শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘আসিফ মাহমুদের দুর্নীতি ও লুটপাটের গডফাদার ড. ইউনূস’ *** শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগেই সরকারের ওপর ‘চাপ’ সৃষ্টি করতে চায় আওয়ামী লীগ *** খুলনায় ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে’ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা *** মুঠোফোনের জন্যই অপ্রতিমকে হত্যা: পুলিশ *** পাকিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় নিহত বেড়ে ৩১, ইত্তেহাদুল মুজাহিদিনের দায় স্বীকার *** রাজধানীতে মসজিদ থেকে আটক ২৩ জনের ১১ জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ *** কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশে নিখোঁজ কিশোরের মরদেহ উদ্ধার *** ‘তৃণমূলের নাম–প্রতীক কেড়ে নেওয়া বিজেপির নোংরা খেলা’, আদালতে মমতা *** সব জেলা পরিষদের স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বাধ্যতামূলক করতে সরকারের নির্দেশ *** বিধ্বস্ত পরমাণু স্থাপনা ফের নির্মাণ করছে ইরান

রাত ১২টায় পুকুরপাড়ে দেখা করলে মিলবে ফ্যামিলি কার্ড, নারীকে ‘কুপ্রস্তাব’ বিএনপি নেতার

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ০৭:০৬ অপরাহ্ন, ২৮শে জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

নরসিংদীর শিবপুরে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসের সঙ্গে গভীর রাতে দেখা করার প্রস্তাব জড়িয়ে এক অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, শিবপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন আকন্দ এক অভাবগ্রস্ত নারীকে রাত ১২টায় পুকুরপাড়ে দেখা করতে বলেন। অভিযোগকারী নারীর দাবি, ওই সাক্ষাতের বিনিময়ে তাকে একটি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।

তবে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা অভিযোগটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন এবং এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন।

গতকাল সোমবার (২৭ জুলাই) অভিযোগসংবলিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও ঘটনাটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

অভিযোগকারী নারী বলেন, পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন আকন্দ তাকে রাত ১২টার দিকে পুকুরপাড়ে দেখা করতে বলেন। তার ভাষ্য, এর বিনিময়ে তাকে একটি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, এর আগেও ওই নেতার কুপ্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় সরকার ঘোষিত গরিব ও অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং সুযোগ-সুবিধা থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

অভিযোগের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। কেউ অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন, আবার কেউ অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

অভিযুক্ত আশরাফ উদ্দিন আকন্দ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে তার দলেরই কিছু লোকের প্ররোচনায় পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, প্রায় পাঁচ মাস আগে তার পা ভেঙে যায় এবং এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। এ অবস্থায় রাত ১২টার সময় পুকুরপাড়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

তিনি আরও বলেন, অভিযোগকারী নারী মাছিমপুর ইউনিয়নের খড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা। ঈদের সময় তিনি তার কাছে কাপড় ও চালের স্লিপ চেয়েছিলেন। তিনি তা দিতে পারেননি। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলে দাবি করেন।

এ বিষয়ে শিবপুর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি দেখেছেন। আশরাফ উদ্দিন তার সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে অভিযোগটি যদি মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমাণিত হয়, সেক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা বিতরণকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। তাদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আবার অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযোগকারীর বক্তব্য ও ভিডিওর উৎসও যথাযথভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

দেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা ও আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিতেও সামাজিক ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীনতার কথা বলা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে কোনো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ব্যক্তিগত বা যৌন সম্পর্কের ইঙ্গিতপূর্ণ শর্ত জুড়ে দেওয়া হলে, অভিযোগ প্রমাণিত সাপেক্ষে তা ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নারীর মর্যাদার পরিপন্থী আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীরা সাধারণত দরিদ্র, বিধবা, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী কিংবা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মানুষ। ফলে তারা ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রতি নির্ভরশীল অবস্থায় থাকেন।

এই নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে কেউ যদি ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন, তাহলে সেটি শুধু নৈতিকভাবে নিন্দনীয় নয়, বরং ক্ষমতার অসম ব্যবহারের একটি গুরুতর অভিযোগ হিসেবে দেখা উচিত।

দেশে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে, যেখানে অবাঞ্ছিত যৌন ইঙ্গিত, প্রস্তাব বা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে যৌন সুবিধা আদায়ের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। যদিও প্রতিটি ঘটনার বিচার নির্ভর করে প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং তদন্তের ওপর, তবুও রাষ্ট্রীয় বা সরকারি সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে যৌন সুবিধা চাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা আইনবিদরা উল্লেখ করে থাকেন।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে আলোচিত। জাতিসংঘের নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন ১৯০—উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার সুযোগ নিয়ে যৌন হয়রানি বা যৌন সুবিধা আদায়ের চেষ্টাকে মানবাধিকার ও মর্যাদার পরিপন্থী আচরণ হিসেবে দেখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বলে, খাদ্য, ভাতা, আশ্রয় কিংবা অন্য কোনো মৌলিক সেবা পাওয়ার শর্ত হিসেবে যৌন সম্পর্ক বা যৌন অনুকম্পা দাবি করা হলে তা ‘সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন’ বা যৌন শোষণের পর্যায়ে পড়তে পারে।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা বণ্টন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, ডিজিটাল এবং জবাবদিহিমূলক করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, সুবিধাভোগী নির্বাচন, আবেদন গ্রহণ এবং কার্ড বিতরণের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ হলে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিনির্ভরতা কমবে এবং অনিয়ম বা হয়রানির সুযোগও সীমিত হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য সহজলভ্য এবং কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও তারা গুরুত্ব দেন।

শিবপুরের এই ঘটনায় এখনো অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত সম্পন্ন হয়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে ভিডিও প্রকাশের পর যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি সুবিধা বিতরণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মানবিক মর্যাদা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়।

এখন সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল, স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রয়োজনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্তের দিকেই নজর থাকবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন ও দলীয় শৃঙ্খলা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন, যাতে কোনো ব্যক্তি অন্যায়ভাবে সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। উভয় ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক এবং বিশ্বাসযোগ্য তদন্তই হতে পারে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর।

বিএনপি নেতা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250