ্য পান বাংলাদেশের গোয়েন্দারা। এরপর পাকিস্তানি জঙ্গিদের সঙ্গে এ দেশ থেকে যোগাযোগ রক্ষাকারীদের ব্যাপারে অনুসন্ধানে নামে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ। প্রযুক্তির সহায়তায় মুঠোফোন ব্যবহারের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তিন জঙ্গিকে শনাক্ত করা হয়। এরপর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়ে হারুন ইজহারসহ তিন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে।
পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে এসব জঙ্গি ঢাকায় বসে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতীয় দূতাবাসে হামলার পরিকল্পনা করছিলেন বলে গোয়েন্দারা তখন জানান। ওই সময় ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতীয় দূতাবাসের নিরাপত্তা জোরদারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
২০১৩ সালের ৭ অক্টোবর লালখান বাজারের জামেয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে মাদ্রাসার দুই ছাত্র নিহত হন। ঘটনার দুই দিন পর হাটহাজারী থেকে হারুন ইজহারকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরবিরোধী কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ জুমার নামাজের পর ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনার জের ধরে হাটহাজারী ও পটিয়ায় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তখন গ্রেপ্তার হন হারুন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার অপরাধের বিষয় নয়। তবে যদি এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দিত উগ্রবাদী প্রতীকের সঙ্গে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে বা চরমপন্থী প্রচারণার অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বিষয়টি তদন্ত করা স্বাভাবিক। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, তদন্তে উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট ও বাস্তব কার্যক্রম—সব দিক বিবেচনা করা জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, তদন্ত এখনো চলমান। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সব তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হবে। প্রয়োজনে হারুন ইজহারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট জানার চেষ্টা করা হবে। তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো—এই পতাকা ব্যবহারের পেছনে শুধু ধর্মীয় আবেগ কাজ করেছে, নাকি এর সঙ্গে কোনো সংগঠিত বা উগ্রবাদ-সম্পর্কিত উদ্দেশ্য জড়িত রয়েছে, সেটি নিশ্চিত হওয়া।
খবরটি শেয়ার করুন